প্রভাত স্পোর্টস : প্রথম কোনো ফুটবলার হিসেবে গত জুনে স্পেনের ‘প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস’ পুরস্কার জিতেছিলেন লিওনেল মেসি। সাহিত্য, সামাজিক বিজ্ঞান, বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত গবেষণা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং খেলাধুলাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য স্বীকৃতি স্মারক নিতে তিনি সপরিবারে স্পেনের ওভিয়েদোয় গিয়েছেন। সেখানে শিশু-কিশোরদের নানা অভিজ্ঞতার কথা ও দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। আজ (শুক্রবার) রাতে প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস পুরস্কারটি দেওয়া হবে মেসিকে। এর আগে তিনি ওভিয়েদোর পালাসিও দে লস দেপোর্তেসে শিক্ষার্থী ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে প্রায় পাঁচ হাজার ভক্তের উপস্থিতিতে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানের মূল লক্ষ্য ছিল শিশু-কিশোর ও তরুণরা। তাদের সঙ্গে মেসি বিশ্বকাপের ফাইনালসহ ক্যারিয়ারের সুখকর ও তিক্ত অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করেছেন।
বিভিন্ন বিষয় ধরে ধরে বক্তব্য দিয়েছেন বার্সেলোনার সাবেক এই কিংবদন্তি ফরোয়ার্ড। সেভাবেই তা তুলে ধরা হলো–
বিশ্বকাপের ফাইনাল
ফুটবলে জেতা খুব কঠিন। তাই পুরো প্রক্রিয়াটাকেই মূল্যায়ন করতে হবে। কারণ শেষ পর্যন্ত একটি দলই জেতে। স্পেনের বিপক্ষে (২০২৬ আসরের) ফাইনালে এবং ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপের ফাইনালেও আমাদের এমন অভিজ্ঞতা হয়েছে। সে কারণেই গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অবস্থানে থাকা এবং জয়ের জন্য সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করা, হতে পারে শেষ পর্যন্ত না-ও পারো জিততে। তবে লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য শেষ পর্যন্ত লড়াই করা এবং নিজের সবটুকু উজাড় করে দেওয়ার তৃপ্তি থাকাটা জরুরি, ফলাফল যেমন-ই হোক না কেন।
রেফারির সঙ্গে আচরণ ও প্রতিবাদের ধরন
আমরা সবাই প্রতিবাদ করি এবং চাই সিদ্ধান্তগুলো আমাদের পক্ষে যাক। কখনও কখনও পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়ে। নিজের চাওয়া অনুযায়ী কিছু না হলে রাগ নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয়। তবে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এরপর কী আসছে এবং পরবর্তী পদক্ষেপ কী সেদিকে মনোযোগ দেওয়া।
ফুটবল উপভোগ করার মন্ত্র
ছোটবেলা থেকেই ফুটবল আমার আবেগের জায়গা। এটাই আমাকে ফুটবল উপভোগ করতে সাহায্য করে। সব সময়ই খেলাটা উপভোগ করেছি। জেতার দায়িত্ব ও চাপের চেয়েও খেলাটা উপভোগ করা আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমি যা করতে ভালোবাসি, সেটাই ফুটবল। সব সময়ই এটা করতে ভালো লেগেছে।
ছুটির সময় পরিবারের সঙ্গে আমরা নিজেদের মধ্যে ফুটবল খেলি। তখন জেতার কোনো প্রয়োজন কিংবা বাধ্যবাধকতা নেই, তবু আমি জিততে চাই। কখনও কখনও বিভিন্ন খেলার পরিস্থিতি নিয়ে ছেলেদের সঙ্গে তর্ক করি, আলোচনা হয়।
শিশুদের উদ্দেশে বার্তা
তোমাদের যা ভালো লাগে, সেটাই করতে হবে। অনেক শিশুর ক্ষেত্রে দেখা যায়, তাদের মা-বাবা অনেক বেশি প্রত্যাশা করেন এবং তাদের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেন। তারা বুঝতে পারেন না, অতিরিক্ত চাহিদা কিংবা প্রত্যাশার মাধ্যমে নিজেদের সন্তানদেরই ক্ষতি করছেন। যে কাজ করবে, সেটি উপভোগ করতে হবে।
‘রোল মডেল’ ফুটবলারদের সঙ্গে খেলার অভিজ্ঞতা
আমার বয়স যখন ১৬, তখন আমার আশপাশে ছিলেন রোনালদিনিয়ো, জাভি ও পুয়োলের মতো খেলোয়াড়রা। ফলে আমার জন্য পরিস্থিতিটা কঠিন ছিল। আমি কিছুটা লাজুক, সহজে সবার সঙ্গে মিশতে পারতাম না। তখন তারা আমাকে বলেছিলেন, যেন সবকিছু ভুলে যাই। পাশে কে আছে, তা না ভেবে ছোটবেলা থেকে যেভাবে খেলেছি, সেভাবেই খেলতে এবং আনন্দ করতে। দলের অংশ হয়ে ফুটবল উপভোগ করতে বলেছিলেন তারা।
সমালোচনা
খেলা নিয়ে সমালোচনা এক ধরনের, যেখানে মাঠে তুমি কী করছ তা নিয়ে কথা হয়। আবার বিদ্বেষমূলক সমালোচনাও আছে, যা খেলার গণ্ডি ছাড়িয়ে যায় এবং তোমাকে আঘাত করতে পারে। অনেক সময় তোমার আশপাশের মানুষদেরও কষ্ট দেয়। পুরো ক্যারিয়ারে আমি অনেক সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছি। এর কারণে আমার পরিবারকেও অনেক ভুগতে হয়েছে।
পরাজয় থেকেও শেখার বার্তা
ভুল স্বীকার করে সেগুলো সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে। বড় হতে হলে ভুল মেনে নেওয়া জরুরি। কীভাবে জিততে হয় তা জানার পাশাপাশি কীভাবে হার মেনে নিতে হয়, সেটিও শিখতে হবে। আমার মনে হয় খেলাধুলায় এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শেষ পর্যন্ত ফুটবলে আমরা যতবার জিতি, তার চেয়ে বেশিবার হারি।
বিদেশে বসবাসের অভিজ্ঞতা
ফুটবলের কারণে খুব অল্প বয়সেই আমাকে বাড়ি ছাড়তে হয়েছিল। এমন একটি জায়গায় যেতে হয়েছিল, যেখানে কাউকে চিনতাম না। কারণ আমার একটি স্বপ্ন ছিল এবং সেই স্বপ্নের জন্য লড়াই করতে হতো। জীবনে যে স্বপ্নই মনে আসুক না কেন, তা অর্জনের চেষ্টা করতে হলে লড়াই করতে হবে এবং নিজের সর্বোচ্চটা দিতে হবে।
