পরিবারে নতুন অতিথি আসার পর আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনদের আদর বা স্নেহের বশে নবজাতককে চুমু দেওয়ার অভ্যাস রয়েছে। কিন্তু স্নেহ প্রকাশের এই পরিচিত অভ্যাস কখনো কখনো নবজাতকের জন্য গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে চুমু দেওয়া ব্যক্তির ঠোঁটে হারপিসের ঘা থাকলে প্রতিক্রিয়া জটিল হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নবজাতককে চুমু দেওয়ার ঝুঁকি নিয়ে প্রায়ই বিভিন্ন তথ্য ও সচেতনতামূলক পোস্ট চোখে পড়ে। ইনস্টাগ্রামে ১১ লাখেরও বেশি অনুসারী থাকা ‘হাশেম আল-ঘাইলি’ নামের একটি জনপ্রিয় অ্যাকাউন্ট থেকেও এ সংক্রান্ত একটি পোস্ট পাওয়া যায়। পোস্টটিতে দাবি করা হয়েছে, স্নেহ প্রকাশের সাধারণ একটি আচরণও নবজাতকের জন্য গুরুতর, এমনকি প্রাণঘাতী পরিণতি ডেকে আনতে পারে। উদাহরণ হিসেবে ব্রিলিন নামের এক শিশুর ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। পোস্টের দাবি, ঠোঁটে সক্রিয় হারপিসের ঘা থাকা কারও চুমু থেকে শিশুটি হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস টাইপ-১ (HSV-1)-এ আক্রান্ত হয়েছিল। পরে সংক্রমণ শিশুটির মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদি স্নায়বিক জটিলতা দেখা দেয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সত্যিই কি নবজাতককে চুমু খাওয়ার মাধ্যমে এমন বিপদ ঘটতে পারে?

চুমুর মাধ্যমে কীভাবে সংক্রমণ ছড়ায়?
হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস টাইপ-১ সাধারণত মুখের চারপাশে ঘা বা জ্বরঠোসা সৃষ্টি করে। আক্রান্ত ব্যক্তির মুখের ক্ষত, লালা কিংবা সংক্রমিত ত্বকের সঙ্গে সরাসরি সংস্পর্শে এ ভাইরাস ছড়াতে পারে। ফলে ঠোঁটে সক্রিয় হারপিসের ঘা থাকা কেউ নবজাতককে চুমু দিলে শিশুটির শরীরে ভাইরাস প্রবেশের ঝুঁকি থাকে।
প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এ সংক্রমণ অনেক সময় ঠোঁটের ঘা বা মৃদু উপসর্গের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু নবজাতকের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আলাদা। জন্মের পর শিশুর রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা পুরোপুরি বিকশিত হয় না। তাই কিছু সংক্রমণ তাদের শরীরে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং গুরুতর অসুস্থতার কারণ হতে পারে।
নবজাতকের হারপিস সংক্রমণ কখনো কখনো মস্তিষ্ক ও কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে ছড়িয়ে পড়ে। এ অবস্থাকে হারপিস এনসেফালাইটিস বলা হয়। এতে মস্তিষ্কের প্রদাহসহ গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে। দ্রুত চিকিৎসা না হলে এ সংক্রমণ প্রাণঘাতীও হতে পারে।
যুক্তরাজ্যের সরকারি সংস্থা জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (NHS) নবজাতকের হারপিস সংক্রমণকে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করে। বিশেষ করে জন্মের পর প্রথম ছয় সপ্তাহে এ বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়।

গবেষণায় কি চুমুর মাধ্যমে সংক্রমণের প্রমাণ পাওয়া গেছে?
অনুসন্ধানে জানা দেখা যায়, নবজাতককে চুমু খাওয়া সব ক্ষেত্রে বিপজ্জনক নয়। তবে নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে, বিশেষ করে হারপিসের মতো সংক্রমণের ক্ষেত্রে, এটি প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
British Medical Journal (BMJ) -এর তথ্য অনুযায়ী, চুমু খাওয়ার মতো ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের মাধ্যমে নবজাতকের শরীরে হারপিস ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি স্বীকৃত। সাময়িকীটিতে বলা হয়েছে, ‘আপনি হারপিসে আক্রান্ত হলে এভাবে (চুমুর মাধ্যমে) সংক্রমণ ছড়াতে পারে। নবজাতকের শরীরে সংক্রমণটি ছড়িয়ে পড়লে দীর্ঘমেয়াদি স্নায়বিক ক্ষতি এমনকি কিছু ক্ষেত্রে মৃত্যুও হতে পারে।’
এ থেকে বোঝা যায়, চুমু খাওয়ার বিষয়টি নিজে থেকেই বিপজ্জনক নয়; বরং চুমু দেওয়া ব্যক্তির শরীরে সক্রিয় সংক্রমণ রয়েছে কি না, সেটি ঝুঁকি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও বলছে, নবজাতকের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা পুরোপুরি বিকশিত না হওয়ায় তারা সংক্রমণের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সংবেদনশীল। জনস হপকিন্স মেডিসিনের তথ্য অনুযায়ী , নবজাতকের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা পুরোপুরি বিকশিত না হওয়ার ফলে তারা ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসজনিত সংক্রমণে সহজেই আক্রান্ত হতে পারে।
প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, নবজাতকের রক্তে সংক্রমণ (সেপসিস) ও মেনিনজাইটিসের মতো গুরুতর রোগ হওয়ার ঝুঁকি বেশি। তাদের রক্ত-মস্তিষ্ক প্রতিবন্ধক (ব্লাড-ব্রেন ব্যারিয়ার) পুরোপুরি বিকশিত না হওয়ায় সংক্রমণ মস্তিষ্কে পৌঁছানোর ঝুঁকিও থাকে। এ কারণেই নবজাতকের জ্বরকেও চিকিৎসাগত জরুরি অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এসব ঝুঁকির কারণে জীবাণু ছড়াতে পারে—এমন ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ সীমিত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। জনস হপকিন্সের তথ্য অনুযায়ী, দর্শনার্থীদের শিশুকে চুমু দেওয়া বা তার মুখের খুব কাছে যাওয়া উচিত নয়, কারণ মানুষের মুখে অনেক জীবাণু থাকতে পারে। জ্বর, কাশি বা ঠোঁটে জ্বরঠোসার মতো উপসর্গ থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শিশুর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা উচিত। পাশাপাশি হাত পরিষ্কার রাখা ও মাস্ক ব্যবহারের মতো সতর্কতামূলক ব্যবস্থা সংক্রমণের ঝুঁকি আরও কমাতে পারে।
চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণাও চুমুর মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাবনাকে সমর্থন করে। ২০১৬ সালে প্রকাশিত একটি কেস স্টাডিতে এমন এক নবজাতকের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যে সক্রিয় জ্বরঠোসায় আক্রান্ত একজন পরিচর্যাকারীর সংস্পর্শে আসার পর হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস টাইপ-১ (HSV-1)-এ আক্রান্ত হয়েছিল।
গবেষকেরা জানান, শিশুটির বাবার ঠোঁটে সক্রিয় হারপিসের ঘা ছিল। তিনি স্বীকার করেছিলেন যে ঘা থাকা অবস্থায় বারবার শিশুটিকে চুমু দিয়েছেন। পরে পিসিআর পরীক্ষার মাধ্যমে শিশুটির শরীরে ভাইরাসটির উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। গবেষণাটিতে বলা হয়েছে, জন্মের পর ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের মাধ্যমে HSV-1 সংক্রমণ ছড়ানো সম্ভব। তাই মস্তিষ্কসহ কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার মতো জটিলতা এড়াতে দ্রুত রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা শুরু করা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ওই গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও উঠে এসেছে। দ্রুত চিকিৎসা দেওয়ার ফলে সংক্রমণটি মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ার মতো গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছায়নি। শিশুটি দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা ছাড়াই সুস্থ হয়ে ওঠে। গবেষকেরা নবজাতককে সক্রিয় হারপিসের ঘা রয়েছে—এমন ব্যক্তিদের কাছ থেকে দূরে রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। পাশাপাশি মাস্ক ব্যবহারের মতো সতর্কতামূলক ব্যবস্থার কথাও উল্লেখ করেছেন।

তাহলে কি নবজাতককে চুমু দেওয়া যাবে না?
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। নবজাতককে চুমু দেওয়ামাত্রই তার প্রাণঘাতী সংক্রমণ হবে, এমন নয়। ঝুঁকি নির্ভর করে চুমু দেওয়া ব্যক্তির শরীরে সংক্রমণ রয়েছে কি না, শিশুর সঙ্গে কী ধরনের সংস্পর্শ ঘটছে এবং সংক্রমণ ছড়ানোর অন্যান্য পরিস্থিতির ওপর।
হারপিস ছাড়াও ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের মাধ্যমে কিছু ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া ছড়াতে পারে। এ ছাড়া ইনফ্লুয়েঞ্জা ও অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি-হাঁচি কিংবা শ্বাসতন্ত্র থেকে নির্গত কণার মাধ্যমেও ছড়াতে পারে। তবে সব সংক্রমণ চুমুর মাধ্যমে ছড়ায় না।
নবজাতককে সুরক্ষিত রাখতে কয়েকটি সতর্কতা মেনে চলা জরুরি। শিশুকে কোলে নেওয়ার আগে হাত ধুতে হবে। ঠোঁটে জ্বরঠোসা বা হারপিসের ঘা থাকলে শিশুকে চুমু দেওয়া যাবে না। সর্দি-কাশি, জ্বর কিংবা অন্য সংক্রমণের লক্ষণ থাকলে নবজাতকের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে হবে। বিশেষ করে শিশুর মুখ, নাক ও চোখের কাছে চুমু না দেওয়াই নিরাপদ।
সিদ্ধান্ত
হাশেম আল-ঘাইলির পোস্টে নবজাতককে চুমু খাওয়ার মাধ্যমে হারপিস সংক্রমণের ঝুঁকি সম্পর্কে যে সতর্কতা দেওয়া হয়েছে, তার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে। চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণা ও NHS-এর তথ্যেও নবজাতকের হারপিস সংক্রমণ গুরুতর, এমনকি প্রাণঘাতী হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
