৩০ মিনিট আগে
![]()
মোকাম্মেল শুভ
ছবি: প্রথম আলোর সৌজন্যে
কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের পাশে ইনানীর পাটোয়ারটেকে টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ১০ জনের মৃত্যুর ঘটনায় ইকো-রিসোর্টের নামে গড়ে ওঠা স্থাপনাগুলোর ঝুঁকি সামনে এসেছে। কংক্রিটের স্তম্ভের সঙ্গে কাঠ ও বাঁশ ব্যবহার করে নির্মিত এসব বহুতল স্থাপনার অনেকগুলোতেই পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা নেই। সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার অনুমোদন ছাড়াই মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠছে হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট।
অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের জ্যেষ্ঠ স্টেশন কর্মকর্তা দোলন আচার্য জানান, রিসোর্টটিতে স্তম্ভ হিসেবে কংক্রিটের কলাম ব্যবহার করা হয়েছিল, আর মেঝে তৈরি করা হয়েছিল কাঠের তক্তা দিয়ে। দেয়াল ও সিঁড়িও ছিল কাঠ ও বাঁশের।
তিনি বলেন, ‘অগ্নিনিরাপত্তার শর্ত মেনে এসব স্থাপনা বানানো হয়নি। আগুন লাগার সময় সিঁড়ি দিয়ে বের হতে না পারায় অনেকে ভেতরে আটকা পড়েন। হতাহতের বেড়ে যাওয়ার এটি অন্যতম কারণ।’
শনিবার সকালে পাটোয়ারটেকে টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লাগার পর সেখান থেকে আগুনে পুড়ে যাওয়া ১০টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের গুদাম পরিদর্শক মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম প্রশ্ন তোলেন, ইকো-রিসোর্টের নামে কীভাবে তিনতলা ভবন বানিয়ে ফেললো?
তিনি বলেন, ‘কোনোভাবেই এগুলো ইকো-রিসোর্ট না। একটি ইকো-রিসোর্টে পর্যাপ্ত খোলা জায়গা থাকতে হবে এবং আবাসন হবে একতলা।’
অনুমোদন ছাড়া স্থাপনা
কক্সবাজার শহর থেকে টেকনাফ পর্যন্ত প্রায় ৮০ কিলোমিটার বিস্তৃত মেরিন ড্রাইভ। এই সড়কের দুপাশে ইকো-রিসোর্টের নামে নির্বিচারে বিভিন্ন স্থাপনা বানানো হচ্ছে। কয়েকটি সরকারি সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোই নিয়মকানুন না মেনে নির্মাণ করা হয়েছে।
তবে, মেরিন ড্রাইভের পাশে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সঠিক সংখ্যা বা পূর্ণাঙ্গ তালিকা কোনো সরকারি সংস্থাই দিতে পারেনি।
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, ‘৮০ কিলোমিটার সড়কের দুই পাশে অস্থায়ী ও স্থায়ী মিলিয়ে প্রায় আড়াই হাজার স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে ২০০ থেকে ২৫০টি স্থায়ী স্থাপনা।’
তিনি বলেন, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার আগে কক্সবাজারের উন্নয়ন কার্যক্রম সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর (ইউডিডি) ২০১৩ সালে একটি মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করে। ওই পরিকল্পনার গেজেট প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, পৌর এলাকার মধ্যে সমুদ্রতীর থেকে ৩০০ মিটারের মধ্যে এবং পৌর এলাকার বাইরে ৫০০ মিটারের মধ্যে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ কারণে মেরিন ড্রাইভ-সংলগ্ন এলাকায় কোনো হোটেল বা রিসোর্ট নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়নি। তারপরও সড়কের দুপাশে অনুমোদন ছাড়াই অসংখ্য হোটেল ও রিসোর্ট গড়ে উঠেছে।’
ইকো-রিসোর্ট নির্মাণের শর্ত উল্লেখ করে জসিম উদ্দিন বলেন, ‘এ ধরনের প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট নিয়মকানুন মেনে চলতে হবে। সেখানে পর্যাপ্ত খোলা জায়গা এবং যথাযথ অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা থাকতে হবে। এর মধ্যে ফায়ার হাইড্রেন্ট লাইনের সঙ্গে সংযুক্ত একটি পুকুর বা অন্য কোনো পানির উৎসও থাকতে হবে। এ ছাড়া, ফায়ার সার্ভিসের বিধিমালা অনুযায়ী অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা থাকতে হবে এবং অগ্নিনিরাপত্তার মানদণ্ড পূরণ করে এমন নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করতে হবে। এর জন্য শুধু কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিলেই চলবে না; সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার শর্ত পূরণ এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদনও নিতে হবে।’
৫০০ প্রতিষ্ঠানকে ফায়ার সার্ভিসের নোটিশ
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম জানান, অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা প্রায় ৫০০টি হোটেল ও অন্যান্য আবাসিক প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ দিয়েছেন।
তবে এর মধ্যে কতগুলো হোটেল ও রিসোর্ট, তা তিনি নির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি।
শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এ বছর প্রায় ৫৩টি হোটেল ও রিসোর্ট অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছে। এর মধ্যে ২৩টি লাইসেন্স পেয়েছে, আর প্রায় ৩০টি প্রতিষ্ঠানের আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’
মেরিন ড্রাইভের পাশে ইকো-রিসোর্টের নামে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঠিক কতগুলো নোটিশ দেওয়া হয়েছে তা সুনির্দিষ্ট।টভাবে বলতে না পারলেও তিনি বলেন, ‘যে রিসোর্টে আগুন লেগেছিল, সেটিকে আগেই সতর্কতামূলক নোটিশ দেওয়া হয়েছিল।’
ইকো-রিসোর্টের নামে চলছে অন্তত ৪০ প্রতিষ্ঠান
কক্সবাজার হোটেল মালিক সমিতি ও মেরিন ড্রাইভ হোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোকিম খান সড়কটির পাশে থাকা হোটেল, মোটেল ও ইকো-রিসোর্টের আনুমানিক সংখ্যা জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘মেরিন ড্রাইভের পাশে প্রায় ৮০টি হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে প্রায় ৪০টি আমাদের সংগঠনের সদস্য। বাকিগুলোর সঙ্গে আমাদের সংগঠনের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের এই সংগঠনের সদস্য হতে হলে ট্রেড লাইসেন্স, অগ্নিনিরাপত্তা সনদ ও জমির মালিকানার কাগজপত্রসহ বেশ কিছু নথি দরকার হয়। এ কারণে ইকো-রিসোর্টের নামে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা অনেক প্রতিষ্ঠানের মালিক আমাদের এখানে সদস্য হননি।’
তার ধারণা, মেরিন ড্রাইভের পাশে অন্তত ৪০টি প্রতিষ্ঠান ইকো-রিসোর্টের নামে চালানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘মানুষ জমি কিনে বা ভাড়া নিয়ে বাঁশ, কাঠ কিংবা আংশিক কংক্রিটের স্থাপনা দিয়ে রিসোর্ট বানাচ্ছে। এতে গুরুতর নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। ইকো-রিসোর্ট পরিচালনার দাবি করলেও এসব অনেক প্রতিষ্ঠানের মালিক প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদনের বিষয়টি গুরুত্ব দিচ্ছেন না।’
তদন্ত প্রতিবেদনের অপেক্ষা
মেরিন ড্রাইভের পাশে ঝুঁকিপূর্ণ হোটেল ও রিসোর্টের সংখ্যা সম্পর্কে জানতে চাইলে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, ‘টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের পর গঠিত তদন্ত কমিটি সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছে। কমিটি প্রতিবেদন জমা দিলে পুরো পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত চিত্র পাওয়া যাবে।’
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, ‘মেরিন ড্রাইভের পাশে ইকো-রিসোর্টের নামে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে শিগগির ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হবে।’
