শহর থেকে গ্রাম, সবখানেই আধুনিক সেলুনের সংখ্যা দিনদিন বেড়ে চলেছে। কাচঘেরা দোকান, আরামদায়ক চেয়ার, নানা ধরনের আধুনিক সরঞ্জাম আর উন্নতমানের মেশিনে চুল কাটার ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে এসব সেলুনের প্রতি মানুষের আগ্রহও বাড়ছে। সময়ের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে চুল কাটার ধরন, বদলাচ্ছে মানুষের পছন্দ। তবে আধুনিকতার এই ছোঁয়ার মধ্যেও হারিয়ে যায়নি গ্রামবাংলার ঐতিহ্য। এখনো কোথাও কোথাও খোলা মাঠে পিঁড়িতে বসে চুল কাটে মানুষ। সেই দৃশ্যের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে শতবর্ষী গাছ কিংবা পুরোনো কোনো বাজার।
এক হাতে কাঁচি, অন্য হাতে চিরুনি। সামনে রাখা ছোট্ট একটি পুরোনো আয়না। মাথার ওপর ছায়া মেলে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল বটগাছ। সপ্তাহের অন্য দিনগুলোতে জায়গাটি থাকে অনেকটাই নিরিবিলি, কিন্তু শনিবার এলেই বদলে যায় দৃশ্য। বটগাছের নিচে বসে চুল-দাড়ি কাটাতে ভিড় জমান নানা বয়সী মানুষ। এমনই দৃশ্যের দেখা মেলে ময়মনসিংহের ভালুকার মল্লিকবাড়ী বাজারে। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা এই আয়োজন স্থানীয়দের কাছে নরসুন্দরদের হাট হিসেবে পরিচিত।
প্রতি শনিবার মল্লিকবাড়ী বাজারে বসে সাপ্তাহিক হাট। সকাল থেকেই শুরু হয় ক্রেতা-বিক্রেতার আনাগোনা। দোকানপাটের ব্যস্ততা আর মানুষের হাঁকডাকে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। সেই চেনা কোলাহলের মধ্যেই বটগাছের নিচে নিজেদের কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন নরসুন্দররা। পুরোনো কাঠের পিঁড়ি বা বেঞ্চ, আয়না, কাঁচি আর চিরুনি—এই সামান্য সরঞ্জামেই চলে তাদের কাজ। নেই আধুনিক সেলুনের জাঁকজমক, নেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ কিংবা বাহারি সাজসজ্জা। তবে এই হাটে চুল-দাড়ি কাটাতে আসা মানুষের অধিকাংশই মধ্যবয়সী থেকে প্রবীণ। জানা যায়, কম খরচে কাজ করানো যায় বলেই অনেকে বটতলার নরসুন্দরদের কাছে আসেন। আবার কারো কাছে এটি দীর্ঘদিনের অভ্যাস। বছরের পর বছর একই নরসুন্দরের কাছে চুল-দাড়ি কাটাতে কাটাতে অনেকের সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কও গড়ে উঠেছে।
নরসুন্দরদের থেকে জানা যায়, একসময় শনিবার সকাল থেকেই তাদের সামনে খদ্দেরের দীর্ঘ সারি থাকত। দিনভর ব্যস্ত থাকত কাঁচি ও চিরুনি। এখন আগের মতো খদ্দের আসে না। আধুনিক সেলুনের সংখ্যা বাড়ায় তাদের কাজ কমেছে, কমেছে আয়ও। এই বটগাছের নিচের জায়গাটি শুধু নরসুন্দরদের কর্মস্থল নয়, তাদের জীবনেরও একটি অংশ। তাদের মধ্যে কেউ ছোটবেলা থেকেই এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। কারো জীবনের বড় একটি সময় কেটেছে কাঁচি-চিরুনির সঙ্গে।
রায়মন চন্দ্র শীলের বয়স ৭০ বছর, পাকিস্তান আমল থেকে নরসুন্দরের কাজ করছেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে এই পেশার ভালো-মন্দ দুটো সময়ই দেখেছেন তিনি। এই প্রবীণ নরসুন্দর বলেন, ‘পাকিস্তান আমল থেকে কাজ করছি। তখন হাতে কাজ থাকত, পকেটেও টাকা থাকত। এখন শুধু হাটের দিনটাতেই কাজ পাই। বাকি সময় গ্রামে গ্রামে ঘুরে কাজ করতে হয়। আগে দিনে সাত-আটশ টাকা আয় হতো, এখন পাঁচশ টাকাও হয় না।’
২৪ বছরের তরুণ সুমন শীল থাকেন পাঁচগাঁও হাজির বাজার এলাকায়। সেখানে তার একটি সেলুন আছে। তবু শনিবার এই হাটে বটতলায় বসেন। তিনি বলেন, ‘নিজের এলাকায় সেলুন চালানোর পাশাপাশি শনিবার এলেই হাটে আসি। এখানে পুরোনো কিছু খদ্দের আছেন। যারা নিয়মিত আমার কাছে চুল-দাড়ি কাটাতে আসেন।’
সপ্তাহের বাকি দিনগুলো অনেক নরসুন্দর নিজের এলাকায় সেলুন চালান, কেউ আবার গ্রামে গ্রামে ঘুরে কাজ করেন। শনিবারের হাট শেষে ধীরে ধীরে থেমে যায় কাঁচির টুংটাং শব্দ। গুছিয়ে রাখা হয় কাঁচি, চিরুনি আর পুরোনো আয়না। বটগাছের নিচে নেমে আসে নীরবতা। তবে পরের শনিবার আবারও বসবে সেই ছোট্ট সেলুন। আধুনিকতার চাপে কাজ কমলেও পুরোনো খদ্দেরের টান ও জীবিকার তাগিদে এখনো টিকে আছে এই আসর। বটতলার নরসুন্দররা ধরে রেখেছেন গ্রামীণ জীবনের হারিয়ে যেতে বসা এক টুকরো ঐতিহ্য।
