মালয়েশিয়ার বিভিন্ন নির্মাণাধীন ভবন, কারখানা, রেস্তোরাঁ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকায় দেশটির অভিবাসন বিভাগের ধারাবাহিক ও কঠোর অভিযানে প্রবাসী বাংলাদেশীসহ বিভিন্ন দেশের শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক বিরাজ করছে।
মালয়েশিয়ার বিভিন্ন নির্মাণাধীন ভবন, কারখানা, রেস্তোরাঁ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকায় দেশটির অভিবাসন বিভাগের ধারাবাহিক ও কঠোর অভিযানে প্রবাসী বাংলাদেশীসহ বিভিন্ন দেশের শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক বিরাজ করছে। বৈধ কাগজপত্র না থাকা, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়া কিংবা কাজের অনুমতির শর্ত লঙ্ঘনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে প্রতিদিন গড়ে শত শত বিদেশী নাগরিক আটক হচ্ছেন। মালয়েশিয়ায় ২৮৭ দিনে আটক ৬৫ হাজার ৬৯৯ জন বিদেশী নাগরিককে আটক করেছে দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪৫ হাজার ৫৯৭ জন বিদেশীকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। ৮ অক্টোবর পর্যন্ত ৫৩৮ জন বাংলাদেশীকে আটক করা হয়। পরিবারের ভরণপোষণ, ঋণের বোঝা আর দেশে স্বজনদের ভবিষ্যৎ টিকিয়ে রাখতে যারা রক্ত-পানি করা রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন, তাদের অনেকের জীবনেই এখন চরম অনিশ্চয়তার কালো ছায়া নেমে এসেছে। মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, কুয়ালালামপুরস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশন সূত্রে এই সব তথ্য জানা যায়।
এদিকে আটক প্রবাসীদের আইনি সহায়তা ও কনস্যুলার সেবা দিতে কুয়ালালামপুরস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশন সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। গত ০৬ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ হাইকমিশনের একটি প্রতিনিধিদল তেরেঙ্গানু রাজ্যের ডিটেনশন সেন্টার পরিদর্শন করে সেখানে আটক ৮৫ জন বাংলাদেশী কর্মীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় তাঁদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা এবং জরুরি ট্রাভেল পারমিটসহ কনস্যুলার সেবা প্রদান করা হয়। একই দিনে নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও নিয়মিত অভিবাসন নিশ্চিতকরণ এবং পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াতে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা-এর সঙ্গে বাংলাদেশ হাইকমিশনের একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত দেশজুড়ে ১১ হাজার ১১০টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এই ২৮৭ দিনে প্রতিদিন গড়ে ৩৮টির বেশি অভিযান চালিয়ে মোট ৬৫ হাজার ৬৯৯ জন বিদেশী নাগরিককে আটক করেছে দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এই সময়ে ১ লাখ ৪৬ হাজার থেকে ১ লাখ ৪৮ হাজারেরও বেশি বিদেশী নাগরিকের পাসপোর্ট ও ওয়ার্ক পারমিট যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। শুধু বিদেশী কর্মীরাই নন, অবৈধ বা অননুমোদিত কর্মী রাখার দায়ে ১ হাজার ৯৬৬ জন স্থানীয় নিয়োগকর্তাকেও আটক করা হয়েছে। অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের দায়ে নিয়োগকর্তাদের কাছ থেকে ৪ কোটি ১২ লাখ রিঙ্গিতের বেশি জরিমানা আদায় করা হয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪৫ হাজার ৫৯৭ জন বিদেশীকে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাতুক সেরি সাইফুদ্দিন নাসুতিওন ইসমাইল জানিয়েছেন, ধারাবাহিক এসব আটকের কারণে দেশটির অভিবাসন ডিপোগুলো ধারণক্ষমতা প্রায় ২০ হাজার অতিরিক্ত বন্দীর চাপে চরম সংকটের মুখে পড়েছে। অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহের পরিসংখ্যানে এই অভিযানের ব্যাপকতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১২ থেকে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত মাত্র পাঁচ দিনে ২৫২টি অভিযান চালিয়ে ৪ হাজার ৯০৭ জনের কাগজপত্র যাচাই করা হয় এবং ২ হাজার ১৫৬ জন বিদেশীকে আটক করা হয়। এর আগে বিভিন্ন সমন্বিত অভিযানেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশী আটক হয়েছেন। গত ১৩ সেপ্টেম্বর কুয়ালালামপুরের লেবুহ পুদু এলাকায় প্রায় আড়াই হাজার বিদেশীর কাগজপত্র যাচাই করে ৩৬৪ জন বাংলাদেশী সহ মোট ৪৭২ জনকে আটক করা হয়। গত ৮ অক্টোবর সেলাঙ্গরের সেরি কেম্বাঙ্গান ও বান্দার বারু ক্লাং এলাকায় অভিযানে আটক ১৭৪ জনের মধ্যে পাঁচজন বাংলাদেশী ছিলেন। নির্মাণ খাত, উৎপাদন, কৃষি ও সেবাখাত—সব জায়গায় এই নজরদারি ছড়িয়ে পড়ায় সাধারণ প্রবাসীদের মধ্যে গ্রেপ্তার ও দেশে ফিরে যাওয়ার আতঙ্ক তীব্র রূপ নিয়েছে।
মালয়েশিয়ায় চলমান অভিবাসনবিরোধী অভিযান ও প্রবাসীদের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, “মালয়েশিয়ায় আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের সুরক্ষা ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। কুয়ালালামপুরস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশন সার্বক্ষণিক স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। যেসব প্রবাসী বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও বা ছোটখাটো জটিলতায় হয়রানির শিকার হচ্ছেন, তাদের আইনি সহায়তা দিতে আমাদের মিশনগুলো কাজ করছে। পাশাপাশি, মালয়েশিয়া সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।”
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, মালয়েশিয়ার নিজস্ব অভিবাসন আইন প্রয়োগের সার্বভৌম অধিকারকে সম্মান জানিয়েই বাংলাদেশ সরকার কাজ করছে। তবে অবৈধ দালাল চক্রের প্রতারণার শিকার হওয়া সাধারণ ও সহজ-সরল শ্রমিকদের যাতে অন্যায়ভাবে সাজা বা হয়রানির মুখে পড়তে না হয়, সে বিষয়ে মালয়েশিয়া সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট কূটনৈতিক বার্তা পাঠানো হয়েছে।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন ও ইয়ুথ প্ল্যাটফরমের সহযোগী পরিচালক এবং অভিবাসন ও শ্রমবাজার বিশেষজ্ঞ শরিফুল ইসলাম মনে করেন, ‘‘এই সংকটের মূল শিকড় লুকিয়ে রয়েছে রিক্রুটিং প্রক্রিয়ার ত্রুটির মধ্যে। বিদেশে যাওয়ার আগে কর্মীদের সঠিক কাজের নিশ্চয়তা এবং বৈধ কাগজপত্রের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট গ্যারান্টি না থাকায় অনেকেই পরে অনিয়মিত বা অবৈধ হয়ে পড়েন। কেবল কর্মীদের দোষ না দিয়ে সিন্ডিকেট ও দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।”
তিনি আরও বলেন, মালয়েশিয়ার এই কড়া অভিবাসন নীতি ও ধারাবাহিক অভিযান দেশের অর্থনীতি এবং রেমিট্যান্স প্রবাহের জন্য একটি বড় ধাক্কা। একদিকে অপরাধ ও অবৈধ অভিবাসন রোধে মালয়েশিয়া সরকারের আইন প্রয়োগ স্বাভাবিক হলেও, অন্যদিকে প্রতারিত ও অসহায় প্রবাসী বাংলাদেশীদের আইনি সুরক্ষা, কনস্যুলার সেবা এবং বৈধতার পথ সুগম করতে কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি। রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের ঘাম ও পরিশ্রমে গড়া অর্থনীতির সুরক্ষায় তাই এখন প্রয়োজন সুসমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ।
প্রবাসী কল্যাণ ও শ্রমিক অধিকার বিশ্লেষকরা বলছেন, মালয়েশিয়ার বাজারে শ্রমশৃঙ্খলার অজুহাতে যেন কোনো বৈধ বাংলাদেশী কর্মী হয়রানির শিকার না হন, সেদিকে সরকারের নজরদারি আরও বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে অবৈধ অভিবাসনের উৎস বা রুটগুলো বন্ধ করতে দুই দেশের যৌথ মনিটরিং সেল গঠন করা এখন সময়ের দাবি।
