মুহাম্মদ এমদাদ হোসাইন
এক হাতে বস্তা, কাঁধে আরেকটি বস্তা নিয়ে আবর্জনার বিশাল স্তূপের ওপর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে শিশুরা। চারপাশে প্লাস্টিক, পচনশীল বর্জ্য ও নানা ধরনের পরিত্যক্ত সামগ্রী। কাছেই কাজ করছে ভারী যন্ত্রপাতি। চট্টগ্রাম নগরের হালিশহরের আনন্দবাজার ময়লার ডিপোতে এমন দৃশ্য দারিদ্র্য, শিশুশ্রম এবং শিশুদের নিরাপদ শৈশবের অধিকার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
এই ডিপোতে বর্জ্য থেকে প্লাস্টিক, ধাতু ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করেন অনানুষ্ঠানিক বর্জ্য সংগ্রহকারীরা। তাদের মধ্যে শিশুরাও রয়েছে। পরিবারের আর্থিক সংকট ও বিকল্প জীবিকার অভাব শিশুদের এমন কাজে যুক্ত হওয়ার অন্যতম কারণ হতে পারে। তবে প্রতিটি শিশুর ব্যক্তিগত পরিস্থিতি আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
২০২৩ সালে Asian Journal of Applied Sciences-এ প্রকাশিত আনন্দবাজারের বর্জ্য সংগ্রহকারীদের ওপর একটি গবেষণায় দেখা যায়, জরিপে অংশ নেওয়া সংগ্রহকারীদের ১৩ শতাংশের বয়স ছিল ১৫ বছর বা তার কম। গবেষণায় অধিকাংশ অংশগ্রহণকারীর দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অপর্যাপ্ত জীবনযাপনের পরিবেশ এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয় উঠে আসে। গবেষকেরা শিশুদের অনানুষ্ঠানিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহার খাত থেকে সরিয়ে শিক্ষা ও সুরক্ষার আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন।
বর্জ্যের স্তূপে কাজ করার সময় শিশুদের ধারালো কাচ, ধাতব টুকরা, সুচ, দূষিত পদার্থ এবং ভারী যানবাহনের মতো ঝুঁকির মুখে পড়তে হতে পারে। বর্জ্যে আগুন জ্বললে ধোঁয়া ও উত্তাপের সংস্পর্শও তাদের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। পর্যাপ্ত সুরক্ষাসামগ্রী ও স্বাস্থ্যসেবার অভাব এসব ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে। তবে নির্দিষ্ট কোনো শিশুর স্বাস্থ্যগত অবস্থা জানতে সরাসরি মূল্যায়ন প্রয়োজন।
শিশুশ্রমের প্রভাব শুধু শারীরিক নিরাপত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কাজের কারণে নিয়মিত স্কুলে যাওয়া, পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া, খেলাধুলা করা এবং বিশ্রামের সুযোগ কমে গেলে শিশুর সামগ্রিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। দারিদ্র্যের কারণে কাজে যুক্ত হওয়া শিশুর জন্য এটি এমন এক চক্র তৈরি করতে পারে, যেখানে বর্তমানের জীবিকা নিশ্চিত করতে গিয়ে ভবিষ্যতের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হয়।
বাংলাদেশের শ্রম আইন অনুযায়ী, শিশুদের নির্দিষ্ট পেশা ও প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ নিষিদ্ধ এবং কিশোরদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগের ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, শিশুর স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা বা নৈতিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর কাজ থেকে ১৮ বছরের কম বয়সীদের সুরক্ষা দেওয়া জরুরি।
আনন্দবাজারের মতো বর্জ্য ফেলার স্থানে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন শিশুশ্রম শনাক্তকরণ, ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে শিশুদের সরিয়ে আনা, বিদ্যালয়ে ফেরার সুযোগ তৈরি, দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য সামাজিক সহায়তা এবং নিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। একই সঙ্গে বর্জ্য সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত পরিবারগুলোর বিকল্প জীবিকা ও স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
আবর্জনার স্তূপের ওপর দিয়ে এগিয়ে যাওয়া শিশুটির ছবি তাই কেবল একটি কঠিন কর্মপরিবেশের দৃশ্য নয়। এটি এমন এক বাস্তবতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে, যেখানে জীবিকার প্রয়োজনে শিশুদের নিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাভাবিক শৈশব ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। প্রতিটি শিশুর অধিকার হলো নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠা, শিক্ষা লাভ করা এবং শোষণ ও বিপজ্জনক শ্রম থেকে সুরক্ষিত থাকা।
