অস্থিতিশীল পরিস্থিতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে ফ্রান্সে ব্যাপক বিক্ষোভের মধ্যেই উপসাগরীয় অঞ্চল সফরে গিয়ে বিরোধীদের সমালোচনার মুখে পড়েছেন প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে এই অস্থিরতা দেশটির রাজনৈতিক বিভাজন আরও স্পষ্ট করেছে।
দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে জ্বালানি সরবরাহ ও দাম নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরে যান ম্যাক্রোঁ। তাঁর লক্ষ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং হরমুজ প্রণালিতে স্থিতিশীলতা ও নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিয়ে আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করা।
এদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারি পরিষেবার অবনতির প্রতিবাদে দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের একপর্যায়ে সহিংসতা, ভাঙচুর ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে হয়। দাঙ্গা মোকাবিলায় প্রস্তুতির ঘাটতি নিয়ে সরকারের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছেন প্রধান শহরগুলোর মেয়ররাও।
সহিংসতার জন্য কট্টর-বামপন্থিদের দায়ী করেছেন প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু। তাঁর অভিযোগ, প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে উগ্র-বামপন্থিরা অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, বিরোধীরা সরকারের নিরাপত্তাব্যবস্থা ও সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
এই পরিস্থিতিতে ফ্রান্সের রাজনীতিতে বাম ও ডানপন্থি—উভয় শিবিরই নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে। বামপন্থি নেতা জ্যঁ-লুক মেলেশোঁর দল ফ্রান্স আনবাউড শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েছে। দলটির কর্মসূচিতে শিক্ষায় বিনিয়োগ, শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধি এবং উচ্চশিক্ষায় ভর্তির অনলাইন ব্যবস্থা পারকুরসুপ বাতিলের মতো দাবি রয়েছে।
লে একোর জন্য ওপিনিয়নওয়ের একটি জরিপে দেখা গেছে, ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী ভোটারদের মধ্যে মেলেশোঁর সমর্থন ৪৯ শতাংশ, যা ২০২২ সালের তুলনায় ১০ শতাংশ বেশি। তরুণদের একাংশের কাছে তাঁর প্রতি সমর্থন চরম ডানপন্থার বিরোধিতা এবং মধ্যপন্থি রাজনীতির প্রতি হতাশার প্রতিফলন।
অন্যদিকে, চরম ডানপন্থি নেত্রী মারিন লো পেন ও তাঁর ন্যাশনাল র্যালি দল বিক্ষোভের সহিংসতাকে আইনশৃঙ্খলা ও কর্তৃত্বের সংকট হিসেবে তুলে ধরছে। তারা সরকারকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ বলে অভিযুক্ত করেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে ৩২ শতাংশ সমর্থন নিয়ে এগিয়ে রয়েছেন লো পেন। তরুণ ভোটারদের মধ্যেও তাঁর দল দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে।
মেলেশোঁর সমর্থকেরা বলছেন, প্রচলিত মধ্যপন্থি নীতির বিকল্প প্রয়োজন। অন্যদিকে, লো পেনের শিবির অস্থিরতাকে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণক্ষমতা ও নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে দেখছে। এই দুই বিপরীত রাজনৈতিক অবস্থানের মাঝখানে চাপে রয়েছে ম্যাক্রোঁর মধ্যপন্থি জোট।
ম্যাক্রোঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরু ও শেষপর্ব—দুই সময়েই বড় সামাজিক আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাঁর শাসনামলের শুরুতে জ্বালানি করবৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন পরে জীবনযাত্রার ব্যয় ও অভিজাতদের প্রতি ক্ষোভের বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়। বর্তমান বিক্ষোভেও একই ধরনের অসন্তোষের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
তবে এবার সংকট মোকাবিলায় সরকারের আর্থিক সুযোগ সীমিত। গত বছর ফ্রান্সের বাজেট ঘাটতি ছিল জিডিপির ৫ দশমিক ১ শতাংশ, যেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড় ৩ দশমিক ১ শতাংশ। ফলে ভবিষ্যৎ সরকারকে জনক্ষোভ না বাড়িয়ে ব্যয় কমানোর কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম হওয়ায় এত দিন তাদের দাবি নির্বাচনী বিতর্কে যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। বর্তমান বিক্ষোভ সেই দাবিগুলোকে সামনে নিয়ে এসেছে। দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করায় ম্যাক্রোঁ ২০২৭ সালের নির্বাচনে আবার প্রার্থী হতে পারবেন না। ফলে চলমান অস্থিরতা শুধু তাঁর সরকারের জন্য নয়, ফ্রান্সের পরবর্তী রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্যও বড় পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।
এসএন/
