শেখ রোকন লেখক ও নদী-গবেষক এবং নদী, জলাভূমি ও পানিসম্পদবিষয়ক নাগরিক সংগঠন ‘রিভারাইন পিপল’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও মহাসচিব। সংবাদপত্রে জড়িত থাকার পাশাপাশি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা এবং বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমা ইউনিভার্সিটি, ভারতের সিকিম বিশ্ববিদ্যালয়, নেদারল্যান্ডসের আইএইচই ডেলফ্ট এবং ইউএনইসিই থেকে স্বল্পমেয়াদি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। তাঁর রচিত ও সম্পাদিত বেশ কিছু নদীবিষয়ক গ্রন্থ রয়েছে। এ বছর গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। চুক্তির অর্জন, সীমাবদ্ধতা, চুক্তি নবায়নের আশঙ্কাসহ নানা বিষয় নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন আজকের পত্রিকার মাসুদ রানা।
৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে এ বছরের ১১ ডিসেম্বর। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যে শীতল সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটে এই চুক্তি নবায়নের সম্ভাবনা কতটুকু?
চুক্তিটি নবায়নের আলাপ তো অনেক দিন ধরেই চলছে। বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশনে ‘গঙ্গা চুক্তি বাস্তবায়ন কারিগরি কমিটি’ রয়েছে।
এই বছর মে মাসে তারা তাদের ৯০তম বৈঠক করেছে। এ ছাড়া দেখবেন, শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকাকালে যখনই ভারতে গেছেন বা ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে এসেছেন, প্রতিবারই যৌথ ঘোষণায় একটা অনুচ্ছেদ থাকত যে, গঙ্গার পানি চুক্তি নবায়নের ব্যাপারে কারিগরি কমিটি কাজ করছে এবং তা যথাসময়ে করা হবে। কিন্তু বিষয়টি তখনো সহজ ছিল না। ভারতের দিক থেকে বলা হতো, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গঙ্গায় আগের মতো পানি নেই। সেই ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পঙ্কজ সরণ লিখেছিলেন, কেবল অভিন্ন নদীর পানিপ্রবাহ নয়, পানি ঘাটতিও বণ্টন হতে হবে। তার মানে, নবায়ন নিয়ে ভারত আগে থেকেই রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্যাঁচ দিচ্ছিল।
রাজনৈতিক প্যাঁচ কী রকম?
দেখবেন, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে নীতীশ কুমার বলেছিলেন, ফারাক্কা ব্যারাজ ভেঙে দেওয়া উচিত। কারণ, এটা বিহারে বন্যা ও ভাঙন তৈরি করছে। কিন্তু এখন তাঁরই দল জনতা দল ইউনাইটেড থেকে রাজ্যসভায় আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি তোলা হচ্ছে, গঙ্গা চুক্তি যেন নবায়ন না করা হয়। গত শুক্রবার দলটির পক্ষে পাটনায় কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে যে বিহারের গঙ্গার তীরবর্তী ১২টি জেলায় চুক্তি নবায়নবিরোধী সমাবেশ হবে। পশ্চিমবঙ্গের দিক থেকেও বিরোধিতা আছে; কিন্তু কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দলের সরকার থাকায় তারা প্রকাশ্যে মুখ খুলছে না। যদিও ভারতীয় পত্রিকারই খবর, কলকাতা ইতিমধ্যে দিল্লিকে দাপ্তরিকভাবে জানিয়ে দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে আলোচনা না করে চুক্তি নবায়ন করা যাবে না।
যে চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে, সেটার মূল্যায়নটা জানতে চাই?
এখন যে চুক্তিটা আছে, এর কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। প্রথমত, এটা একটা মেয়াদি চুক্তি। সমঝোতা বা ‘এগ্রিমেন্ট’ মেয়াদি হতে পারে, কিন্তু চুক্তি বা ‘ট্রিটি’ সাধারণত মেয়াদি হয় না। এমনকি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সিন্ধু নদীর পানি বণ্টন চুক্তিও মেয়াদি নয়, স্থায়ী। মেয়াদ থাকলেও সেটা ৭৫-১০০ বছর মেয়াদি হয়, যেমন ভারত ও নেপালের মহাকালী ট্রিটি। কিন্তু বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে গঙ্গা চুক্তি মাত্র ৩০ বছর মেয়াদি।
দ্বিতীয়ত, গঙ্গা অববাহিকায় অন্তত তিনটা দেশ আছে—নেপাল, ভারত ও বাংলাদেশ। গঙ্গার কোনো কোনো উপনদীর ক্ষেত্রে চীনও এই অববাহিকার অংশ। যেমন কিছুদিন আগে নেপালে যে ত্রিশুলি ও ভোতেকোশী নদীতে বিপর্যয় হলো, সেগুলোর উৎস চীনে। তার মানে, অন্তত তিনটা দেশ মিলে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু এটা দ্বিপক্ষীয়।
তৃতীয়ত, গঙ্গা চুক্তির প্রবাহ মাপা হয় ফারাক্কা পয়েন্টে। কিন্তু তার আগে আরও ২০০০ কিলোমিটার গঙ্গা আছে। ফারাক্কার উজানের পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খন্ড, বিহার, উত্তর প্রদেশ, উত্তরাখন্ড—এই পাঁচ রাজ্যে মোট ২৯টা ছোট-বড় প্রকল্প আছে। এগুলোর পানি প্রত্যাহারের ক্ষমতা ২ লাখ ৯২ হাজার কিউসেক। তার মানে, ফারাক্কায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার কিউসেক পানি ভাগাভাগি করছি আমরা, অথচ তার আগেই প্রায় চার গুণ পানি প্রত্যাহারের ক্ষমতাসম্পন্ন স্থাপনা রয়েছে। ফারাক্কা পয়েন্টের বদলে গোটা নদীর পানির হিসাব করা উচিত ছিল। তারপর তো ভাগাভাগি।
চতুর্থত, গঙ্গা চুক্তির মধ্যে কোনো সালিসি ব্যবস্থা নেই। এর ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, মতবিরোধ দেখা দিলে দুই পক্ষ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করবে। ওদিকে সিন্ধু চুক্তিতে বলা আছে, মতবিরোধ দেখা দিলে বিশ্বব্যাংক মীমাংসা করবে। অন্যান্য দেশের চুক্তিতেও সালিসি ব্যবস্থা থাকে, গঙ্গা চুক্তিতে নেই।
বর্তমান চুক্তির মেয়াদ ছিল ৩০ বছর। তিন দশকের বাস্তবতায় বাংলাদেশের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি কেমন ছিল?
চুক্তিতে পানি ভাগাভাগির যে ফর্মুলা ছিল, সেটা কারিগরিভাবে মোটামুটি কাজ করেছে। কিন্তু বিষয়টি প্রতিবেশগত দিক থেকে বুঝতে হবে। বাংলাদেশের প্রতিবেশব্যবস্থায় শত শত বছর ধরে যে পানি গঙ্গা দিয়ে আসত, সেখান থেকে ৩৫-৪০ হাজার কিউসেক পানি ফারাক্কা ব্যারাজের মাধ্যমে ৩০ বছর ধরে প্রত্যাহার করে ভাগীরথীতে নেওয়া হয়েছে। গঙ্গার সঙ্গে যে ভাগীরথীর সংযোগ ১০০ বছর আগেই শুকিয়ে গিয়েছিল, ওদিক দিয়ে সামান্য পানি যেত। তার মানে, ফারাক্কা ব্যারাজ স্থাপনের পর থেকে বাংলাদেশের গঙ্গায় ৩৫-৪০ হাজার কিউসেক পানি কম আসা শুরু হয়েছে। গঙ্গার পানি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মাথাভাঙ্গা, কুমার, ভৈরব, নবগঙ্গা, গড়াই, মধুমতী, চন্দনা নদী দিয়ে প্রবাহিত হতো। গঙ্গায় পানি কম আসায় এই নদীগুলো সব শুকিয়ে গেছে। গঙ্গার পানি এসব নদী দিয়ে সুন্দরবনে যেত। দেখা যাচ্ছে, সুন্দরবনে মিঠা পানি কম যাওয়ায় সেখানকার গাছে আগামরা রোগ দেখা দিয়েছে। উজান থেকে আসা মিঠা পানি লবণাক্ত পানিকে সাগরের দিকে ঠেকিয়ে রাখত। উজানের সেই চাপ কমে যাওয়ায় উপকূল থেকে উজানের দিকে লবণাক্ততা বাড়ছে।
এ ছাড়া আর কী প্রভাব রয়েছে?
গঙ্গায় যখন স্বাভাবিক প্রবাহ ছিল, সিলটেশন বা পলি বা তলানিপ্রবাহ সাগরে চলে যেত, সেখানে নতুন ভূমি গঠন হতো। কিন্তু পানি যখন ৩৫-৪০ হাজার কিউসেক কম আসছে, তখন পলির বড় অংশ সাগরে না গিয়ে মাঝপথে আটকে যাচ্ছে। নদী খাত উঁচু হয়ে যাচ্ছে। এতে একদিকে নৌচলাচল ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে ভাঙন বাড়ছে। যে কারণে গত ৫০ বছরে গঙ্গায় ভাঙন অনেক বেড়ে গেছে। নদীর পানিস্বল্পতা ও অগভীরতার প্রভাব মৎস্যসম্পদেও পড়ছে।
গঙ্গা নিয়ে ১৯৭৭ সালে আরেকটি চুক্তি হয়েছিল। দুই চুক্তির মধ্যে তুলনা করলে কী বলবেন?
দুই চুক্তিরই কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কোনো চুক্তিই আদর্শ চুক্তি হয়নি। ১৯৯৬ সালের চুক্তির চারটি সীমাবদ্ধতার কথা আগেই বলেছি। বরং ৩০ বছরের তুলনায় পাঁচ বছর মেয়াদ আরও কম। ১৯৭৭ ও ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে এগুলো ছাড়াও আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, এতে দুই দেশ মিলে শুকনো মৌসুমে গঙ্গায় প্রবাহ বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। ১৯৭৭ সালের চুক্তিতে তো শিরোনামেই বলা হয়েছে ‘অগমেন্টিং ইটস ফ্লোজ’। এর মানে দুই দেশ মিলে গঙ্গায় পানি বাড়াতে হবে। কীভাবে বাড়াবে? ভারত বলছে, ব্রহ্মপুত্র থেকে এক লাখ কিউসেক পানি নিয়ে গঙ্গায় দেওয়া হোক, বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে একটা খাল খনন করে। আবার বাংলাদেশ বলছে, নেপালে জলাধার তৈরি করে সেখান থেকে শুকনো মৌসুমে পানি বাড়ানো হোক। এটা একটা অদ্ভুত ব্যাপার। ভাটির দেশ কেন গঙ্গায় প্রবাহ বাড়ানোর দায়িত্ব নেবে?
দুটো চুক্তিই কেন শুধু দ্বিপক্ষীয় রাখা হলো? নেপাল ও চীনসহ চার দেশকে যুক্ত করে কেন আলাপটা তোলা হচ্ছে না?
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নিয়মিতই বলা হয়েছে চুক্তিটি ত্রিপক্ষীয় হলে ভালো হয়। চীনের কথা হয়তো বলা হয়নি, কিন্তু নেপালের কথা নিঃসন্দেহে বলা হয়েছে। অথচ ভারত বরাবরই বলছে, দ্বিপক্ষীয় হতে হবে। ভারতের রাষ্ট্রীয় নীতিই হলো, তারা নদী নিয়ে বহুপক্ষীয় চুক্তি চায় না। যেমন নদী নিয়ে ভারত-পাকিস্তান, ভারত-নেপাল, ভারত-ভুটান, ভারত-বাংলাদেশ চুক্তি রয়েছে। কিন্তু তারা তো উজানের দেশ। ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের নীতি হওয়া উচিত, আমরা বহুপক্ষীয় চুক্তি চাই। বাংলাদেশ এটা বরাবরই বলে আসছে, কিন্তু আরও দৃঢ়ভাবে বলা উচিত ছিল। অনেক সময় ‘স্যান্ডউইচ ডিপ্লোমেসি’ হয়। যেমন গঙ্গার ক্ষেত্রে আমরা ভাটিতে, মাঝে ভারত, তারও উজানে নেপাল। নেপাল ও বাংলাদেশ মিলে বহুপক্ষীয় চুক্তির জন্য ভারতকে চাপ দিত পারত। বাংলাদেশ সেটা করতে পারেনি। পারলে আমার মনে হয়, পরিস্থিতি আরেকটু ভালো হতো।
এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের সংকটটা কোথায়?
সংকটটা হলো, বাংলাদেশ পানি কূটনীতির ক্ষেত্রে দক্ষতার চেয়ে সরকারের পছন্দের লোকজনকে বেছে নেওয়া হয়। তাঁরা সরকারকে অপ্রিয় সত্য বলতে চান না। এ ক্ষেত্রে করণীয় হলো, রাজনৈতিক আনুগত্যের বদলে যাঁরা সত্যিকার অর্থে পানি কূটনীতি নিয়ে জানেন, কথা বলতে পারেন এবং বাংলাদেশের স্বার্থের প্রশ্নে ছাড় দেবেন না, তাঁদের যুক্ত করা। যেটা হওয়া উচিত, নদী বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা রাজনৈতিক নেতৃত্বকে প্রকৃত চিত্রটা বলবেন। অপ্রিয় হলেও সত্য কথাগুলো বলবেন। বাংলাদেশের স্বার্থ কিসে রক্ষা হবে, সেটা তাঁরা দৃঢ়তার সঙ্গে বলবেন। সেই জায়গায় আমাদের ঘাটতি আছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ১৯৭৭ সালের চুক্তিতে ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ ছিল। ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে তা বাদ পড়েছে। ভাটির দেশ হিসেবে এটি বাংলাদেশের পানি নিরাপত্তাকে কতখানি ঝুঁকিতে ফেলেছে?
এই গ্যারান্টি ক্লজের কথাটা এখন বেশি বলা হচ্ছে, কারণ বিএনপি ক্ষমতায়। ১৯৭৭ সালের চুক্তিটা জিয়াউর রহমানের সময়ে হয়েছিল। কথা হচ্ছে, গ্যারান্টি ক্লজ থাকতে হবে, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু ১৯৭৭ সালের চুক্তির মতো ১৯৯৬ সালের চুক্তিতেও গ্যারান্টি ক্লজ রয়েছে। যেমন, ১৯৭৭ সালের চুক্তির ২ নম্বর ধারায় আছে, পরিস্থিতি যা-ই হোক, বাংলাদেশ তার ভাগের ৮০ শতাংশ পানি পাবে। ১৯৯৬ সালের চুক্তির ১১ নম্বর ধারায় আছে, প্রবাহের পরিমাণ নিয়ে পর্যালোচনায় যদি কোনো সেটেলমেন্ট না আসে, বাংলাদেশ তার ভাগের ৯০ শতাংশ পানি পাবে। একই সঙ্গে ৯৬ সালের চুক্তিতে আছে, ফারাক্কা পয়েন্টে পানি ৫০ হাজার কিউসেকের নিচে নেমে আসলে উভয় পক্ষের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ হবে। যাঁরা বলেন ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে গ্যারান্টি ক্লজ নেই, তাঁরা সম্ভবত রাজনৈতিক অভিপ্রায় থেকে বলেন।
ফারাক্কা পয়েন্টে প্রবাহ ৫০ হাজার কিউসেকের নিচে নেমে গিয়েছিল কখনো?
এই রকম পরিস্থিতি আসলে হয়নি। চুক্তিটা হওয়ার পর গত ৩০ বছরে প্রবাহ ৫০ হাজার কিউসেকের নিচে নামেনি। এর কারণ, হিসাবটা করা হয়েছিল ১৯৪৯ সাল থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে তারিখের প্রবাহের গড় হিসাব থেকে। প্রায় ৪০ বছরের গড় প্রবাহের তথ্য ধরে। ফলে ওই পরিস্থিতিটা আসেনি।
বর্তমান গঙ্গা চুক্তির পূর্ণ সদ্ব্যবহার কি সম্ভব হয়েছে?
গঙ্গা চুক্তির দুটি ধারা বাংলাদেশ কখনোই কাজে লাগায়নি, অথচ লাগানো উচিত ছিল। একটা হচ্ছে, পাঁচ বছর পরপর চুক্তিটা পর্যালোচনা করা যাবে। এটা সম্ভবত ১০ নম্বর ধারায় আছে। দ্বিতীয়টা হলো, ৯ নম্বর ধারায় আছে, গঙ্গা চুক্তির আলোকে ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা ও কোনো পক্ষের ক্ষতি না করার নীতিতে দুই দেশের বাকি অভিন্ন নদীগুলোর চুক্তি সম্পন্ন হবে। সেই ধারাটাও আমরা প্রয়োগ করিনি। বিশেষত তিস্তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এই ধারা কাজে লাগাতে পারত।
আমরা কেন কাজে লাগাতে পারিনি?
আমার মনে হয়েছে, ’৯৬ সালে চুক্তিটা করার পর থেকে বাংলাদেশ আত্মতুষ্টিতে ভুগছে যে চুক্তি তো হয়ে গেছে, ৩০ বছর মানে অনেক দিন। আত্মতুষ্টির বদলে বরং এটাকে ক্রিটিক্যালি দেখা উচিত ছিল যে, কোন কোন জায়গায় আমাদের অসুবিধা হচ্ছে। সে জায়গাগুলো ধরে পাঁচ বছর পরপর চুক্তিটা রিভিউ করলে ভালো হতো।
গঙ্গা চুক্তিতে ফারাক্কা পয়েন্টের পানি পরিমাপ ও ভাগাভাগি করা হয়, উজানের পানি প্রত্যাহারের সামগ্রিক হিসাব না করে। এর পরিবেশগত তাৎপর্য কী?
এটা সত্য, পানির চাহিদা বাংলাদেশের যেমন, তেমন ভারতেও আছে। বাংলাদেশের প্রয়োজন হয়তো বেশি। কারণ ভারতে গঙ্গার শাখা ভাগীরথী আছে। কিন্তু এই শুধু পানি ভাগাভাগিও গঙ্গা চুক্তির একটা সীমাবদ্ধতা। এ ধরনের চুক্তিতে তিনটা পক্ষ থাকে—একটা উজানের দেশ, একটা ভাটির দেশ, আরেকটা নদী নিজে। গঙ্গা চুক্তির ক্ষেত্রে নদীকে কোনো পক্ষ ধরা হয়নি। অথচ নদীর নিজের জীবনের জন্যও তো পানি লাগবে। সব পানি যদি ভারত বা বাংলাদেশ তুলে নেয়, তাহলে নদীটা কোথায় যাবে? এই চুক্তিতে সেটা নেই। এ জন্যই এখন বলা হয়, অববাহিকাভিত্তিক চুক্তি হওয়া উচিত।
একটি পূর্ণাঙ্গ অববাহিকাভিত্তিক চুক্তির জন্য কী করতে হতো?
অববাহিকাভিত্তিক চুক্তির মানে হলো, আপনি শুধু পানি ভাগ করবেন না, সুফল ভাগ করবেন। যেমন পানি দিয়ে আমরা কী করি? সুপেয় পানি, গৃহস্থালি, শিল্প ও কৃষিতে ব্যবহার করি, নৌ চলাচল করি। যদি শুধু পানি ভাগাভাগি করা হয়, তাহলে নদীটা মরে যাবে, ক্ষতিগ্রস্ত হবে। গঙ্গার ক্ষেত্রে পানি ভাগাভাগি করতে গিয়ে ফারাক্কা পয়েন্টের ভাটির অংশে নদীটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেছে। যেমন ‘মেকং রিভার কমিশন’ চুক্তি চারটা দেশ মিলে করেছে। থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও লাওস। একই অববাহিকার হওয়ায় চীন ও মিয়ানমার পর্যবেক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছে। এটা অববাহিকাভিত্তিক চুক্তি। মেকং চুক্তিতে নৌ চলাচল, মৎস্যসম্পদ, জ্বালানি, সুপেয় পানির ব্যবহার তো আছেই, এমনকি ভেলা বানিয়ে বাঁশ পরিবহনের ব্যাপারও আছে। তারপর নদীর দুই পাড়ের কৃষির কী হবে, দুই পাড়ের পাহাড়ের কী হবে, দুই পাড়ের জীববৈচিত্র্যের কী হবে, হরিণের কী হবে, সেগুলো পর্যন্ত আছে। এটাই সত্যিকার অববাহিকাভিত্তিক চুক্তি। পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা হচ্ছে গঙ্গার দুই পাড়ের জনপদগুলো। সেখানে অববাহিকাভিত্তিক চুক্তি আরও বেশি দরকার ছিল। কারণ, এত মানুষের মধ্যে আপনি শুধু নদী ভাগাভাগি করতে পারবেন না, নদীর সুফলটাও ভাগাভাগি করতে হবে।
কেন আমরা অববাহিকাভিত্তিক চুক্তি করিনি?
মজার ব্যাপার হলো, ২০১০ সালে শেখ হাসিনার দিল্লি সফরের যৌথ ঘোষণায় প্রথম অববাহিকাভিত্তিক ব্যবস্থাপনার কথা বলা হয়েছিল। ২০১১ সালে মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময়ও অববাহিকাভিত্তিক ব্যবস্থাপনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ে আলোচনা হওয়ার পরও গত ১৬ বছরে সেটা হয়নি। এর কারণটা রাজনৈতিক। বিশেষজ্ঞদের রাজনৈতিক আনুগত্যের কারণে পানি কূটনীতির ব্যাপারে প্রকৃত চিত্রে আসে না, প্রকৃত দর-কষাকষিটাও হয় না।
আপনি বলছেন যে আমাদের দিক থেকে যাঁরা প্রতিনিধিত্ব করেন, আমলা বা বিশেষজ্ঞ, তাঁরা রাজনৈতিক আনুগত্যের কারণে অপ্রিয় কথা বলেন না। কিন্তু সরকারের এসব বুঝতে ঘাটতি কোথায়?
রাজনৈতিক নেতৃত্ব তো দেশের স্বার্থটা দেখবে। কারিগরি ব্যাপারগুলো তারা তো বুঝবে না, তাদের ধরিয়ে দিতে হবে যে আমাদের ঘাটতির জায়গাগুলো কী। বি এম আব্বাস এ টি-র একটা বই আছে, ‘দ্য গঙ্গাস ওয়াটার ডিসপিউট’। বি এম আব্বাস পাকিস্তান আমল থেকে আশির দশক পর্যন্ত আমাদের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ওই বইয়ে তিনি বলছেন, রাজনীতিবিদেরা কীভাবে বারবার ভুল করেন। তিনি ধরিয়ে দিয়েছেন যে এটা করা উচিত হবে কি হবে না। এই কারিগরি দায়িত্ব হলো বিশেষজ্ঞদের। ভারতীয় নদীবিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্রের একটা বই আছে ‘গঙ্গা ভাঙন কথা’। ছোট্ট একটা বই। এই বইয়ের মধ্যে তিনি দেখিয়েছেন, ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে উজানে ভাঙন কীভাবে বাড়ছে। কারণ, ওখানেও পলি আটকে যাচ্ছে। গঙ্গার সমান্তরালে পাগলা নদী এসে বাংলাদেশে ঢুকছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ দিয়ে। তিনি লিখেছেন, ফারাক্কার উজানে এভাবে ভাঙতে থাকলে গঙ্গা আর পাগলা নদী মিলে যাবে। তখন গঙ্গা নদী ফারাক্কা ব্যারাজকে এড়িয়ে ভাটির বাংলাদেশে চলে যাবে। তার পরিপ্রেক্ষিতে ভারত সরকার ও পশ্চিমবঙ্গ সরকার ভাঙন ঠেকানোর ব্যবস্থা নিয়েছে। বাংলাদেশের দিক থেকে আমরা বলতে পারি, ‘আচ্ছা, ভাঙলে তো ভালোই হতো’। কিন্তু ভারতের দিক থেকে যদি দেখেন, রাজনীতিবিদেরা হয়তো জানেন না, কিন্তু একজন বিশেষজ্ঞ প্রকৃত সত্যটা বলছেন, বই লিখছেন। বাংলাদেশে আমরা সেই ঘাটতিটা অনুভব করি।
নীতি ও চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে দ্বিপক্ষীয় মতপার্থক্য তৈরি হলে, এর জন্য বর্তমান চুক্তিতে কোনো আইনি সালিসি ধারা নেই। ভবিষ্যৎ চুক্তিতে বিরোধ নিষ্পত্তির কাঠামো কেমন হওয়া প্রয়োজন?
ভবিষ্যতে নতুন চুক্তিতে অবশ্যই বিরোধ নিষ্পত্তির কাঠামো থাকা উচিত। একটা থার্ড পার্টি থাকা উচিত। সে ক্ষেত্রে জাতিসংঘ একটা খুব বড় ভূমিকা রাখতে পারে। জাতিসংঘের দুটি কনভেনশন আছে: একটা ‘ইউএন ওয়াটার কনভেনশন ১৯৯২ ’, আরেকটা ‘ইউএন ওয়াটারকোর্সেস কনভেনশন ১৯৯৭’। আমরা বাংলায় বলি ‘জাতিসংঘ পানি সনদ’ আর ‘জাতিসংঘ পানিপ্রবাহ সনদ’। বাংলাদেশ গত বছর জুন মাসে ১৯৯২ সালেরটা স্বাক্ষর করেছে। এখন নতুন চুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দাবি হওয়া উচিত, চুক্তিটা জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় হবে এবং কোনো সালিশের ব্যাপার হলে আমরা জাতিসংঘের কাছে যাব।
বঙ্গোপসাগর নিয়ে আমাদের যে বিরোধ ছিল, সেটা আমরা আন্তর্জাতিক আদালতে নিষ্পত্তি করেছি। সেই প্রসঙ্গ ধরে বলতে চাইছি, নবায়নের সময় প্রায় শেষের দিকে, অথচ সম্ভাবনার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চুক্তি নবায়ন না হয় অথবা নতুনভাবে চুক্তিও না হয়, সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের করণীয় কী হতে পারে?
নতুনভাবে চুক্তির কথা সরকার বলছে, কেউ কেউ প্রত্যাশা করছেন। আমার মতে, নবায়নের বদলে নতুন করে চুক্তির চিন্তা আত্মঘাতী হবে। কারণ, নতুনভাবে চুক্তির আলোচনা দীর্ঘ সময় ধরে চলবে। এখনই তো নদীর অবস্থা খারাপ, পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটবে। গঙ্গা নিয়ে চুক্তি ছিল না ১৯৮৪ সাল থেকে ৯৬ সাল পর্যন্ত। তখন পানিপ্রবাহ কখনো কখনো ১০ হাজার কিউসেকের নিচে নেমে এসেছিল। তিস্তা নিয়ে আমাদের এখনো চুক্তি নেই। তিস্তায় কী অবস্থা, আপনি জানেন। নদী সারা বছর শুকনো থাকে, বর্ষাকালে পানি আসলে ভাঙন দেখা দেয়। গঙ্গার ক্ষেত্রেও একই অবস্থা হবে, যদি চুক্তি না থাকে। সে কারণে ওয়াটার ডিপ্লোমেসিতে বলা হয়, চুক্তি না থাকার চেয়ে সীমাবদ্ধতাসহ একটা চুক্তি থাকা ভালো। মানে চুক্তি না থাকার চেয়ে খোঁড়া চুক্তি থাকা ভালো। আমি মনে করি, এখন যে চুক্তিটা আছে, এটাই নবায়ন হতে হবে। তারপর পরে গিয়ে আমরা পর্যালোচনা করব, কোন কোন ধারায় আমরা কী যোগ বা বিয়োগ করতে পারি, কোন কোন ধারা সংশোধন বা পরিমার্জন করতে পারি। কিন্তু এই অবস্থায় যদি চুক্তি না হয়, তাহলে বাংলাদেশের জন্য বা যেকোনো ভাটির দেশের জন্য সেটা বিপজ্জনক হবে।
সে ক্ষেত্রে আমরা কী করতে পারি?
সে ক্ষেত্রে আমরা বলতে পারি, চুক্তি যা আছে, সেটা অ্যাজ ইট ইজ নবায়ন হোক, তারপর গিয়ে আমরা পর্যালোচনা করব। আপনি দেখবেন, ১৯৭৭ সালের চুক্তির মেয়াদ ১৯৮২ সালের ৪ নভেম্বর শেষ হওয়ার কথা ছিল। যদিও চুক্তিতে মেয়াদ বৃদ্ধির সুযোগ ছিল, ভারত সেটা মানছিল না। ১৯৮২ সালের অক্টোবরে দুই দেশ একটা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছিল। ১৯৮৪ সালের শুকনো মৌসুমের মধ্যে পর্যালোচনার পর নতুন চুক্তি হতে পারে। আমার ধারণা, এখনো সেটা হতে পারে। নবায়ন করে তারপর পর্যালোচনা করতে পারলে ভালো। আর না পারলে অন্তত এই চুক্তিটা অব্যাহত রাখার জন্য একটা স্বল্পমেয়াদি সমঝোতা হতে পারে। কিন্তু কোনোভাবেই নতুন চুক্তির চিন্তা করা উচিত হবে না। এটা আত্মঘাতী হবে। এটা একটা ফাঁদ। অতীতে গঙ্গা ও তিস্তার ক্ষেত্রে এটা প্রমাণিত হয়েছে। নতুন চুক্তি করার অপেক্ষার ওই ফাঁদে পা দেওয়া আমাদের উচিত হবে না।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে মোট ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে...
প্রথম কথা হচ্ছে, বাংলাদেশের প্রস্তুতি কতটা দুর্বল, এর একটা প্রমাণ হলো অভিন্ন নদীর দাপ্তরিক সংখ্যা। আপনি, আমি, আমরা সবাই জেনে আসছি যে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫৪টা অভিন্ন নদী আছে। রিভারাইন পিপলের গবেষণা আছে। সে গবেষণা মতে, আসলে আমাদের অন্তত ১২৬টা অভিন্ন নদী আছে। কিছু গবেষক বলেন, আরও বেশি। তার মানে, ভাটির দেশ জানেই না তার কতটা অভিন্ন নদী রয়েছে। আপনি ১২৬টা নদীকে ৫৪টা বললে প্রথমেই সংখ্যাগত দিক থেকে হেরে যাচ্ছেন। বাকি যে নদীগুলো আছে, সেগুলোর কী হবে?
শুষ্ক মৌসুমে আমাদের নদীগুলো পানি পাচ্ছে না, অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমে আকস্মিক বন্যা দেখা যাচ্ছে। তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর ক্ষেত্রে পানিবণ্টন চুক্তি কতটা জরুরি? এসব নদীর ক্ষেত্রে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া যায়, আমাদের করণীয় কী হতে পারে?
নদী নিয়ে বাংলাদেশ-ভারত চুক্তির ক্ষেত্রে কাকতালীয়ভাবে ২৫ বছরের একটা সাইকেল আছে। আমরা গঙ্গা নিয়ে যে প্রথম চুক্তি করেছিলাম, সেটার আলোচনা শুরু হয়েছিল ১৯৬২ সালে। তারপর ৭৭ সালে চুক্তি হয়েছে। তারপর ১৯৮১ সালে আলোচনা শুরু করে ১৯৯৬ সালে গিয়ে চুক্তি পেয়েছি। তিস্তার ক্ষেত্রে প্রথম একটা অ্যাডহক ব্যবস্থা হয়েছিল ’৮৩ সালে, সেটাও ২৫ বছরের আলোচনার পরে। এ ছাড়া ফেনী ও কুশিয়ারা নদী নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যে দুটি সমঝোতা রয়েছে, এ নিয়েও প্রায় ২৫ বছর ধরে আলোচনা হয়েছে। এই ২৫ বছরের আলোচনাকে যদি আমরা স্ট্যান্ডার্ড ধরি, তাহলে ৫৪টা নদীকে যদি ২৫ বছর ধরে আলোচনা করে আমরা ৫৪টা চুক্তি করতে চাই, তাহলে সময় লাগবে ১,৩৫০ বছর। আর যদি ১২৬টা ধরি, তাহলে ৩,১৫০ বছর লাগবে। আমি কি ১,৩৫০ বছর, ৩,১৫০ বছর ধরে আলোচনা করে চুক্তি করব? এটা তো কোনো স্ট্যান্ডার্ড হতে পারে না।
তাহলে কী করতে হবে?
যেটা করতে হবে, সেটা হলো অববাহিকাভিত্তিক চুক্তি। অববাহিকাভিত্তিক চুক্তিটা কী? ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে তিনটা চুক্তি হবে: গঙ্গা অববাহিকা চুক্তি, ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা চুক্তি, মেঘনা অববাহিকা চুক্তি। এর মধ্যে গঙ্গার যত উপনদী, শাখানদী আছে, সব গঙ্গা চুক্তির সঙ্গে যুক্ত হবে। ব্রহ্মপুত্রের যত উপনদী, শাখানদী আছে, সব ব্রহ্মপুত্র চুক্তির সঙ্গে যুক্ত হবে। মেঘনা ও বরাকের ক্ষেত্রেও তা-ই হবে। তার মানে, তিন চুক্তি করাটা সহজ। এর নজির ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে রয়েছে। আমরা একে সিন্ধু চুক্তি বলি। আসলে শুধু সিন্ধু নদী নিয়ে নয়। সিন্ধুসহ আরও পাঁচটা নদী মিলে মোট ছয়টা নদী তারা ভাগাভাগি করেছে। তিনটা পূর্বাঞ্চলীয় নদী ভারত ব্যবহার করবে, তিনটা পশ্চিমাঞ্চলীয় নদী পাকিস্তান ব্যবহার করবে। ভারতের সঙ্গে নদীভিত্তিক আলোচনা করে চুক্তি করতে যাওয়াটা খুব বিপজ্জনক। কারণ, তারা দীর্ঘ সময় লাগায়। আমার মত হচ্ছে, ৫৪টা হোক বা ১২৬টা হোক বা আরও বেশি হোক, সবগুলো মিলে সর্বোচ্চ তিনটা চুক্তি হতে পারে।
আমাদের উজানের আরও দুটি রাষ্ট্রকে তো আমরা এখানে পাচ্ছি না। এ ক্ষেত্রে করণীয় কী?
এ ক্ষেত্রে ব্রহ্মপুত্রের উদাহরণ দিই। ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় চারটা দেশ আছে: চীন, ভুটান, ভারত ও বাংলাদেশ। ব্রহ্মপুত্র আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নদী। উজান থেকে অভিন্ন নদী দিয়ে যত পানি আসে, তার ৬৭ শতাংশ আসে ব্রহ্মপুত্র দিয়ে। এই নদী নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কোনো দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থা নেই। ব্রহ্মপুত্র নিয়ে ভারত ও ভুটানের মধ্যে ব্যবস্থাপনা আছে। চীন ও ভারতের মধ্যে ব্যবস্থা আছে। বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যেও ব্যবস্থা আছে। বাংলাদেশ ও ভুটানের মধ্যেও ব্যবস্থা আছে। দেখা যাচ্ছে, সবগুলো দেশের সঙ্গে সবগুলো দেশের দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থা আছে। এটাকে শুধু বহুপক্ষীয় করা দরকার। একটা ব্রহ্মপুত্র কমিশন হতে পারে, যেখানে চীন থাকবে, ভুটান থাকবে, ভারত থাকবে, বাংলাদেশ থাকবে। গঙ্গার ক্ষেত্রেও একটা কমিশন হতে পারে, যেখানে চীন যদি নাও থাকে, নেপাল, ভারত ও বাংলাদেশ মিলে হওয়া উচিত।
