বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি, জীবনমান, অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে জলাভূমির সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। আর সেই জলাভূমি ব্যবস্থার সবচেয়ে স্বতন্ত্র ও গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো হাওর। হাওর হলো বাটি বা গামলা আকৃতির এক বিশাল ও প্রশস্ত জলাভূমি, যা ভৌগোলিক গঠনের কারণে নিচু বা অবনমিত স্থান হিসেবে পরিচিত।
হাওর মূলত বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোণা জেলার বিস্তীর্ণ নিম্নভূমিতে অবস্থিত। বর্ষায় বিস্তীর্ণ জলরাশি, শুষ্ক মৌসুমে কৃষিজমি, মাছের বিচরণ ও প্রজননক্ষেত্র, পরিযায়ী পাখির আবাসস্থল এবং লাখো মানুষের জীবন-জীবিকার অবলম্বন- সব মিলিয়ে হাওর একটি বহুমাত্রিক পরিবেশব্যবস্থা।
তাই হাওরকে কেবল ‘জলাবদ্ধ এলাকা’ কিংবা ‘কৃষিজমি’ হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব অনুধাবন করা সম্ভব নয়। হাওর একই সঙ্গে প্রকৃতির জলাধার, জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল, খাদ্য ও অর্থনীতির উৎস এবং স্থানীয় মানুষের জীবন-সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
২০২৬ সালে প্রণীত ‘বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণ আইন’ হাওর ও জলাভূমির পরিবেশ, প্রতিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্র সুরক্ষা, সংরক্ষণ ও উন্নয়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি কাঠামো তৈরি করেছে। এই আইনে হাওর ও জলাভূমির তালিকা, সীমানা নির্ধারণ, সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা এবং ব্যবস্থাপনার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কিন্তু আইন প্রণয়নই শেষ কথা নয়, এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- আইন ও পরিকল্পনার পাশাপাশি আমরা কীভাবে হাওরকে বাস্তব অর্থে রক্ষা ও সংরক্ষণ করব?
হাওর কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? হাওর প্রকৃতির একটি বিশাল জলাধার এবং একই সঙ্গে একটি জীবন্ত পরিবেশব্যবস্থা। বর্ষাকালে এটি বিপুল পরিমাণ পানি ধারণ করে; আবার শুষ্ক মৌসুমে সেই পানি কৃষি, মৎস্য, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের বিভিন্ন প্রয়োজন পূরণে ভূমিকা রাখে।
হাওরের সঙ্গে কৃষি ও মৎস্যসম্পদের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। একটি হাওরের পানিপ্রবাহ, মাছের প্রজননক্ষেত্র, জলজ উদ্ভিদ, পাখির আবাসস্থল ও কৃষিজমি- সবকিছুই পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। ফলে একটি উপাদানের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হলে তার প্রভাব অন্য উপাদানেও পড়ে। এ কারণেই হাওর রক্ষার প্রশ্নটি শুধুই পরিবেশ সংরক্ষণের প্রশ্ন নয়; এটি কৃষি, মৎস্য, পানিসম্পদ, জীববৈচিত্র্য, খাদ্যনিরাপত্তা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির প্রশ্ন।
জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির ( (ইউএনইপি) বাংলাদেশভিত্তিক উদ্যোগেও হাওর অঞ্চলের জলাভূমি থেকে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পাওয়া বিভিন্ন ইকোসিস্টেম সার্ভিস এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষি ও মৎস্যসম্পদের ওপর সৃষ্ট ঝুঁকির কথা তুলে ধরা হয়েছে।
উন্নয়ন চাই, তবে হাওরের স্বাভাবিক প্রবাহ নষ্ট করে নয়
হাওর অঞ্চলে উন্নয়ন প্রয়োজন- এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। যোগাযোগব্যবস্থা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, বাজার, কৃষি ও প্রযুক্তিগত সুবিধার সম্প্রসারণ স্থানীয় মানুষের জীবনমান উন্নত করতে পারে। কিন্তু উন্নয়ন পরিকল্পনা যদি হাওরের প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ ও পরিবেশব্যবস্থাকে বিবেচনায় না নেয়, তাহলে সেই উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে নতুন সংকট তৈরি করতে পারে। সড়ক, বাঁধ, অপরিকল্পিত স্থাপনা, জলাশয় ভরাট, পানিপ্রবাহে বাধা, অতিরিক্ত পানি উত্তোলন, দূষণ এবং জলজসম্পদের অতিরিক্ত আহরণ- এসব কর্মকাণ্ড কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকার সমস্যা মনে হলেও এর সম্মিলিত প্রভাব পুরো হাওর ব্যবস্থায় পড়ছে।
তাই হাওর এলাকায় বড় কোনো অবকাঠামো বা উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের আগে শুধু প্রকল্পের তাৎক্ষণিক সুবিধা নয়; পানিপ্রবাহ, জীববৈচিত্র্য, মাছের প্রজনন, কৃষি, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং ভবিষ্যৎ জলবায়ু পরিস্থিতির ওপর এর প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে। উন্নয়ন ও সংরক্ষণকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ হিসেবে নয়, বরং একই পরিকল্পনার দুটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
গবেষণা ছাড়া হাওর সংরক্ষণ সম্ভব নয়, হাওর রক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে গবেষণা ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ। কোন হাওরে কতটুকু পানি থাকে? হাওরের কোন স্থান দিয়ে পানি প্রবেশ করে এবং বের হয়? কোথায় মাছের প্রজননক্ষেত্র? কোন এলাকায় পাখির আবাসস্থল? কোন জলজ উদ্ভিদ ঝুঁকিতে? কোথায় পলি জমছে? কোথায় পানি ও পরিবেশ দূষণ বাড়ছে? পানি দূষণের কারণ? কৃষি ও মৎস্যসম্পদের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের কী প্রভাব পড়ছে? এসব প্রশ্নের উত্তর অনুমাননির্ভরভাবে নয়, নিয়মিত বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে খুঁজে বের করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। হাওরপারের মানুষের স্থানীয় ও ঐতিহ্যগত জ্ঞানকেও বৈজ্ঞানিক গবেষণার সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন। কারণ বহু প্রজন্ম ধরে হাওরের পানি, মাছ, কৃষি, আবহাওয়া ও প্রকৃতির পরিবর্তন সম্পর্কে স্থানীয় মানুষের যে অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছে, তা মূল্যবান গবেষণা উপাদান হতে পারে।
প্রয়োজন ‘হাওর অবজারভেটরি’ প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ হাওরের জন্য দীর্ঘমেয়াদি Haor Ecological Observatory বা হাওর পরিবেশ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। এ ব্যবস্থার আওতায় নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করা; পানির গভীরতা ও পানির মান; মাছের প্রজাতি ও প্রজনন পরিস্থিতি; জলজ উদ্ভিদ ও পাখির বৈচিত্র্য; কৃষিজ উৎপাদন ও ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন; নদী ও খালের নাব্য; পলি জমার প্রবণতা; দূষণের উৎস; বন্যা ও আকস্মিক বন্যার ধরন; জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। স্যাটেলাইট ছবি, GIS, ড্রোন জরিপ এবং মাঠপর্যায়ের তথ্য একত্র করে তৈরি করা যেতে পারে একটি ডিজিটাল হাওর ডেটাবেজ। এর ফলে কোনো হাওরের পরিবেশগত পরিবর্তন অনুমানের ভিত্তিতে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে।
জলাভূমিকে ‘খালি জায়গা’ ভাবার সংস্কৃতি বদলাতে হবে। আমাদের উন্নয়ন চিন্তায় একটি বড় সমস্যা হলো- অনেক সময় জলাভূমিকে অব্যবহৃত বা খালি জায়গা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অথচ একটি জলাভূমির নিজস্ব পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক মূল্য রয়েছে। একটি জলাভূমি হয়তো কোনো কারখানার মতো সরাসরি রাজস্ব তৈরি করছে না; কিন্তু সেটি বন্যার পানি ধারণ করছে, মাছের প্রজননক্ষেত্র হিসেবে কাজ করছে, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করছে এবং স্থানীয় মানুষের খাদ্য ও আয়ের উৎস তৈরি করছে। অর্থাৎ জলাভূমির একটি অদৃশ্য অর্থনৈতিক মূল্য রয়েছে। উন্নয়ন পরিকল্পনায় সেই মূল্যকে হিসাবের মধ্যে আনতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় নতুন চিন্তা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব হাওর অঞ্চলের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বন্যা, অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা কিংবা শুষ্ক মৌসুমে পানির স্বল্পতা কৃষি, মৎস্য এবং মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলতে পারে।
ইউএনইপির গবেষণা ও প্রকল্প নথিতেও হাওর অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যা, ক্ষয়, পলি জমা এবং কৃষি ও মৎস্যসম্পদের ওপর সম্ভাব্য ক্ষতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে Ecosystem-based adaptation বা প্রতিবেশভিত্তিক অভিযোজনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তাই হাওর উন্নয়নকে এখন Climate-resilient Haor Development ধারণার সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন। শুধু বাঁধ নির্মাণ বা অবকাঠামো তৈরি করে সব সমস্যার সমাধান করা যাবে না। কোথায় পানি থাকবে, কোথায় কৃষি হবে, কোথায় মাছের অভয়াশ্রম থাকবে এবং কোথায় প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে—এসব বিবেচনায় নিয়ে অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনা করতে হবে।
স্থানীয় মানুষকে বাদ দিয়ে সংরক্ষণ সম্ভব নয়, হাওরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হাওরপাড়ের মানুষ। জেলে, কৃষক, নৌকার মাঝি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, নারী, তরুণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন সরাসরি হাওরের সঙ্গে যুক্ত। তাদের অংশগ্রহণ ছাড়া হাওর সংরক্ষণ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না। ‘মানুষ বনাম প্রকৃতি’ এমন ধারণার পরিবর্তে প্রয়োজন- মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থানভিত্তিক সংরক্ষণনীতি। নির্দিষ্ট মৌসুমে মাছের প্রজননক্ষেত্র রক্ষার পাশাপাশি জেলেদের বিকল্প আয় নিশ্চিত করা, পরিবেশবান্ধব কৃষি সম্প্রসারণ, স্থানীয় পর্যায়ে হাওর পর্যবেক্ষণ দল গঠন এবং হাওরের প্রকৃতি ও সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে দায়িত্বশীল পর্যটনের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে।
আইন আছে, এখন প্রয়োজন সেই আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন। ‘বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণ আইন ২০২৬’ হাওর ও জলাভূমির পরিবেশ ও প্রতিবেশ সুরক্ষার জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দিয়েছে। এই আইনে কিছু ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার বিধানও রয়েছে। যেমন- এমনভাবে পানি উত্তোলন বা ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যার ফলে পানিধারক স্তরের নিরাপদ সীমা ব্যাহত হয় কিংবা জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এখন মূল চ্যালেঞ্জ হবে কার্যকর প্রয়োগ, আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি। হাওর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে পানিসম্পদ, পরিবেশ, কৃষি, মৎস্য, ভূমি, স্থানীয় সরকার ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মতো একাধিক খাত জড়িত। তাই একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনা কাঠামো ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি ফল পাওয়া কঠিন।
প্রয়োজন ‘হাওর গবেষণা তহবিল’
হাওর নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও বেশি সম্পৃক্ত করতে জাতীয় পর্যায়ে একটি Haor Research Fund বা হাওর গবেষণা তহবিল গঠন করা। যা থেকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে- ১. হাওরের জীববৈচিত্র্য গবেষণা; ২. জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব; ৩. পানিপ্রবাহ ও নদী-হাওর সম্পর্ক; ৪. মৎস্যসম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা; ৫. পরিবেশবান্ধব কৃষি; ৬. হাওর অর্থনীতি ও মানুষের জীবন-জীবিকা; ৭. GIS ও Remote Sensing-ভিত্তিক হাওর পর্যবেক্ষণ; ৮. জলাভূমি পুনরুদ্ধার; ৯. স্থানীয় ও ঐতিহ্যগত জ্ঞানের সংরক্ষণ; এবং ১০. হাওরভিত্তিক টেকসই পর্যটন শিল্প।
এভাবে হাওরকে শুধু সংরক্ষণের বিষয় হিসেবে নয়, গবেষণা, উদ্ভাবন ও টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্র হিসেবেও গড়ে তোলা সম্ভব।
আমাদের করণীয় হাওর রক্ষায় একটি দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনার আওতায় কয়েকটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া। প্রথমত, প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ হাওরের পূর্ণাঙ্গ পরিবেশগত ইনভেন্টরি তৈরি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, হাওরের পানিপ্রবাহ ও প্রাকৃতিক সংযোগ পুনরুদ্ধার করতে হবে। তৃতীয়ত, যথাযথ পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন ছাড়া বড় অবকাঠামো নির্মাণ থেকে বিরত থাকতে হবে। চতুর্থত, মাছের প্রজননক্ষেত্র ও গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্য অঞ্চল কার্যকরভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। পঞ্চমত, স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনার অংশীদার করতে হবে। ষষ্ঠত, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে মাঠভিত্তিক গবেষণায় যুক্ত করতে হবে। সপ্তমত, প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ হাওরের জন্য নির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা এবং নিয়মিত পরিবেশগত অডিট চালু করা যেতে পারে। অষ্টমত, হাওরভিত্তিক উন্নয়ন প্রকল্পের সাফল্য শুধু কত টাকা ব্যয় হয়েছে বা কত কিলোমিটার সড়ক নির্মিত হয়েছে- তা দিয়ে পরিমাপ না করে পরিবেশগত, অর্থনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক ফলাফল দিয়ে মূল্যায়ন করতে হবে।
সর্বোপরি হাওর এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
পরিশেষে হাওর শুধু পানি, মৎস্যসম্পদ কিংবা ফসলের উৎস নয়- হাওর একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রকৃতি, কৃষি, মৎস্য, জীববৈচিত্র্য, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং মানুষের ভবিষ্যৎ। তাই হাওর রক্ষার উদ্যোগকে শুধু আবেগনির্ভর আন্দোলনে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। প্রয়োজন গবেষণানির্ভর জ্ঞান, বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনা, শক্তিশালী আইন, কার্যকর প্রয়োগ এবং স্থানীয় মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ।
আজ আমরা যে হাওরকে দেখছি, সেটি শুধু আমাদের প্রজন্মের সম্পদ নয়; এটি আগামী প্রজন্মেরও অধিকার। হাওরকে বাঁচাতে হলে হাওরকে জানতে হবে, হাওরকে জানতে হলে গবেষণা করতে হবে। আর গবেষণার ফলকে কাজে লাগাতে হলে উন্নয়ন ও সংরক্ষণকে একই কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। এই লক্ষ্যেই ‘হাওর রক্ষা, গবেষণা, উন্নয়ন ও জলাভূমি সংরক্ষণ ফোরাম’ একটি জ্ঞানভিত্তিক গবেষণানির্ভর ও জনসম্পৃক্ত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করতে পারে- যেখানে হাওর রক্ষা শুধু একটি স্লোগান নয়; বরং গবেষণা, নীতি-পরামর্শ, জনসচেতনতা, স্থানীয় অংশগ্রহণ এবং বাস্তব কর্মসূচির সমন্বিত একটি উদ্যোগ। হাওর বাঁচলে জলাভূমি বাঁচবে, জলাভূমি বাঁচলে জীববৈচিত্র্য বাঁচবে, আর প্রকৃতি বাঁচলে মানুষের ভবিষ্যৎও নিরাপদ হবে।
লেখক: জনসংযোগবিদ ও গবেষক, সহকারী পরিচালক, জনসংযোগ দপ্তর, নেত্রকোণা বিশ্ববিদ্যালয়
