কোনো কোনো পণ্যের দাম দেড় থেকে আড়াই গুণ পর্যন্ত বেড়েছে
রাজশাহীতে তথ্যপ্রযুক্তি পণ্যের মূল্য ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে বিপাকে পড়েছেন এই প্রযুক্তি নিয়মিত ব্যবহারকারী সাধারণ গ্রাহকরা। ক্ষেত্রবিশেষে একেকটি পণ্যের দাম দেড় থেকে আড়াই গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানা গেছে।
বিশেষ প্রতিনিধি, রাজশাহী
রাজশাহীতে তথ্যপ্রযুক্তি পণ্যের মূল্য ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে বিপাকে পড়েছেন এই প্রযুক্তি নিয়মিত ব্যবহারকারী সাধারণ গ্রাহকরা। ক্ষেত্রবিশেষে একেকটি পণ্যের দাম দেড় থেকে আড়াই গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানা গেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, কম্পিউটারের প্রসেসর, মাদারবোর্ড, র্যাম, গ্রাফিকস কার্ড কিংবা স্টোরেজ ডিভাইস- এরকম প্রতিটি যন্ত্রাংশ কিনতে গিয়েই বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে ক্রেতাদের। কেবল মূল্য বৃদ্ধিই নয়, তিন গুণ বাজেট বাড়িয়েও পছন্দের মডেল বা কাক্সিক্ষত যন্ত্র বা যন্ত্রাংশের পণ্য মেলাতে পারছেন না গ্রাহকরা। ফলে নতুন কম্পিউটার তৈরি কিংবা পুরোনো কম্পিউটার আপগ্রেড করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। রাজশাহীর সাহেব বাজার, রানিবাজার, নিউ মার্কেট প্রভৃতি এলাকার কম্পিউটার মার্কেটগুলো ঘুরে হতাশাজনক চিত্র দেখা যায়। বিক্রেতারা জানান, নতুন চালানে ডিডিআর৫ র্যাম, আধুনিক প্রসেসর, প্রিমিয়াম মাদারবোর্ড ও উচ্চক্ষমতার গ্রাফিকস কার্ডের দাম এতটাই বেড়েছে যে এগুলো সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে গেছে। বাজারে কেনাকাটা করতে আসা ভুক্তভোগীরা জানান বর্তমান মূল্য অনুযায়ী পণ্য কিনতে তাদের অসামর্থ্যরে কথা। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, অস্বাভাবিক এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে তাদের বিক্রি প্রায় অর্ধেক কমে গেছে। এদের মধ্যে একজন জানালেন, আগে যেখানে মাসে অন্তত ১৫টি কম্পিউটার বিক্রি হতো, এখন ৫টিও বিক্রি হচ্ছে না। আগে যে কম্পিউটার তৈরিতে ৫০ হাজার টাকা খরচ হতো, এখন তাতে লাগছে ৮০ হাজার টাকারও বেশি। অরেকজন বললেন, ৫০ হাজার টাকার বাজেট নিয়ে এসে ৭০-৮০ হাজার টাকার হিসাব দেখে ক্রেতারা কেনাকাটা না করেই ফিরে যাচ্ছেন।
এই পরিস্থিতির প্রধান কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশী টাকার অব্যাহত অবমূল্যায়ন আমদানিকৃত ইলেকট্রনিক পণ্যের ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। কম্পিউটার যন্ত্রাংশ ও আইসিটি ডিভাইসে বাংলাদেশ প্রায় শতভাগ আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের সামান্যতম প্রভাবও দেশীয় বাজারে তীব্রভাবে অনুভূত হয়। এর পাশাপাশি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির অভূতপূর্ব প্রসারের ফলে বড় বড় তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এআই সার্ভার ও হাই-পারফরম্যান্স কম্পিউটিংয়ের দিকে ঝুঁকছে। ফলে বিশ্বজুড়ে সেমিকন্ডাক্টর চিপ, মেমোরি মডিউল এবং কপারসহ প্রয়োজনীয় ধাতব কাঁচামালের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বৈশ্বিক লজিস্টিকস ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটছে। এর মাসুল দিতে হচ্ছে প্রান্তিক ভোক্তাদের।
সূত্রে প্রকাশ, সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে মেমোরি চিপের বাজারে। ডিডিআর-৪ র্যামের তুলনায় নতুন প্রযুক্তির ডিডিআর-৫ র্যামের দর লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। নামিদামি ব্র্যান্ডের ১৬ ও ৩২ জিবি ক্ষমতার ডিডিআর-৫ র্যামের বাজারমূল্য বর্তমানে ২৭ হাজার থেকে ৬৪ হাজার টাকা পর্যন্ত ঠেকেছে, যা এক বছর আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ। কম্পিউটার হার্ডওয়্যারের পাশাপাশি স্টোরেজ ডিভাইস ও গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিটের (জিপিইউ) দামেও চরম অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। জানা গেছে, উচ্চগতির এনভিএমই এসএসডি এবং ব্র্যান্ডেড পোর্টেবল হার্ডডিস্কের মূল্য এক বছরের ব্যবধানে ধারণ ক্ষমতাভেদে ক্ষেত্রবিশেষে দেড় থেকে আড়াই গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। যেখানে আগে একটি সাধারণ ২৫৬ জিবি এসএসডি ১৮০০ থেকে ২০০০ টাকায় পাওয়া যেতো, এখন সেটির জন্য ক্রেতাকে প্রায় সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা গুনতে হচ্ছে। গেমিং ও প্রফেশনাল কনটেন্ট ক্রিয়েশনের জন্য ব্যবহৃত এনভিডিয়া ও আসুসের এনট্রি লেভেলের গ্রাফিক্স কার্ডগুলোর দাম ৩০ হাজার টাকা থেকে শুরু হয়ে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মডেলগুলোতে তা পৌনে দুই থেকে দুই লাখ টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
এদিকে, একই চিত্র দেখা যায় মোবাইল ফোনের বাজারেও। সূত্র মতে, এক সময় ১০ হাজার টাকার মধ্যে র্যাম, মোটামুটি মানের ব্যাটারি ও বড় ডিসপ্লেসহ যে ধরনের এন্ট্রি-লেভেল স্মার্টফোন পাওয়া যেতো, তা এখন একপ্রকার বাজার থেকে হারিয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে চিপসেট ও মেমোরি পার্টসের মূল্যবৃদ্ধি এবং স্থানীয় শুল্ক কাঠামোর পরিবর্তনের কারণে ব্র্যান্ডেড কোম্পানিগুলোর সর্বনি¤œ স্তরের ফোনের দাম এখন ১২ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। বাজারে বর্তমানে যে দু-একটি সাশ্রয়ী ফোন ১০ হাজার টাকার নিচে মিলছে, সেগুলোর কার্যক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। স্বল্প র্যাম ও দুর্বল প্রসেসরের কারণে দৈনন্দিন যোগাযোগের জরুরি অ্যাপ কিংবা মোবাইল ব্যাংকিং সেবা ব্যবহার করতে গিয়ে ব্যবহারকারীরা চরম ধীরগতির মুখোমুখি হচ্ছেন। ফলে নি¤œ ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ, বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও খুচরা ব্যবসায়ীদের জন্য একটি কার্যক্ষম স্মার্টফোন মালিকানা এখন বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। সামনের দিনগুলোতে বিশ্ববাজারে ডিসপ্লে প্যানেল, কাঁচামাল এবং সেমিকন্ডাক্টরের দাম আরো বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই অবস্থার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থী, ফ্রিল্যান্সার এবং তরুণ পেশাজীবীদের ওপর। এদের একটি বড় অংশ বাজেট ঘাটতির কারণে নতুন পিসি কেনা কিংবা পুরোনো ডিভাইস আপগ্রেড করার ইচ্ছা চাপা দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
এমতাবস্থায় দেশে ডিজিটালাইজেশনের গতি ধরে রাখতে এবং ডিজিটাল বৈষম্য কমাতে সরকারের পক্ষ থেকে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন। বিশেষ করে নি¤œ আয়ের ভোক্তা ও শিক্ষার্থীদের ব্যবহার্য এন্ট্রি-লেভেল ডিভাইস এবং অত্যাবশ্যকীয় কম্পিউটার হার্ডওয়্যার আমদানিতে শুল্ক ছাড় দেয়া, স্থানীয় অ্যাসেম্বলিং শিল্পের জন্য বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা প্রদান এবং খুচরা বাজারে কৃত্রিম সংকট রোধে তদারকি জোরদার করার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।
