যশোরে সারের ডিলার নিয়োগ ঘিরে অনিয়ম, দলীয় প্রভাব ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। নিয়োগ পাওয়া ডিলারদের কারো কারো সার বিক্রির দোকান বা গুদামও নেই বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ঘরানার ব্যক্তিদেরকেও দেওয়া হয়েছে ডিলারশিপ।
এ নিয়ে নিয়োগ পাওয়া ও বাদ পড়া প্রার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। সংসদ সদস্য ও সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের কেউ কেউ প্রকাশ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়ার অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি নিয়ে ক্ষোভ জানিয়েছেন। কোথাও সংবাদ সম্মেলন হয়েছে। আবার কোনো কোনো উপজেলায় নতুন ডিলারের নিয়োগ বাতিলের দাবিতে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি এবং জেলা প্রশাসক ও ইউএনওর কাছে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।
এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে যশোর জেলা প্রশাসন তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক রফিকুল হাসানকে তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে। কমিটির সদস্য করা হয়েছে পুলিশ সুপারের প্রতিনিধি (একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার) ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালককে।
যশোরের চৌগাছা উপজেলায় সার ডিলার নিয়োগে আওয়ামী লীগ ও চিহ্নিত সার চোরাকারবারির নাম রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে গত ১১ অক্টোবর লিখিত আবেদনের মাধ্যমে ব্যাখা চান সুখপুকুরিয়া ইউনিয়নের মেসার্স শুকুর এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মিজানুর রহমান।
অভিযোগে তিনি বলেন, সুখপুকুরিয়া ইউনিয়নে ‘বিশ্বাস ট্রেডার্সের’ স্বত্বাধিকারী শ্যামল কুমার বিশ্বাস পরীক্ষিত আওয়ামী লীগ এবং তার ছেলে কনক বিশ্বাস চিহ্নিত মাদক ব্যাবসায়ী, যে ৯০০ পিস ইয়াবা ও ফেনসিডিলসহ পুলিশের কাছে গ্রেফতার হয়ে এখনও কারান্তরীণ রয়েছে। জগদীশপুর ইউনিয়নে ‘মেসার্স আব্বি এন্টারপ্রাইজের’ স্বত্বাধিকারী ইমরাক আব্বি আসাদ যশোর সদর উপজেলার বাসিন্দা ও বিতর্কিত আমলার আত্মীয় হওয়ায় তার বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ রয়েছে।
তিনি আরও জানান, ধুলিয়ানী ইউনিয়নে ‘লিমন এন্টারপ্রাইজের’ স্বত্বাধিকারী রনজু বেগমের স্বামী ও লিমনের পিতা খাইরুল ইসলামের ২৭৮ বস্তা চোরাই সার জব্দ ও অবৈধ ভাবে ৩৮ বস্তা সার পাচারকালে আটকের পর ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেন চৌগাছা উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট। জরিমানার ৩০ দিন অতিবাহিত না হতেই একই ব্যক্তিকে কিসের বিনিময়ে সারের ডিলার দেওয়া হলো এ বিষয়ে ইউএনওর কাছে তিনি ব্যাখা চান। এসব ডিলার নিয়োগে ২০ লাখ টাকা লেনদেনেরও অভিযোগ ওঠে।
এদিকে এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে ১৫ অক্টোবর চৌগাছায় সংবাদ সম্মেলন করেছেন উপজেলা পূজা উদযাপন ফ্রন্টের আহ্বায়ক বিএনপি নেতা গোবিন্দ কুমার রাহা। লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, সার ডিলার নিয়োগে ২০ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগকে মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও মানহানিকর।
বাঘারপাড়া উপজেলার ৬ নম্বর দোহাকুলা ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ তুলে নিরপেক্ষ তদন্ত ও ন্যায়সংগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন মো. আব্দুস সাত্তার নামে এক ব্যবসায়ী ও বিএনপি নেতা। গত ১৫ অক্টোবর প্রেসক্লাব যশোরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ দাবি জানান।
তিনি জানান, তিনি দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে সার ও কীটনাশকের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। সার ডিলার হিসেবে অনুমোদন না পাওয়ায় তিনি আর্থিক সংকটে পড়েছেন বলে দাবি করেন।
আব্দুস সাত্তার অভিযোগ করেন, দোহাকুলা ইউনিয়নে সার ডিলার হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত আব্দুর রশিদ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং সাবেক সংসদ সদস্য রণজিৎ রায়ের গাড়িচালক মিজানুর রহমান মিজানের আপন ভাই।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন ৬ নম্বর খলশী ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমান আলী ফারাজী, ৬ নম্বর খলশী ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি মিলন হোসেন, বিএনপি নেতা মোহাম্মদ নুর জালাল আজাদী।
অন্যদিকে যশোরের শার্শা উপজেলার ডিহি ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম ও পক্ষপাতের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে যশোরের জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন দীর্ঘদিনের সার ব্যবসায়ী ও শার্শা উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক এস এম আব্দুল হক।
তার অভিযোগ, ডিলার নিয়োগের জন্য আবেদন করেও যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও তাকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। পরিবর্তে নিউ সততা ট্রেডার্সের রফিকুল ইসলামকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এস এম আব্দুল হক শার্শার পাকশিয়া বাজারের মেসার্স সরদার এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী। তিনি আগে ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি এবং উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
জেলা প্রশাসকের কাছে দেওয়া আবেদনে এস এম আব্দুল হক উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিন ধরে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকায় তার প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা রয়েছে। তৎকালীন বিএনপি সরকারের সময়েও তিনি এ ব্যবসা করেছেন। বর্তমানে তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও রয়েছে। এরপরও ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে তার অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। তার পরিবর্তে নিউ সততা ট্রেডার্সের রফিকুল ইসলামকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যার সার ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা তুলনামূলক কম।
এছাড়াও মনিরামপুর উপজেলায় স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে মাদক ব্যবসায়ীর স্ত্রী ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতির ছেলের নামে সার ডিলার নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ার এমন অভিযোগ তুলে গত ১৪ অক্টোবর জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বিএনপির দুই নেতা। অভিযোগে তারা প্রকাশিত সার ডিলার তালিকা পুনরায় নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করে বাতিলের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে সারের ডিলার তালিকা প্রকাশের পর তৃণমূল বিএনপির নেতা-কর্মীদের মাঝে ক্ষোভসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে।
দূর্বাডাঙ্গা ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম তার অভিযোগে উল্লেখ করেন, ইউনিয়নে বিসিআইসি সারের ডিলার মেসার্স জান্নাতুল ফেরদাউস এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী রওশনারা খাতুন চলতি বছর ফ্যামিলি কার্ড শুমারীর ইউনিয়ন সুপারভাইজার হিসেবে সরকারের কাছ থেকে সুবিধা নিচ্ছেন। এছাড়াও তার স্বামী আফজাল হোসেন পাড়ালা গ্রামের একজন চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী ও প্রতারক। সম্প্রতি ডিবি পুলিশের অভিযানে মাদক বিক্রির নগদ ৪৩ হাজার টাকা ও ইয়াবাসহ তাকে আটক করা হয়। মনিরামপুর থানায় যার মাদকদ্রব্য আইনে মামলা নম্বর-৪, (৩) ২৬। এছাড়া তিনি জামালপুর জেলার সদর থানার সিআর-১৬ (১) ২৩ প্রতারণা মামলার ২ বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামি।
অপরদিকে শ্যামকুড় ইউনিয়ন বিএনপির নেতা সাবেক ইউপি সদস্য ফজলুর রহমান অভিযোগ করেন, তার ইউনিয়নে সারের ডিলার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছে মেসার্স জামান ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী সালাহ উদ্দিন। সালাহ উদ্দিনের বাবা আব্দুল কাশেম নাগোরঘোপ-হাসাডাঙ্গা ২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়াও রোহিতা ও ঝাঁপা ইউনিয়নের সারের ডিলার পাওয়া ব্যক্তিদের নিয়ে বির্তকের ঝড় থামছে না।
মনিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সার বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি সম্রাট হোসেন বলেন, অভিযোগগুলো তদন্ত করা হচ্ছে, এরপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট গাজী এনামুল হক বলেন, তার নিজের রোহিতা ইউনিয়নে স্বজনপ্রীতি করে একই পরিবারের ৩ জনের নাম তালিকায় পাঠানো হয়েছে। এসব দুনীর্তির বিষয়ে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
স্থানীয় সরকার যশোরের উপ-পরিচালক রফিকুল হাসান ঢাকা পোস্টকে বলেন, সারের ডিলার নিয়োগ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠায় জেলা প্রশাসক তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। কমিটি তদন্ত করে জেলা প্রশাসক বরাবর প্রতিবেদন দাখিল করবে।
রেজওয়ান বাপ্পী/আরএআর
