যবিপ্রবি প্রতিনিধি: যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (যবিপ্রবি) জুনিয়র শিক্ষার্থী কতৃক সিনিয়র শিক্ষার্থীদের মারধরের ঘটনার দিনভর উত্তেজনা বিরাজ করে ক্যাম্পাসে। এসময় অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর হলের সামনে বিক্ষোভ, ক্যাম্পাসের মুল ফটক বন্ধ করে বিক্ষোভ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে দেখা যায় আন্দোলনকারীদের। রোববার (১১ অক্টোবর) দুপুর থেকে সন্ধা পর্যন্ত দফায় দফায় এ উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মধ্যস্থতায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমঝোতা হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, চায়ের দোকানে সিগারেট ধরানোকে কেন্দ্র করে এ বিরোধের সূত্রপাত। ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের ২০২৫-২০২৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তাসনীম সিগারেট ধরানোর অনুমতি চান দোকানে উপস্থিত থাকা ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০২০-২০২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আহাদের কাছে।আহাদ অনুমতি দিলেও একই স্থানে উপস্থিত থাকা ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের ২০২৩-২০২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী পার্থ অনুমতি দিতে চাননি। পরবর্তীতে তা নিয়ে কথা কাটাকাটি হয় এবং ভিন্ন বিভাগের পরিচয় দিয়ে সিনিয়রদের সাথে তর্কে জড়ান পার্থ। এক পর্যায়ে সিনিয়রদের মারধর শুরু করেন সে।
পরে এ বিরোধকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দুপুরের ঘটনার জেরে বিকেল তিনটার দিকে মার্কেটিং বিভাগের একদল শিক্ষার্থী সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের মারধর করতে মুন্সী মেহেরুল্লাহ হলের দিকে যান। সেখানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. মো. হামিদুর রহমান, ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা দপ্তরের পরিচালক ড. মো. রাফিউল হাসান এবং সংশ্লিষ্ট হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মো. আব্দুর রউফ সরকার সেখানে উপস্থিত হন। এ সময় তাঁরা হলের ফটক বন্ধ রেখে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। পরে হলের সামনে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা।
পরবর্তীতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রক্টর অফিসে যান প্রক্টর ও সংশ্লিষ্টরা। প্রক্টর অফিসে ঘটনার লিখিত অভিযোগ দেওয়ার কথা বলা হলে মেনে নিতে পারেননি আন্দোলনরতরা। পরবর্তীতে তারা প্রধান ফটকে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর ছবি টাঙিয়ে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য বলেন।
পরে বিকেল চারটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক বন্ধ করে সেখানে অবস্থান নেন তারা। এ সময় তাঁরা প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেন। এ অবরোধের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস চলাচল প্রায় এক ঘন্টা ব্যাহত হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মধ্যস্থতায় পরে মুন্সি মেহেরুল্লাহ হলের প্রভোস্টের কার্যালয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে জুনিয়র শিক্ষার্থী নিজের ভুল স্বীকার করে সিনিয়র শিক্ষার্থীদের কাছে ক্ষমা চান। পরে উভয় পক্ষের আলোচনার মাধ্যমে বিরোধের সমাধান হয়।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. মো. হামিদুর রহমান বলেন, আজ জুনিয়র সিনিয়র শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার পর সিনিয়র ব্যাচের শিক্ষার্থীরা প্রায় এক ঘণ্টা প্রধান ফটক বন্ধ রেখে বাস আটকে রাখেন। তাঁরাও বিষয়টির সমাধান চাচ্ছিলেন। পরে তাঁদের নিয়ে মুন্সি মেহেরুল্লাহ হলের প্রভোস্টের কক্ষে বসা হয়। জুনিয়র শিক্ষার্থীকে সেখানে আনা হলে সে নিজের ভুল স্বীকার করে সিনিয়রদের কাছে ক্ষমা চায়। এরপর উভয় পক্ষের আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসা করা হয়।
ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা দপ্তর এবং প্রক্টর দপ্তরের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হবে জানিয়ে প্রক্টর বলেন, এর মাধ্যমে জ্যেষ্ঠ ও নবীন শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে বলে তিনি আশা করেন।
এদিকে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সৌহার্দ্য, শিষ্টাচার ও সম্প্রীতি বজায় রাখার নির্দেশনা দিয়ে জরুরি নির্দেশনা জারি করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা দপ্তর। ১১ অক্টোবর স্বাক্ষরিত ওই নির্দেশনায় জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থীদের নবীনদের প্রতি স্নেহশীল, সহনশীল ও সহযোগিতাপূর্ণ আচরণ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে নবীন শিক্ষার্থীদের জ্যেষ্ঠদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নির্দেশনায় অপমানজনক মন্তব্য, অসৌজন্যমূলক আচরণ, উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড এবং অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি করা থেকে সব শিক্ষার্থীকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। জ্যেষ্ঠ ও নবীন শিক্ষার্থীদের মধ্যে কোনো ভুল-বোঝাবুঝি বা বিরোধ দেখা দিলে ব্যক্তিগতভাবে কিংবা দলবদ্ধভাবে তা সমাধানের চেষ্টা না করে সংশ্লিষ্ট বিভাগের চেয়ারম্যান, হলের প্রভোস্ট, ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা দপ্তর অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তা নিতে বলা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিধিবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ পাওয়া গেলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা দপ্তরের পরিচালক ড. মো. রাফিউল হাসান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। পরে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বোঝানো সম্ভব হয়। এরপর হলের কার্যালয়ে সবার উপস্থিতিতে বিষয়টি মীমাংসা করা হয়। ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে দপ্তরের পক্ষ থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আমি শিক্ষার্থীদের এসব নির্দেশনা মেনে চলার অনুরোধ জানাই।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বলেন, আজ ক্যাম্পাসে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার পর শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেন। পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে প্রভোস্টের কার্যালয়ে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসা করা হয়। এ সময় শিক্ষার্থীদের সতর্ক করা হয়েছে, যাতে ক্যাম্পাসে পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকে।
