নাটোরের বড়াইগ্রামে যাত্রীবাহী বাস ও বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৪ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করে ৮ জনের মরদেহ হস্তান্তর করেছে পুলিশ।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ভোর ৪টার দিকে বনপাড়া এলাকায় নাটোর-পাবনা মহাসড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
দুর্ঘটনায় আহত ২৭ জনের মধ্যে ২ জন হাসপাতাল থেকে রিলিজ পেয়েছেন। অন্য আহতদের স্থানীয় বিভিন্ন ক্লিনিক ছাড়াও নাটোর সদর হাসপাতাল ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
আরও পড়ুন
দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে রাজশাহী জেলায় ২ জন পটুয়াখালী জেলার ২ জন শরীয়তপুর জেলার ৭ জন ঝিনাইদহ জেলার ১ জন, নওগাঁ জেলার ১ জন এবং ফরিদপুর জেলার ১ জন। এদের মধ্যে ৮ বছর বয়সী শিশুকন্যা ও তার বাবাও রয়েছেন।
নিহতরা হলেন, রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী উপজেলা ফরহাদপুর গ্রামের আব্দুল হাকিমের ছেলে বাস চালক সোহেল রান(৩৫), একই জেলার বাগমারা উপজেলার কনোপাড়া এলাকার বাবর আলীর ছেলে আনোয়র হক(৩০) পটুয়াখালী জেলার মির্হাগঞ্জ উপজেলার পূর্ব সুবিধখালী এলাকার আজাহার হাওলাদারের ছেলে শহিদুল ইসলাম, শহিদুল ইসলামের মেয়ে তাসফিয়া(৮), শরীয়তপুর জেলার জাজিরা উপজেলার রামকৃষ্ণপুর গ্রামের জহিরউদ্দীন মাতবরের ছেলে জুয়েল মাতবর(৪০) একই উপজেলার ডুবি সাহিবর এলাকার ইউনুস শিকদারের ছেলে সোহাগ,(৩০) একই গ্রামের জাহান উদ্দীন মোল্লার ছেলে সাহ লাল,(৪৬) একই গ্রামের আরব আলার ছেলে আব্দুস সামাদ(৭০) একই উপজেলার , কাশেম (৩৫) ও জহুর উদ্দিন। একই উপজেলার কাথুরিয়া গ্রামের রাজ্জাক ব্যাপারির ছেলে শাহিন,(৩২) ঝিনাইদহ জেলার সদর উপজেলার বড় মান্দারবাড়িয়া এলাকার জাকির হোসেনের ছেলে ট্রাক চালক আবু কালাম(৪৮) নওগা জেলার শাপাহার উপজেলার ঘোনটোলা এলাকার সাজ্জাদের ছেলে রাসেল এবং ফরিদপুর জেলার সদর থানার বাখোন্দিয়া এলাকার ওমর কুমার জমাদারের ছেলে হিমেশ জমাদার।
আরও পড়ুন
নাটোর ২৫০ শয্যার আধুনিক হাসপাতালের আরএমও মাহাবুব হোসেন জানান, সকাল থেকে মোট ৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। এরমধ্যে ২ জন রিলিজ পেয়েছেন। অপর ৩ জনকে রাজশাহী মেডিকেলে রেফার্ড করা হয়েছে। এখন ৪ জন চিকিৎসাধীন।
বড়াইগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম জানান,দুর্ঘটনার পর জেলা প্রশাসক,পুলিশ সুপার ও জাতীয় সংসদের হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে ৭ সদস্যর তদন্ত কমিটি গঠণ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন
এদিকে আহতদের চিকিৎসায় সার্বিক সহযোগীতার পাশাপাশি নিহতর পরিবারকে আর্থিক সহযোগীতার আশ্বাস দিয়েছেন জেলা প্রশাসন ও সরকার। একই সঙ্গে দুর্ঘটনা প্রবণ ওই এলাকার রাস্তা প্রশস্তকরণের উদ্যোগ নেওয়ারও আশ্বাস দিয়েছেন হুইপ দুলু।
নাটোর ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার আব্দুর রউফ জানান, তারা ঘটনাস্থল থেকে ৯ জনের মরদেহ উদ্ধার করেন। অপরদিকে আহত ৩২-৩৩ জনকে স্থানীয় ক্লিনিকসহ ,নাটোর সদর হাসপাতাল ভর্তি করেন। পরে আরও ৫ জন সহ মোট ১৪ জনের মৃত্যু হয়।
আহতদের মধ্যে শরীয়তপুরের আলমগীর মাতবর (৫৫), চাঁপাইনবাবগঞ্জের আব্দুস সালাম (৩৫), শিবগঞ্জের ওয়াহিদ আলী (২২), মাদারীপুরের নাইম তালুকদার (২০), নার্গিস আক্তার (৩৫), বরগুনার জেসমিন আক্তার (৩৫), নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার চিরঞ্জিত কুমার (২৫), মান্দা উপজেলার মানিক হোসেন (৩৭) ও শাহাজুল ইসলাম (৩৬) এবং লক্ষ্মীপুরের রাকিব হোসেন (২৫) এর নাম পেয়েছেন।
ডিসি সুমনী আক্তার জানান,ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে ৭ সদস্যর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটি প্রধান ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আবুল হায়াত জানান, বুধবার থেকে তারা কাজ শুরু করবেন। দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবেন।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, নিহতদের নিজ জেলা প্রশাসক প্রতি পরিবারকে যাতে ২৫ হাজার টাকা দেন সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট জেলায় যোগাযোগ করে বলে দিয়েছেন নাটোর ডিসি।
এদিকে ওই দুর্ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে নাটোর সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মাদারীপুর জেলার মোস্তাকপুর এলাকার আব্দুস সালাম জানান, তিনি রাত ৯ টায় গাড়িতে ওঠেন। পথে কুষ্টিয়ায় খাবার খেয়ে বাসে ঘুমিয়ে পড়েন। হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে দূর্ঘটনা বুঝতে পেরে বাসের জানালা দিয়ে বাইরে লাফ দেন।
তিনি আরও জানান,গাড়ির চালকের চোখে ঘুম ঘুম ভাব ছিল। তিনি মাঝে মাঝে বাসটি স্পিডে আবার মাঝে মাঝে স্লো চালাচ্ছিলেন।
আহত অপর এক যাত্রীর দাবি, বালুবোঝাই ট্রাক নিজ সাইডেই ছিল। বাস চালক রং সাইডে গিয়ে ওই ট্রাককে আঘাত করলে ওই হতাহতের ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর তিনি পকেটে থাকা কয়েক হাজার টাকা হাড়িয়েছেন বলেও দাবি করেন।
দুর্ঘটনার কারণ জানতে চাইলে বনপাড়া হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলমগীর হোসেন জানান, তাদের ধারণা, একটি গাড়ি ওভারটেক করতে গিয়ে ওই দুর্ঘটনা ঘটে।
নিরাপদ সড়ক চাই,নাটোর জেলা কমিটির সভাপতি গোলাম মোস্তফা জানান,,ওই জায়গার অদূরে রেজুর মোড় এলসকায় ২০১৪ সালের ২০ অক্টোবর দুর্ঘটনায় ৩৫ জনের মৃত্যু হয়। তবে ওই মহাসড়কটি ২ লেন থেকে প্রশস্ত করলে দুর্ঘটনা কমবে এমন দাবিও করেন তিনি।
জাতীয় সংসদের হুইপ ও নাটোর ২( সদর-নলডাঙ্গা) আসনের এমপি এডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু জানান, আহতদের চিকিৎসায় সকল পদক্ষেপ নিতে স্বাস্থ্য বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে নিহতর পরিবারকে ১ লাখ টাকা দেওয়ারও কথা জানান তিনি।
তিনি আরও জানান,ওই রাস্তাটি প্রশস্তকরণে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া হবে।
কামাল মৃধা/অন্তরা/
