সেপ্টেম্বরের শেষ দিক থেকে ফ্রান্সজুড়ে নিজেদের ভবিষ্যৎহীন বলে মনে করা হাইস্কুল শিক্ষার্থীদের ব্যাপক বিক্ষোভ ও অবরোধ চলছে। এই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি দেশজুড়ে আয়োজিত এক বিশাল বিক্ষোভে কয়েক লাখ মানুষ অংশ নিয়েছেন। প্যারিসের একটি নিম্ন আয়ের শহরতলি থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন দাবানলের মতো পুরো ফ্রান্সে ছড়িয়ে পড়ে। দ্রুতই এর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়নের কর্মীরাও যুক্ত হন।
আন্দোলনকারীদের বড় একটি অংশই কিশোর-কিশোরী এবং তারা মূলত শান্তিপূর্ণভাবেই তাদের কর্মসূচি চালিয়ে গেছে। অথচ রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ তাদের দমনে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর বলপ্রয়োগ করেছে। সংযম প্রদর্শনের পরিবর্তে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন, বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রয়োজনে টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেটের মতো বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করতে। এই দমন-পীড়নের মুখে ৬ হাজারেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক।
স্বাভাবিকভাবেই, প্রথম দিন থেকেই মূলধারার গণমাধ্যমগুলো ম্যাক্রোঁ (ফ্রান্সের বর্তমান প্রেসিডেন্ট) সরকারের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এই আন্দোলনকে বিতর্কিত করার চেষ্টা চালিয়েছে। তারা বিক্ষোভের কেবল সেই দৃশ্যগুলোই বারবার দেখিয়েছে, যা ছিল চাঞ্চল্যকর, ভীতিকর বা নাটকীয়। এই প্রচারণার উদ্দেশ্য হলো- এমন একটি ভুল ধারণা তৈরি করা যে ‘ফ্রান্স জ্বলছে’। তারা এই আন্দোলনকে যৌক্তিক ও ন্যায়সংগত দাবিসম্পন্ন একটি শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলন হিসেবে না দেখিয়ে একে ‘সহিংস দাঙ্গা’ হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
এই প্রচারণায় ইচ্ছাকৃতভাবে একটি বিষয় এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে- তা হলো, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে অনুষ্ঠিত অসংখ্য বিক্ষোভ, অবরোধ, মিছিল ও অন্যান্য কর্মসূচির সিংহভাগই ছিল সম্পূর্ণ অহিংস। গণমাধ্যমগুলো এমনভাবেও চিত্রিত করেছে যেন শিক্ষার্থীরা ‘ফ্রান্স আনবাউড’ দল এবং দলটির নেতা জ্যঁ-লুক মেলেনশঁ-এর দ্বারা প্রভাবিত বা ব্যবহৃত হচ্ছে, যিনি আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। তবে এই দাবির সপক্ষে তারা কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি; কেবল এটুকু বলেছে যে, দলটি তরুণদের এই আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েছে।
ফ্রান্সের গণমাধ্যম ও রাজনীতিবিদরা- মধ্যবাম থেকে শুরু করে কট্টর ডানপন্থি পর্যন্ত যে ইসলামবিদ্বেষী ও বর্ণবাদী বয়ান তৈরি করে থাকেন, সেই একই খেলায় শামিল হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও। তিনি প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছেন যে, অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসন ও ইসলামের কারণেই এই বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এ ধরনের অদ্ভুত ও ভিত্তিহীন অভিযোগের কোনো জবাব দেওয়ার প্রয়োজনই পড়ে না। ফ্রান্সের মানুষ একে একজন জঘন্য উন্মাদ ব্যক্তির প্রলাপ বলেই গণ্য করেছে এবং পুরোপুরি উপেক্ষা করেছে। তবে এই পরিস্থিতির পেছনে আরও দুটি ব্যাখ্যা রয়েছে। ট্রাম্প এবং তার সহযোগীরা হয়তো সত্যিই ‘গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট’ বা ‘মহাপরিবর্তন’-এর সেই কাল্পনিক তত্ত্বে বিশ্বাস করেন। যেখানে মনে করা হয়, ‘ইউরোপীয় সভ্যতা’ মুসলিম ও আরবদের দ্বারা গ্রাস হয়ে যাচ্ছে, যারা নাকি এক ধরনের ‘ইসলামি খিলাফত’ গড়ে তুলতে চায়। আবার এমনও হতে পারে যে, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্প কেবল তার কট্টর অভিবাসনবিদ্বেষী ‘মাগা’ সমর্থকদের খুশি করার জন্যই এমন আচরণ করছেন। এ নির্বাচনে তার রিপাবলিকান পার্টির পরাজয়ের সম্ভাবনাই বেশি। তবে ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা উন্নয়নশীল বিশ্ব থেকে আসা ‘জনস্রোত’-এর বিরুদ্ধে ‘পাশ্চাত্য সভ্যতা’র রক্ষাকর্তা হিসেবে ট্রাম্পের এই অদ্ভুত ভঙ্গি খুব একটা মানুষের মন জয় করতে পারেনি। এমনকি খোদ যুক্তরাষ্ট্রের নয়। এর কারণ সম্ভবত এই যে, ফ্রান্সের রাজনীতি নিয়ে আমেরিকান ভোটারদের খুব একটা আগ্রহ নেই।
প্রতিবাদের কারণগুলো ট্রাম্পের দেওয়া ব্যাখ্যার চেয়ে অনেক বেশি সরল। শিক্ষার্থীরা নিজেরাই বারবার এবং স্পষ্টভাবে এসব কারণ তুলে ধরেছে; এছাড়া কিছু বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদন ও বিশেষজ্ঞ মন্তব্যের মাধ্যমেও বিষয়টি পরিষ্কার হয়েছে। পুরো দেশজুড়ে ব্যাপক বৈষম্য থাকলেও শিক্ষার্থীদের প্রধান অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে- তাদের জরাজীর্ণ স্কুলগুলোর অত্যন্ত শোচনীয় ভৌত অবস্থা; শিক্ষক ও সহায়ক কর্মীর তীব্র ও কাঠামোগত সংকট এবং শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত ভিড়। অনেক শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা উপলব্ধ চেয়ারের চেয়েও বেশি হয়ে যায়।
সামগ্রিকভাবে, শিক্ষার্থীরা সরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় চরম অর্থসংকট এবং সরকারের অবহেলার অভিযোগ তোলে। অথচ রাষ্ট্র বেসরকারি- মূলত ক্যাথলিক স্কুলগুলোকে ভর্তুকি হিসেবে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার প্রদান করে। এটি একটি তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের জন্য এক নিষ্ঠুর পরিহাস। যেখানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা প্রায়ই ফ্রান্সের কঠোর ধর্মনিরপেক্ষ নীতি বা ‘লাইসিতে’ নিয়ে গর্ব করেন।
শিক্ষার্থী বিক্ষোভকারীদের উল্লেখ করা আরেকটি কারণ হলো- তাদের ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নিয়ে তীব্র ও ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ। এই গভীর ভয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘পারকুরসুপ’ নামে সরকারি একটি ওয়েব পোর্টাল, যা ২০১৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির আবেদন প্রক্রিয়া পরিচালনার লক্ষ্যে চালু করা হয়েছিল। ব্যাপকভাবে ব্যর্থ বলে বিবেচিত এই স্বয়ংক্রিয় বাছাই পদ্ধতিটি শিক্ষার্থীদের একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী করে তোলে বিশ্ববিদ্যালয় বা বিশেষায়িত বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি অস্বচ্ছ এবং বৈষম্যমূলক বলে সমালোচিত হয়েছে।
ফ্রান্সে আইনত উচ্চ মাধ্যমিক পাস করা শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকলেও গত বছর ‘পারকুরসুপ’ প্ল্যাটফর্মের কারণে ৩ লাখ ২০ হাজার শিক্ষার্থী কোনো সুযোগ পায়নি। মাত্র ২২ লাখ ৬০ হাজার উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার্থীর দেশে- যাদের অনেকেই উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদনই করবে না- এই অনুপাত অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আর এটি হলো হিমশৈলের চূড়ামাত্র। ইতিহাস বলে, সুনির্দিষ্ট, ব্যবহারিক ও বস্তুগত দাবির আড়ালে এবং বিশাল ও জমকালো গণবিক্ষোভের গণ্ডি ছাড়িয়ে প্রায়ই আরও বড় কোনো সমস্যা লুকিয়ে থাকে।
ফ্রান্সে আমরা যা শুনছি তা হলো ব্যক্তিগত ও বৈশ্বিক- উভয় ক্ষেত্রেই ভবিষ্যৎ নিয়ে এক সর্বব্যাপী উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ; একই সঙ্গে এটি এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর এক দশকের বিপর্যয়কর শাসনামলের পর দেশের বর্তমান পরিস্থিতির প্রতি এক স্পষ্ট প্রতিবাদ।
ড. আলাঁ গাবোঁ : ভার্জিনিয়া ওয়েসলিয়ান ইউনিভার্সিটির ফরাসি অধ্যয়ন বিষয়ের সহযোগী অধ্যাপক
মিডল ইস্ট আই থেকে অনুবাদ করেছেন আমাদের সময়ের সহসম্পাদক জুয়েল জনি
মতামত লেখকের নিজস্ব
