যুক্তরাষ্ট্রে সম্প্রতি ফাস্টফুড জায়ান্ট ম্যাকডোনাল্ড’সের বিরুদ্ধে একটি অ্যান্টিট্রাস্টের মামলা করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী ফাস্ট ফুডের দোকান ও সুপারমার্কেটগুলোয় বাড়ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ব্যবহার। পণ্যের দাম নির্ধারণ, খাদ্য অপচয় কমানো এবং কেনাকাটা সহজ করতে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। তবে অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞ ও ভোক্তাদের মতে, এআইয়ের মাধ্যমে ক্রেতাদের ব্যক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণের সুযোগ বাড়ছে। ফলে একই পণ্যের জন্য ভিন্ন ক্রেতার কাছ থেকে আলাদা দাম নেয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, যাকে বলা হয় ‘ডাইনামিক প্রাইসিং’ বা পরিবর্তনশীল দাম। এতে পণ্যের দামে স্বচ্ছতা ও ক্রেতাদের পছন্দের স্বাধীনতা নিয়ে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ। খবর সিএনবিসি।
যুক্তরাষ্ট্রে সম্প্রতি ফাস্টফুড জায়ান্ট ম্যাকডোনাল্ড’সের বিরুদ্ধে একটি অ্যান্টিট্রাস্টের মামলা করা হয়েছে। মামলার অভিযোগে জানানো হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি এআই-ভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা ব্যবহার করে দেশটির বিভিন্ন শাখায় খাবারের দাম ঠিক করছে। ফলে বিগ ম্যাক ও ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের মতো পণ্যের জন্য ক্রেতাদের কাছ থেকে বেশি দাম নেয়ার কথা অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। তবে ম্যাকডোনাল্ড’স এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোকে সিদ্ধান্ত নিতে প্রয়োজনীয় তথ্য, গবেষণা ও পরামর্শ দেয়া হয়।
খুচরা ব্যবসায় বাড়ছে এআইয়ের ব্যবহার
যুক্তরাষ্ট্রের সুপারমার্কেট চেইন ক্রোগার এআই-ভিত্তিক ফ্ল্যাশফুড প্লাটফর্ম ব্যবহার করে মেয়াদোত্তীর্ণের সময় কাছাকাছি থাকা পচনশীল পণ্যে ছাড় দিচ্ছে। অ্যাপের মাধ্যমে এসব পণ্যের তথ্য ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। এতে খাদ্য অপচয় কমানোর পাশাপাশি ক্রেতারাও কম দামে পণ্য কেনার সুযোগ পাচ্ছেন।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ক্রোগার, ওয়ালমার্ট ও হোল ফুডসের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোয় বাড়ছে ইলেকট্রনিক শেলফ লেবেলের ব্যবহার। ডিজিটাল পর্দায় পণ্যের দাম দেখানো হয় এসব লেবেলে। ফলে কাগজের মূল্যতালিকা বদলানোর পরিবর্তে দ্রুত দাম হালনাগাদ করা যায়। হোল ফুডস জানিয়েছে, তারা পরিবর্তনশীল মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা বা ডাইনামিক প্রাইসিং ব্যবহার করে না। তাদের মতে, ডিজিটাল লেবেল কর্মীদের কাজ সহজ করে এবং কাগজের অপচয় কমায়।
যুক্তরাজ্যের টেসকো, মরিসনস ও আসদার মতো সুপারমার্কেটেও এ প্রযুক্তি দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে। তবে ব্রিটিশ রিটেইল কনসোর্টিয়াম বা যুক্তরাজ্যের ব্যবসায়ী সমিতির দাবি, দোকানে ঘন ঘন বা চাহিদা অনুযায়ী দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা সুপারমার্কেটগুলোর নেই।
ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে উদ্বেগ
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট লন্ডনের বাণিজ্য আইন বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক মিরোস্লাভা মারিনোভা সিএনবিসিকে বলেন, ‘চাহিদা, সময় ও প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের দামের ভিত্তিতে পণ্যের দাম পরিবর্তনকে বলা হয় ডায়নামিক প্রাইসিং। অন্যদিকে ক্রেতার ব্যক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করে তার কাছ থেকে কত দাম নেয়া সম্ভব, তা নির্ধারণের পদ্ধতি হলো পার্সোনালাইজড প্রাইসিং।’
এআইয়ের সাহায্যে লেনদেনের ইতিহাস, অনলাইন অনুসন্ধান, অবস্থান ও কেনাকাটার অভ্যাস বিশ্লেষণ করা সম্ভব। ফলে একই পণ্যের জন্য দুই ক্রেতার কাছ থেকে ভিন্ন দাম নেয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। এতে ক্রেতারা কেনাকাটার সময় অন্যদের তুলনায় বেশি দাম দিচ্ছেন কিনা, তা বোঝাও কঠিন হতে পারে। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক, মেরিল্যান্ড, নিউ জার্সি ও কানেকটিকাটে ব্যক্তিগত তথ্যনির্ভর মূল্য নির্ধারণ নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি পরিমাপেও চ্যালেঞ্জ
ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের অর্থনীতিবিদ ক্লেয়ার লোম্বারডেলি ও রুপাল প্যাটেল সতর্ক করে বলেছেন, ‘প্রযুক্তির উন্নতির ফলে পণ্যের দাম ক্রেতাভেদে আরো ঘন ঘন পরিবর্তিত হতে পারে। এতে মূল্যস্ফীতি পরিমাপ করা কঠিন হবে। কারণ ভোক্তা মূল্যসূচক হিসাব করা হয় বাজারের প্রতিনিধিত্বকারী পণ্যের দাম বিবেচনায় নিয়ে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআইয়ের ব্যবহার ক্রেতাদের ছাড় ও কেনাকাটায় সুবিধা দিতে পারে। তবে ব্যক্তিগত তথ্যের ভিত্তিতে দাম নির্ধারণ করা হলে ক্রেতাদের মধ্যে তৈরি হতে পারে বৈষম্য। তাই মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা এবং ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।
