যদি কাহারও কোন আত্মীয় না থাকিত, তিনি নিজেই যেন তাঁহার আবেদন পাইয়াছেন, এই রূপ ভাব প্রকাশ করিয়া তাঁহাকে যথোচিত অর্থ সাহায্য প্রদান করিতেন। যে সমুদয় কর্মচারীর দ্বারা তিনি অর্থ সাহায্য প্রেরণ করিতেন, তাঁহারা গৃহীতার নিকট হইতে তাঁহার কণামাত্রও গ্রহণে চেষ্টা করিতেন না।
সুজাউদ্দিন অত্যন্ত দয়ালু, ন্যায়বান ও লোকহিতপরায়ণ নবাব ছিলেন। তাঁহার ন্যায় উদার-অন্তঃকরণের ও শাসনকর্তা অতি অল্পই দৃষ্ট হইয়া থাকে। উদার-চরিতদিগের নিকট সমগ্র বসুন্ধরাই ‘আত্মীয়স্বরূপ’। আমরা সুজাউদ্দিনের চরিত্র হইতে ইহা বিশেষ রূপে উপলব্ধি করিতে পারি। পরদুঃখনিবারিণী দয়া পরিণীতা প্রণয়িনীর ন্যায় সর্ব্বদা তাঁহাকে আশ্রয় করিয়া থাকিত। লোকের উপকারের জন্য তিনি নিয়তই প্রস্তুত থাকিতেন। আত্মীয় হউক, পর হউক, জানিত হউক, অজানিত হউক, যে তাঁহাকে বিপদের কথা জানাইত, তৎক্ষণাৎ তিনি তাঁহার প্রতীকারে বিশের রূপ যত্নবান হইতেন। কৰ্ম্মচারিগণকে তিনি আপন পরিবাবের ন্যায় জ্ঞান করিতেন। তাহাদের উপকারার্থে তিনি অবিরত মুক্তহস্ত ছিলেন। তাঁহার পরোপকার সংক্রান্ত ঘটনা প্রবাদবাক্যের ন্যায় প্রতীত হইয়া থাকে। তাঁহার শ্বশুর মুর্শিদকুলী খাঁর চরিত্র হইতে তাঁহার চরিত্র পৃথক ছিল। কুলী খাঁর চরিত্র কঠোরতাপ্রবণ ও সুজার চরিত্র কোমলতাপূর্ণ ছিল। মুর্শিদকুলী খাঁ যে হতভাগ্য জমীদারগণকে চিরকারারুদ্ধ করিয়া বঙ্গের রাজস্ববৃদ্ধির চেষ্টা করিয়াছিলেন, সুজাউদ্দিন রাজ্য প্রাপ্ত হইবামাত্র প্রথমে তাঁহাদিগকে মুক্তি দান করেন।
কিন্তু তিনি যেরূপ জমীদারী বন্দোবস্ত করিয়াছিলেন, তাহাতে যদিও জমীদারদিগকে আশু করভার হইতে অব্যাহতি দিয়াছিলেন, তথাপি অতিরিক্ত আবওয়াবেব সৃষ্টি করিয়া জমীদার ও প্রজাবর্গকে করভারে নিপীড়িত করা তাঁহার ন্যায় কোমলহৃদয় নবাবের উপযুক্ত কার্য্য হয় নাই। আমরা এ বিষয়ে তাঁহাকে প্রশংসা করিতে পারি না। কিন্তু তাঁহার সদ্ব্যবহারে জমীদার ও প্রজারা অতিরিক্ত কর প্রদানেও অসন্তুষ্ট হইত না। জগতে সাধুব্যবহারে যে অনেক কার্য্য সম্পন্ন হয়, সুজাউদ্দিন তাহা বিশেষরূপ অবগত ছিলেন। তাঁহার উদার ব্যবহারে সকলেই সন্তুষ্ট হইতেন। তাঁহার কার্য্যে পাছে কাহারও কোন ক্ষতি হয়, এই জন্য তিনি সর্ব্বদা সশঙ্ক থাকিতেন। হিন্দু, মুসলমান তাঁহার চক্ষে সমান ছিল। মুর্শিদকুলী খাঁর সময়ে তাঁহার কৰ্ম্মচারিগণ কর্তৃক হিন্দুদিগের প্রতি যেরূপ অত্যাচার হইয়াছিল, বিশেষ রূপ অনুসন্ধান করিয়া সুজাউদ্দিন তাঁহার প্রতীকারের চেষ্টা করিয়াছিলেন।
সুজাউদ্দিনের পুত্র সরফরাজ খান
যে সমস্ত কঠোরহৃদয় ব্যক্তি হতভাগ্য হিন্দুগণের প্রতি অত্যাচার করিয়া মুর্শিদকুলী খার রাজত্বে কলঙ্ক প্রদান করিয়াছিল, যাঁহারা হিন্দুদিগের দেবমন্দির চূর্ণ করিয়া নবাবের সমাধিক্ষেত্রের প্রতিষ্ঠা করে, সুজা তাহাদিগের বিচার করিয়া প্রাণদণ্ড বিধান করিয়াছিলেন। হিন্দুদিগের প্রতি মুসল্মান কৰ্ম্মচারীরা যাহাতে অত্যাচার করিতে না পারে, সে বিষয়ে তাঁহার বিশেষ রূপ দৃষ্টি ছিল। ফলতঃ তাঁহার চক্ষে হিন্দু মুসলমানে কোনই পার্থক্য ছিল না। হিন্দু উপযুক্ত হইলে তাঁহার আদেশে রাজকার্য্যে নিযুক্ত হইত। তাঁহার মন্ত্রিসভাস্থ জগৎশেঠ ফতেচাঁদ ও বায়রায়ান আলমচাঁদ উভয়ে হিন্দু ছিলেন, নবাব সুজাউদ্দিন তাঁহাদিগের যথেষ্ট সম্মান করিতেন। এমন কি, মৃত্যু সময়ে স্বীয় পুত্রকে তাঁহাদের পরামর্শানুসারে কার্য্য করিতে উপদেশ দিয়া যান। যশোবন্ত রায়কে উপযুক্ত জানিয়া তিনি ঢাকার দেওয়ানের পদে নিযুক্ত করেন। সুজাউদ্দিনের উদার হৃদয়ের কথা মুতাক্ষরীণকার বিশেষরূপে উল্লেখ করিয়াছেন। তিনি লিখিয়াছেন যে, সুজাউদ্দিনের যাবতীয় সদ্গুণের বিষয় উল্লেখ করা দুরূহ এবং মুতাক্ষরীণের ন্যায় ক্ষুদ্র পুস্তকে তাহা লিখিয়া শেষ করা যায় না। সুজাউদ্দিনের অধীনে এমন কোনও কর্মচারী ছিল না যে, তাঁহার নিকট হইতে কিছু না কিছু অনুগ্রহপ্রাপ্ত হয় নাই। তাঁহার মৃত্যু আসন্ন জানিয়া সুজাউদ্দিন বিচার ও যুদ্ধসংক্রান্ত সকল কর্মচারীকে দুই মাসের বেতন উপহার প্রদান করিয়াছিলেন। প্রত্যেক সৈন্য, গৃহকর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ভৃত্য, এমন কি অন্তঃপুরস্থ সামান্য দাসী পর্যান্ত সে অনুগ্রহ হইতে বঞ্চিত হয় নাই, এবং মৃত্যুর কয়েক দিন পূর্বে তিনি তাঁহাদের প্রত্যেকের নিকট আপনার কৃত অপবাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
রোশনীবাগে সুজাউদ্দিনের মকবরা ছবি: রয় দেব
সুজাউদ্দিন এই প্রকার উদারহৃদয় ছিলেন যে, সাধারণে তাঁহার সহিত পরিচিত ও সকলেই তাঁহার অনুগ্রহভাজন ছিল। তাঁহার জন্মস্থান বুরহানপুরে যে সমস্ত বৃদ্ধা স্ত্রীলোককে দেখিয়াছিলেন, ‘অথবা যাহাদের কথা স্মরণ বা শ্রবণ করিতেন, তাহাদিগকে যথাযোগ্য সাহায্য করিতে যত্নবান হইতেন। যদি কোন ভদ্রলোক মুর্শিদাবাদে উপস্থিত হইতেন, তিনি তৎক্ষণাৎ তাঁহার অনুসন্ধান করিয়া তাঁহার প্রতি বিশেষ-রূপ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করিতেন। তাহার পর সেই ভদ্রলোকের কোন আত্মীয় থাকিলে তাঁহার আবেদনে তাঁহার প্রার্থনা পূর্ণ বা আংশিক রূপে পূরণ করিতেন। যদি কাহারও কোন আত্মীয় না থাকিত, তিনি নিজেই যেন তাঁহার আবেদন পাইয়াছেন, এই রূপ ভাব প্রকাশ করিয়া তাঁহাকে যথোচিত অর্থ সাহায্য প্রদান করিতেন। যে সমুদয় কর্মচারীর দ্বারা তিনি অর্থ সাহায্য প্রেরণ করিতেন, তাঁহারা গৃহীতার নিকট হইতে তাঁহার কণামাত্রও গ্রহণে চেষ্টা করিতেন না। এই সময়ে অনেক স্থলে গৃহীতাদের নিকট হইতে অত্যাচারপূর্ব্বক কিঞ্চিৎ কিঞ্চিৎ গ্রহণ করার নিয়ম অনেক স্থলে প্রচলিত ছিল। কিন্তু সুজাউদ্দিনের কর্মচারিগণ সেরূপ অত্যাচার করিতে বিশেষ রূপে নিষিদ্ধ ছিলেন। যদি কাহারও এই রূপ অত্যাচাবের কথা প্রকাশ পাইত, তিনি জ্ঞাত হইলে তৎক্ষণাৎ তাঁহাকে পদচ্যুত করিয়া গৃহীতাকে অধিকতর সাহায্য করিতেন। সুজা খাঁ কৰ্ম্মচারিগণকে যথেষ্ট সাহায্য করিতেন বলিয়া তাঁহারা তাদৃশ লোভপরায়ণ ছিলেন না। যদি কোন আগন্তুক পদপ্রার্থী হইত, তিনি তৎক্ষণাৎ তাঁহার প্রার্থনা পূরণের চেষ্টা করিতেন। তাঁহার কর্মচারিগণের মধ্যে কাহাকে কাহাকে তিনি প্রতিদিন, কাহাকেও দুই একদিন অন্তর, কাহাকেও বা সপ্তাহে দুইদিন করিয়া নানাবিধ খাদ্যদ্রব্য প্রদান করিতেন। যাহাদিগের সহিত তাঁহার পরিচয় ছিল, ভদ্রই হউক অথবা অপর লোকই হউক, তাহাদিগের নাম তিনি হস্তীদস্তনির্মিতপত্রসমূল আপন স্মারক-পুস্তকে লিখিয়া রাখিতেন, এবং প্রতিদিন শয়ন করিবার পূর্ব্বে সেই সমস্ত নাম পাঠ করিয়া যাহাকে যেরূপ অর্থ সাহায্য করিতে হইবে, তাহা তাঁহাদের নামের পার্শ্বে নির্দেশ করিয়া রাখিতেন। সময়ে সময়ে সেই সাহায্যের পরিমাণ গুরুতর হইয়া উঠিত। যে সমস্ত জমীদার রাজস্ব-প্রদানে বিলম্ব করিতেন, তিনি তাঁহাদের নিকট অথবা তাঁহাদের প্রতিনিধির নিকট সাহায্যপ্রার্থী ব্যক্তিদিগকে তহশীলদাররূপে প্রেরণ করিয়া যে হারে তাহাদিগের কার্য্যের বেতন দিতে হইবে, তাহা নির্দেশ করিয়া দিতেন। জমীদারেরা বিনা আপত্তিতে তাঁহার আদেশ প্রতিপালন করিতেন। তাহার পর তিনি সেই তহশীলদারদিগকে আহ্বান করিয়া তাহারা কিরূপ ভাবে কি প্রাপ্ত হইয়াছে জিজ্ঞাসা করিতেন। যে সরল ভাবে সমুদয় প্রকাশ করিত, তাঁহার উপর নবাব সন্তুষ্ট হই-তেন, যে কিছু গোপনের প্রয়াস পাইত, সে তৎক্ষণাৎ তাঁহার অনুগ্রহ হইতে বঞ্চিত হইত, এবং অপর ব্যক্তি তাঁহার স্থান অধিকার করিত। তাঁহার সমস্ত জীবনই এই রূপ লোকহিতকর কার্য্যে অতিবাহিত হইয়াছিল। মুতাক্ষরীণকার এই রূপে তাঁহার অশেষ প্রশংসা করিয়াছেন।
সুজাউদ্দিন অত্যন্ত সুবিচারক বলিয়া বিখ্যাত ছিলেন। বিচারকার্য্যে তিনি কাহারও অনুরোধ উপরোধ শ্রবণ করিতেন না। যখন কোন বিচার উপস্থিত হইত, তিনি কাহারও কথা না শুনিয়া উভয় পক্ষকে আহ্বান করিতেন, পরে তাহাদিগের প্রত্যেক পক্ষের নিকট হইতে সমস্ত ব্যাপার আনুপূর্ব্বিক শ্রবণ করিয়া ধীর ভাবে বিবেচনার পর আপনার আদেশ প্রকাশ করিতেন। কাহারও অনুরোধ বা নিকটস্থ আত্মীয়ের মিনতি তাঁহাকে ন্যায়পথ হইতে বিচলিত করিতে পারিত না। মুতাক্ষরীণকার তাঁহার বিচার সম্বন্ধে লিখিয়াছেন যে, তিনি এরূপ ন্যায়বান ও সুবিচারক ছিলেন যে, নিতান্ত দরিদ্র ব্যক্তি তাঁহার স্বীয় পুত্রের ন্যায় সমান ভাবে বিচারপ্রাপ্ত হইত। শ্যেন-ভয়ে অভিভূত চটকপক্ষী তাঁহার বক্ষঃস্থলকে একমাত্র আশ্রয়স্থল বিবেচনা করিয়া, কেবল তাঁহার শরণাগত প্রতিপালনের উপর নির্ভর করিয়া তাঁহারই দিকে অগ্রসর হইত। তাঁহার প্রজাবর্গ নসেরুয়াঁর রাজ্যের ন্যায় তাঁহার রাজ্যে বাস করিত। এই রূপ সুবিচারে, প্রজাবর্গের প্রতি উদার ব্যবহারে, সাধারণের প্রতি সৌজন্য প্রকাশে তিনি সকলেরই সম্মানের পাত্র ছিলেন। তাঁহার প্রজাবর্গের মধ্যে কেহই তাঁহার উপর অসন্তুষ্ট ছিল না। কি হিন্দু, কি মুসলান, কি জমীদার, কি প্রজা, কি কর্মচারী, কি সাধারণ, সকলেই একবাক্যে তাঁহার মঙ্গল কামনা করিত। তাঁহার সাধু ব্যবহারে মোহিত হইয়া সকলেই তাঁহার ‘আদেশ প্রতিপালনে প্রাণপণে যত্নবান হইত। সুজাউদ্দিন এই সমস্ত গুণে অলঙ্কৃত হইয়া কেবল একটা মাত্র দোষের জন্য জনসমাজে নিন্দাভাজন হইয়া গিয়াছেন। মুসলমান শাসনকর্তৃগণ যে কলঙ্কের জন্য সভ্যজগতে ঘৃণিত, সুজাউদ্দিন সেই বিলাসিতার হস্ত হইতে নিষ্কৃতি লাভ করিতে পারেন নাই।
ইহা অতীব দুঃখের বিষয় যে, জগতে পূর্ণ সাধুচরিত্র প্রায়ই দেখিতে পাওয়া যায় না। সুজাউদ্দিনের ন্যায় মহৎ চরিত্রেও ইন্দ্রিয়পরায়ণতা স্পর্শ করিয়াছিল। এই বিষয়ে মুর্শিদকুলী খাঁ তাঁহার অপেক্ষা সহস্র গুণে শ্রেষ্ঠ ছিলেন। বিলাসিতা কিম্বা ইন্দ্রিয়পরায়ণতা মুর্শিদকুলী খাঁকে স্পর্শ করিতে পারিত না। কিন্তু সুজাউদ্দিন তাহাতেই মগ্ন হইয়া থাকিতেন। তাঁহার এই দোষের জন্য স্বীয় প্রণয়িনী জিন্নেতেন্নেসা অনেক দিন তাঁহার নিকট হইতে বিচ্ছিন্ন ছিলেন। মুশিদাবাদের সুবেদারী গ্রহণ করিয়া জিন্নেতান্নেসার সহিত তাঁহার মিলন হইলেও তিনি বিলাসিতার হস্ত হইতে অব্যাহতি পান নাই। কিছু দিন রাজ্যশাসনের পর তিনি অত্যন্ত বিলাসপরায়ণ হইয়া উঠেন, ও মন্ত্রিসভার উপর সমস্ত রাজকার্য্যের ভার অর্পণ করিয়া, ভাগীরথীতীরস্থ ফর্হাবাগে সময় যাপন করিতেন। তথায় বসন্ত ও গ্রীষ্ম কালে নানাবিধ সুগন্ধি দ্রব্য গাত্রে লেপন করিয়া কৃত্রিমনির্ঝরশিকরস্নাত মলয়সমীরণে স্নিগ্ধ হইয়া কোকিলকণ্ঠবিনিন্দিত রমণীস্বরে আনন্দ অনুভব করিতে করিতে শেষ জীবন অতিবাহিত করিয়াছিলেন। যদি তাঁহার চরিত্রে এই দোষটী না থাকিত, তাহা হইলে তিনি আদর্শ চরিত্র হইতে পারিতেন। যাহা হউক, সুজাউদ্দিনের ইন্দ্রিয়পরায়ণতা প্রবল থাকিলেও, তাঁহার ঔদার্য্যে, দাক্ষিণ্যে এবং সুবিচারে সকলে বিমোহিত হইয়া, উক্ত দোষ সরল ভাবে ক্ষমা করিত। মুর্শিদাবাদের ইতিহাসে তাঁহার ন্যায় লোকহিতকর নবাবের উল্লেখ দেখা যায় না।
[নিখিলনাথ রায় রচিত মুর্শিদাবাদের ইতিহাস থেকে সংকলিত। শিরোনাম সিল্করুট-এর দেয়া]
