শাহ আলম, কুড়িগ্রাম:
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং কুড়িগ্রাম প্রশাসনের পাল্টাপাল্টি মতামতের কারণে দেশের একমাত্র প্রস্তাবিত কুড়িগ্রাম বালু গবেষণা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপন নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ১৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি এবং এশিয়া মহাদেশের অন্যতম খনিজ সম্পদ আহরণের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন আসার অপার সম্ভাবনা রয়েছে। এই সম্ভাব্য মেগা প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা।
ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীতে যে পরিমাণ খনিজ সম্পদ রয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: ইলমেনাইট ও টাইটানিয়াম (যা রং, প্লাস্টিক, ওষুধ ও ওয়েল্ডিং রডে ব্যবহৃত হয়), জিরকন (সিরামিক, পারমাণবিক প্রযুক্তি, মহাকাশযান ও ইলেকট্রনিক্সে ব্যবহৃত হয়), ম্যাগনেটাইট (চৌম্বকধর্মী খনিজ যা ইস্পাত ও খনি যন্ত্রে ব্যবহৃত হয়), রুটাইল (টাইটানিয়ামের পরিশোধিত রূপ যা প্রসাধনী ও ধাতু শিল্পে ব্যবহৃত হয়), গারনেট (অলংকার, জেট কাটিং ও পাইপ পরিষ্কারে ব্যবহৃত হয়) এবং কোয়ার্টজ (ঘড়ি, কম্পিউটার ও চিকিৎসা যন্ত্রে ব্যবহৃত হয়)।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১১ জুন বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের মোখলেসুর রহমান মিলনায়তনে “বালু গবেষণা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপন, কুড়িগ্রাম, বাংলাদেশ” শীর্ষক প্রস্তাবিত প্রকল্প নিয়ে একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় যমুনা-ব্রহ্মপুত্র নদ ব্যবস্থার নবায়নযোগ্য বালু সম্পদকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম খনিজ-প্রযুক্তি, গবেষণা ও শিল্পভিত্তিক অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত করার লক্ষ্যে ২০২৬ থেকে ২০৭৫ সময়কালের জন্য একটি ৫০ বছরের মহাপরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।
আরও পড়ুন
ভারত থেকে দর্শনা দিয়ে বাংলাদেশে এলো ১৮ নতুন রেলকোচ

বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর (জিএসবি) কুড়িগ্রামে এই কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে প্রায় ১৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়েছে। এই কেন্দ্রের মাধ্যমে ব্রহ্মপুত্রসহ জেলার বিভিন্ন নদনদী থেকে প্রাপ্ত বালু ও খনিজ সম্পদের গবেষণা এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ কার্যক্রম পরিচালিত হবে। দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চালিয়ে জিএসবি চিলমারী উপজেলায় ১৫ একর জমিতে একটি পাইলট রিসার্চ প্ল্যান্ট এবং রাজারহাট উপজেলার টগরাইহাট এলাকায় ১০ একর জমিতে একটি গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ইতিমধ্যে গণপূর্ত অধিদপ্তর প্রকল্পটির জরিপ ও সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন শেষ করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, সেখানে আন্তর্জাতিক মানের ‘মিনারেল স্যান্ডস রিসার্চ হাব’ প্রতিষ্ঠা করা হবে। এ ছাড়া রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস নিয়ে গবেষণা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, স্ক্যাডা ও স্মার্ট মাইনিং প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং একটি জিওলজিক্যাল বিগ ডাটা সেন্টার গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিউক্লিয়ার-গ্রেড জিরকন ও উচ্চ বিশুদ্ধতার কোয়ার্টজ নিয়ে গবেষণারও পরিকল্পনা রয়েছে। এতে বছরে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত রাজস্ব আয়ের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে দেশে টাইটানিয়াম, জিরকোনিয়াম ও রেয়ার আর্থভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলা, আমদানি-নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় শিল্পের বিকাশ এবং একটি খনিজভিত্তিক অর্থনৈতিক করিডর তৈরির প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে কুড়িগ্রাম জেলা দেশের অর্থনীতিতে একটি হাব সেন্টারে পরিণত হওয়ার পাশাপাশি ‘দারিদ্র্যপীড়িত’ জেলার তকমা থেকে মুক্তি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে দেশের একমাত্র এই বালু গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন নিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং কুড়িগ্রাম প্রশাসনের পাল্টাপাল্টি মতামতের কারণে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। গত ১৯ জুলাই জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সভায় ১০ নম্বর আলোচ্য বিষয়ে জানানো হয়, কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসকের পাঠানো প্রতিবেদনে “প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্ভাব্য ব্যয়ের তুলনায় সরকারের প্রাপ্তি উল্লেখযোগ্য হবে না মর্মে অভিমত দেওয়া হয়েছে।”
কিন্তু অনুসন্ধানে জানা গেছে, কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসন এমন কোনো প্রতিবেদন পাঠায়নি। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য কুড়িগ্রাম সদর, চিলমারী ও রাজারহাট উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তারা গত বছর ৫ মার্চ সম্ভাব্য জমির তথ্য-উপাত্ত মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করেছিলেন। সরকারের সম্ভাবনাময় ও দেশের এই বৃহৎ প্রকল্পে এমন বৈরী সিদ্ধান্ত নিয়ে জেলাজুড়ে আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীকে ঘিরে দ্রুত জেলায় প্রকল্পের কাজ শুরুর দাবি জানিয়েছেন জেলাবাসী।
জেলা উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, “সম্ভাবনাময় এই প্রকল্পটি এখনও শুরুই হলো না, সেখানে কীভাবে কর্তৃপক্ষ বলতে পারে যে লাভ হবে না লস হবে? সরকার তো দেশে বহু প্রকল্প নেয় এবং নিচ্ছে। এই প্রকল্প যে শুধু কুড়িগ্রামের স্বার্থ রক্ষা করবে, তা নয়; গবেষণা অনুযায়ী এটি বাস্তবায়িত হলে পুরো দেশের অর্থনীতির চিত্র পরিবর্তন ঘটবে। সম্ভাবনাময় এই প্রকল্পটি দ্রুত চালুর জন্য সরকার কার্যকরী ব্যবস্থা নেবে বলেই আমাদের প্রত্যাশা।”
জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক হাসিবুর রহমান হাসিব বলেন, দেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা এবং খনিজ সম্পদ আহরণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভাবনাকে বাস্তবায়নের জন্য দলমত নির্বিশেষে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
কুড়িগ্রাম গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল ফারুক বলেন, ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকায় অত্যন্ত মূল্যবান ও বিরল খনিজ সম্পদ পাওয়া যায়। ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর কর্তৃক বালু গবেষণা ও প্রক্রিয়াজাত কেন্দ্র স্থাপনের এই প্রকল্পটি আমরা ইতিমধ্যে জমি সম্ভাব্যতা ও কার্যকারিতা যাচাই শেষে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রেরণ করেছি।
কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, “আমি যোগদানের আগে সাবেক জেলা ডিসিদের সময় বালু গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের জন্য সম্ভাব্য জমির তথ্য কর্তৃপক্ষের নিকট প্রেরণ করা হয়েছিল। কিন্তু গত ১৯ জুলাই জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সভায় কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসকের যে অভিমতের কথা বলা হয়েছে, তেমন কোনো প্রতিবেদন বা নেতিবাচক মতামত আমাদের কার্যালয় থেকে পাঠানো হয়নি।”
বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ভূতত্ত্ব) ড. সোহেল রানা বলেন, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর বালু পুনর্বরণযোগ্য। হিমালয় থেকে কুড়িগ্রাম দিয়ে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীতে প্রতিবছর এক বিলিয়ন বালু আসছে। আমরা যদি এই বালু ব্যবহার করতে পারি, তবে এতে কোয়ার্টজ, হেভি মিনারেল ও লাইট মিনারেল পাওয়া যাবে। হেভি মিনারেলের মধ্যে রুটাইল, গারনেট, ইলমেনাইট, জিরকন ও মনাসাইটের মতো মূল্যবান খনিজ সম্পদ রয়েছে। এই বালু থেকে হেভি ও লাইট মিনারেল আলাদা করে তা নিয়ে আমরা কাজ করছি।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং কুড়িগ্রাম প্রশাসনের পাল্টাপাল্টি মতামতের বিষয়ে জানতে চাইলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই। তবে বালু গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন নিয়ে কোনো জটিলতা থাকলে তা দ্রুত নিরসনের আশ্বাস দেন তিনি।
