দেশের অনেক শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনে শ্রেণিকক্ষের পাশাপাশি কোচিং ও প্রাইভেট টিউশন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভালো ফলের প্রতিযোগিতা, অভিভাবকদের প্রত্যাশা ও শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের সীমাবদ্ধতা তাদের কোচিংমুখী করছে। এতে বাড়ছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ওপর আর্থিক চাপ। ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক জীবনযাপন, খেলাধুলা ও সৃজনশীল চর্চা। কোচিংনির্ভরতার কারণ, সংকট ও সমাধান নিয়ে শিক্ষার্থীদের ভাবনা সংকলন করেছেন মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল।
শিক্ষা নাকি পরীক্ষার প্রস্তুতি?
মোহাম্মদ নুর হোসেন নয়ন
শিক্ষা বিভাগ, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, রংপুর
সকালে শ্রেণিকক্ষ, বিকেলে কোচিং, আর সন্ধ্যায় প্রাইভেট টিউশন। এই রুটিনে বন্দি হয়ে পড়ছে অনেক শিক্ষার্থীর শৈশব ও কৈশোর। যে বয়সে জানার আগ্রহ, খেলাধুলা, সৃজনশীলতা ও মুক্তচিন্তার বিকাশ ঘটার কথা, সেই সময়ও ব্যয় হচ্ছে পরীক্ষার প্রস্তুতিতে। শিক্ষার উদ্দেশ্য জ্ঞান অর্জন, কৌতূহল সৃষ্টি ও স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শেখানো। অথচ ভালো ফল, জিপিএ এবং সামাজিক প্রতিযোগিতার চাপে শিক্ষা ক্রমে পরীক্ষা পাসের প্রস্তুতিতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে।
কোচিং ও প্রাইভেট টিউশননির্ভরতা শিক্ষার্থীদের নিজস্ব চিন্তার সময় কমিয়ে দিচ্ছে। বাড়ছে মানসিক চাপ, অন্যদিকে অভিভাবকদের ওপর তৈরি হচ্ছে বাড়তি আর্থিক বোঝা। পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়ন, অভিভাবকদের অতিরিক্ত প্রত্যাশা এবং শ্রেণিকক্ষে কার্যকর পাঠদানের সীমাবদ্ধতা শিক্ষার আনন্দকে সংকুচিত করছে। এই পরিস্থিতি বদলাতে শ্রেণিকক্ষে আনন্দদায়ক ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। মুখস্থ বিদ্যার পরিবর্তে গুরুত্ব দিতে হবে জ্ঞান, বাস্তব দক্ষতা ও সৃজনশীলতার বিকাশে। অভিভাবকদেরও বুঝতে হবে নম্বর সন্তানের মেধা ও সম্ভাবনা যাচাইয়ের একমাত্র মাপকাঠি নয়। শিক্ষা কেবল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার মাধ্যম নয়; বরং চিন্তাশীল, দক্ষ ও মানবিক মানুষ হয়ে ওঠার ভিত্তি।
শ্রেণিকক্ষ হোক কার্যকর
সরফরাজ শিপন
গণিত বিভাগ, সরকারি শাহ্ সুলতান কলেজ, বগুড়া
কোচিংনির্ভরতা কমাতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রকে দায়িত্ব নিতে হবে। এক গবেষণার বরাত দিয়ে ২০১৯ সালে বিবিসি বাংলার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার আগে ৮৬ শতাংশ শিক্ষার্থী কোচিংয়ে যেত। কোচিং না করলে পিছিয়ে পড়তে হবে, এমন ধারণাও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে।
অভিভাবকদের সামাজিক প্রতিযোগিতার চাপে সন্তানকে কোচিংয়ে পাঠানোর পরিবর্তে তার পড়াশোনায় সময় দেওয়া উচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক মজিবুর রহমানের মতে, পাঠ্যক্রম এমন জটিল নয় যে শিক্ষকের সহায়তা ছাড়া তা শেখা সম্ভব নয়। একই প্রতিবেদনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাতের কারণে শ্রেণিকক্ষে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়ার সীমাবদ্ধতার কথাও উঠে এসেছে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে শ্রেণিকক্ষে মনোযোগী ও কার্যকর পাঠদান নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি শিক্ষানীতির লক্ষ্য ও নির্দেশনা অনুযায়ী শ্রেণিকক্ষের মান উন্নয়ন এবং পরীক্ষাকেন্দ্রিক চাপ কমাতে রাষ্ট্রকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
কোচিংয়ের ছায়ায় শিক্ষার্থী
সাদিয়া জাহান হক
প্রথম বর্ষ, ফেনী সরকারি কলেজ
বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় শ্রেণিকক্ষের পাশাপাশি কোচিং ও প্রাইভেট টিউশন অনেক শিক্ষার্থীর প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে। এতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে।
অন্যদিকে, প্রতিযোগিতার চাপে শিক্ষার্থীরা হারাচ্ছে মানসিক প্রশান্তি। ফলে শিক্ষা আনন্দের পরিবর্তে উৎকণ্ঠা ও হতাশার কারণ হয়ে উঠছে।
অভিভাবকদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও সামাজিক চাপ এই প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত ও আনন্দদায়ক পাঠদানের অভাবও শিক্ষার্থীদের কোচিংমুখী হওয়ার অন্যতম কারণ। কোচিংয়ের ব্যয় মেটাতে কোনো কোনো শিক্ষার্থীকে নিজের খরচ চালানোর জন্য বিভিন্ন কাজও করতে হচ্ছে।
ভালো ফলের চাপ শিক্ষার্থীদের শখ, সৃজনশীলতা ও দক্ষতা বিকাশের সুযোগ সীমিত করছে। এই পরিস্থিতি বদলাতে শ্রেণিকক্ষে যোগ্য শিক্ষকের মাধ্যমে কার্যকর পাঠদান নিশ্চিত করা জরুরি। পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়নের পাশাপাশি সৃজনশীল ও বাস্তবমুখী শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। অসুস্থ প্রতিযোগিতা কমিয়ে শিক্ষার্থীদের মেধা ও সম্ভাবনার বিকাশে মনোযোগ দিতে হবে।
শিক্ষার নামে মানসিক চাপ
সোমনা আক্তার
উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ
শিক্ষার উদ্দেশ্য জ্ঞান অর্জন। অথচ শিক্ষা অর্জন করতে গিয়েই অনেক শিক্ষার্থী স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ হারাচ্ছে। বিদ্যালয় বা কলেজে শ্রেণিকক্ষের পাঠ শেষ করেও তাদের ছুটতে হচ্ছে কোচিং ও প্রাইভেট টিউশনে। ভালো ফলের প্রতিযোগিতা, অভিভাবকদের প্রত্যাশা এবং শ্রেণিকক্ষে পাঠ পুরোপুরি বুঝতে না পারার কারণে বাড়ছে এই নির্ভরতা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পড়াশোনার চাপে শিক্ষার্থীরা পর্যাপ্ত বিশ্রাম, খেলাধুলা ও বিনোদনের সময় পাচ্ছে না। ফলে তাদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে মানসিক চাপ, ক্লান্তি ও একঘেয়েমি। অন্যদিকে, কোচিংয়ের বাড়তি ব্যয় অনেক পরিবারের জন্য আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অথচ অর্থ ব্যয় করলে যে প্রকৃত জ্ঞান অর্জন নিশ্চিত হবে, এমন নয়। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান আরও কার্যকর করতে হবে। শিক্ষকদের শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে। অভিভাবকদেরও নম্বরের চেয়ে শেখার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগে কোচিংনির্ভরতা কমানো সম্ভব। শিক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতি নয়, সুন্দর ও স্বাভাবিক জীবন গড়ার উপযোগী শিক্ষাও পাক।
শিক্ষা হোক শ্রেণিকেন্দ্রিক
নুসরাত জাহান জেরিন
আইন বিভাগ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া আইন কলেজ
কয়েক বছর আগেও শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের কাছ থেকে পড়া বুঝে নেওয়ার ওপর বেশি নির্ভর করত। কিন্তু কোচিংনির্ভর শিক্ষা এখন পড়াশোনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এতে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কিছু শিক্ষকের মনোযোগও শ্রেণিকক্ষের বাইরে ব্যক্তিগত টিউশন ও কোচিংয়ের দিকে চলে যাচ্ছে। শ্রেণিকক্ষে পাঠ ভালোভাবে বুঝতে না পারা, পরীক্ষায় ভালো ফলের চাপ এবং অন্যদের তুলনায় পিছিয়ে পড়ার ভয় শিক্ষার্থীদের কোচিংমুখী করছে। অনেক অভিভাবকও মনে করেন, ভালো ফল করতে হলে সন্তানকে কোচিংয়ে পড়াতেই হবে। অথচ এই বাড়তি ব্যয় অনেক পরিবারের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে উঠছে। কোচিংনির্ভরতা কমাতে প্রথমেই শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান উন্নত করতে হবে। শিক্ষকদের দায়িত্বশীল, আন্তরিক ও শিক্ষার্থীবান্ধব হতে হবে। এমনভাবে পাঠদান করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে বিষয়গুলো সহজে বুঝতে পারে। এতে শেখার আগ্রহ বাড়বে এবং শ্রেণিকক্ষে মনোযোগও বৃদ্ধি পাবে। শিক্ষার্থীদেরও শ্রেণিকক্ষে মনোযোগী হতে হবে। পড়াশোনাকে কেবল পরীক্ষায় ভালো ফলের মাধ্যম হিসেবে না দেখে বিষয়গুলো বুঝে শেখার প্রতি আগ্রহী হতে হবে।
শ্রেণিকক্ষ বনাম কোচিং
আমানুর রহমান
ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগ, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ, ঢাকা
শিক্ষার আলো জ্বলে ওঠার কথা শ্রেণিকক্ষে। অথচ অনেক শিক্ষার্থীর কাছে শেখার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে কোচিং। বিদ্যালয়ে পাঠ শেষ করে তাদের ছুটতে হচ্ছে প্রাইভেট টিউশন বা কোচিং সেন্টারে। এর পেছনে রয়েছে শ্রেণিকক্ষে পাঠ বুঝতে না পারা, পরীক্ষায় ভালো ফলের চাপ, অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং অভিভাবকদের অতিরিক্ত প্রত্যাশা।
কোচিংয়ের বাড়তি ব্যয়ে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের বাজেটে চাপ পড়ছে। অন্যদিকে, দীর্ঘ সময় পড়াশোনায় ব্যস্ত থাকায় শিক্ষার্থীরা হারাচ্ছে খেলাধুলা, বিশ্রাম ও পরিবারের সঙ্গে আনন্দময় সময় কাটানোর সুযোগ। ফলে শিক্ষা অনেকের কাছে আনন্দের বদলে দীর্ঘস্থায়ী দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠছে। কোচিংয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান হতে হবে আরও কার্যকর, অংশগ্রহণমূলক ও শিক্ষার্থীবান্ধব। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা, নিয়মিত পাঠ মূল্যায়ন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত সহায়ক ক্লাসের ব্যবস্থা এবং অভিভাবকদের বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি জরুরি। পাশাপাশি শিক্ষার মান নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রকেও নিতে হবে। কারণ, শিক্ষা কোনো মুনাফাভিত্তিক পণ্য বা বাড়তি বিলাসিতা নয়; এটি প্রতিটি শিক্ষার্থীর মৌলিক অধিকার।
