ইউক্রেনের সামরিক ড্রোনের কার্যক্রম ব্যাহত করতে স্পেসএক্সের স্টারলিংক সেবা সীমিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে কিয়েভ। বুধবার ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা জানান, আগাম কোনো সতর্কতা ছাড়াই উচ্চগতিতে চলাচলকারী সামরিক ড্রোনে ব্যবহৃত স্টারলিংক টার্মিনালগুলোর সংযোগে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এতে রুশ লক্ষ্যবস্তুতে হামলা এবং রুশ ড্রোন প্রতিহত করার কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
এদিকে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ ও দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর খারকিভসহ বিভিন্ন এলাকায় রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় প্রায় ৬ লাখ মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছেন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এ হামলাকে জ্বালানি স্থাপনায় যুদ্ধবিরতি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আহ্বানের প্রতি ‘প্রকাশ্য অবজ্ঞা’ বলে মন্তব্য করেছেন।
বার্তাসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর গত ফেব্রুয়ারি থেকে জ্বালানির দাম বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে জ্বালানির দাম কমানোর চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন। একই সঙ্গে রুশ তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ করতে কিয়েভের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ট্রাম্প। এমনকি ইউক্রেনীয়দের জেলেনস্কির পরিবর্তে নতুন নেতা বেছে নেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।
‘পিয়ার্স মরগান আনসেন্সরড’ অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন আমাদের পক্ষের পরিবর্তে অন্য পক্ষ বেছে নেন, তখন কষ্ট লাগে।’
তিনি বলেন, ট্রাম্প ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করলে তার আপত্তি নেই। তবে ‘মাঝখানে থাকলে মাঝখানেই থাকতে হবে’।
ইউক্রেনের সামরিক কাজে ব্যবহৃত স্টারলিংক সেবা সীমিত করার বিষয়ে জেলেনস্কি বলেন, ‘এটি বড় ধরনের ভুল। এই সিদ্ধান্তের কারণে অনেক মানুষ প্রাণ হারাবেন।’ তবে এ সিদ্ধান্তের জন্য তিনি সরাসরি কাউকে দায়ী করেননি।
স্টারলিংক নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে পরিচিত স্টারলিংক পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক বলেছেন, সেবাটির গতি নিয়ন্ত্রণ করে মার্কিন সরকার।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, ‘গতিসীমা বা ব্যবহারের ওপর যেকোনো বিধিনিষেধের সিদ্ধান্ত নেয় মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং চূড়ান্তভাবে প্রেসিডেন্ট।’
ইউক্রেনের সামরিক কর্মকর্তাদের দাবি, উচ্চগতিতে চলাচলের সময় সামরিক মানের স্টারলিংক টার্মিনালগুলোর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করেছে। দেশটির সামরিক ড্রোনের দিকনির্দেশনা ব্যবস্থায় স্টারলিংকের যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা হয়। ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল ছাড়াও রুশ বাহিনীর দখলে থাকা এলাকাতেও এসব টার্মিনাল ব্যবহৃত হয়।
জেলেনস্কির উপদেষ্টা সেরহি বেসক্রেস্তনভ টেলিগ্রামে লিখেছেন, ‘আমাদের প্রতিরক্ষা বাহিনী এ বিধিনিষেধ সম্পর্কে কোনো আগাম সতর্কতা পায়নি। ফলে কয়েকটি অভিযান ব্যাহত হয়েছে।’
তার ভাষ্য অনুযায়ী, স্পেসএক্সের সামরিক ও গোয়েন্দা যোগাযোগসেবা স্টারশিল্ডের ওপরও এ বিধিনিষেধ প্রভাব ফেলেছে।
ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র এবং সামরিক বাহিনীর আরেকটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, গতিসীমার কারণে রুশ লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো এবং রুশ ড্রোনের বিরুদ্ধে ইউক্রেনের প্রতিরোধী ড্রোন পরিচালনা দুই ক্ষেত্রেই সমস্যা হচ্ছে।
বেসক্রেস্তনভের দাবি, স্পেসএক্স ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটার গতিসীমা নির্ধারণ করেছে। তবে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্রটি জানিয়েছে, ঘণ্টায় এর অর্ধেকেরও কম গতিতে চলার সময় সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার অভিযোগ করেছেন সামরিক ইউনিটগুলো।
হঠাৎ আরোপ করা বিধিনিষেধের ব্যাখ্যা জানতে ইউক্রেন স্পেসএক্স, মার্কিন সরকার ও ন্যাটোর সঙ্গে যোগাযোগ করছে বলে জানিয়েছে সূত্রটি।
ইউক্রেনের স্টারলিংক ব্যবহারের খরচ বহন করে পোল্যান্ড। বিধিনিষেধের খবরে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাদোস্লাভ সিকোরস্কি।
এক্সে ইলন মাস্কের উদ্দেশ্যে তিনি লেখেন, ‘আপনি কি আবার আপনার পণ্য নিয়ে রাজনীতি করছেন? ইউরোপীয় গ্রাহক হিসেবে আমরা বিষয়টি নজরে রাখছি।’ তবে এ বিষয়ে মাস্কের তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ
ইউক্রেনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে যুক্তরাষ্ট্র রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগাম সতর্কতা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ বন্ধ করার হুমকি দিয়েছে বলে রয়টার্সসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছে একাধিক সূত্র। রুশ তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলা বন্ধ করাই এ চাপের উদ্দেশ্য বলে জানা গেছে।
ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা মঙ্গলবার রাতে জানান, টানা দ্বিতীয় দিনের মতো রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগে পশ্চিমা অংশীদারদের কাছ থেকে কোনো সতর্কবার্তা পাননি তারা। তবে ট্রাম্প মঙ্গলবার বলেছেন, ওয়াশিংটন ইউক্রেনকে গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া অব্যাহত রেখেছে।
বুধবার লন্ডনে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের সঙ্গে বৈঠকের পর জেলেনস্কি বলেন, ইউক্রেনে স্টারলিংক সংযোগ নিয়ে সৃষ্ট সমস্যার সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে রাশিয়া। কারণ, রুশ ড্রোন প্রতিহত করার কাজে ইউক্রেনের ড্রোনগুলোর কার্যক্রম অনেকাংশে এই সংযোগের ওপর নির্ভরশীল।
এদিকে ইউক্রেনকে ৪ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড বা প্রায় ৫ কোটি ৯৬ লাখ ডলারের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বার্নহাম। এর মধ্যে ১ কোটি পাউন্ডের ক্ষেপণাস্ত্র জরুরি প্রয়োজন মেটাতে দ্রুত পাঠানো হবে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র জেট ইঞ্জিনচালিত রুশ ড্রোন লক্ষ্য করে ব্যবহার করা যায়।
এ ছাড়া ইউক্রেনের নেতৃত্ব পরিবর্তনের বিষয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যও প্রত্যাখ্যান করেছেন জেলেনস্কি। তিনি বলেন, ‘এটি আমাদের জনগণের সিদ্ধান্ত। ট্রাম্প, মাস্ক কিংবা বিশ্বের অন্য কেউ অন্য দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করে দিতে পারেন না।’
