নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে নীতিগত অসংগতিকে বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করেন টিকে গ্রুপের গ্রুপ ডিরেক্টর মোহাম্মাদ মুস্তাফা হায়দার।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলার পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও পরিবেশ সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় নীতিগত জটিলতা ও কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা দূর করার দাবি জানিয়েছেন শিল্পোদ্যোক্তারা। তাদের মতে, শিল্প খাতে জ্বালানি সংকট, উচ্চ সুদহার, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে নীতিগত বাধা এবং আমদানি-রফতানি প্রক্রিয়ার জটিলতা শিল্পের সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতার সামর্থ্য কমিয়ে দিচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন, গ্রিন ফাইন্যান্সের সুযোগ সম্প্রসারণ, শিল্পের জ্বালানি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা আদায়ে জোরালো দরকষাকষির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।
বণিক বার্তা আয়োজিত ‘জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনীতির পুনর্বিন্যাস’ শীর্ষক গ্রিন ডায়ালগে অংশ নিয়ে উদ্যোক্তারা এ বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন। রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে গতকাল এ নীতি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
আলোচনায় অংশ নিয়ে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোস্তফা কামাল বলেন, ‘ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যেতে হলে প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। শিল্পের প্রকৃত অগ্রগতি তখনই সম্ভব, যখন তা প্রকৃতি, পরিবেশ ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। নতুন শিল্প স্থাপনের পরিকল্পনা থেকে শুরু করে উৎপাদনের প্রতিটি পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট এলাকার জলবায়ু ও মানুষের জীবনযাত্রার বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিল্পের বিকাশে সরকারের নীতিগত জটিলতাও দূর করতে হবে।’
নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে নীতিগত অসংগতিকে বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করেন টিকে গ্রুপের গ্রুপ ডিরেক্টর মোহাম্মাদ মুস্তাফা হায়দার। তিনি বলেন, ‘সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য মার্চেন্ট পাওয়ারের একটি নতুন নীতিমালা প্রস্তাব করেছে। এতে বিদ্যুতের মিটারিং তাৎক্ষণিক ভিত্তিতে করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সময়ই কেবল তা ক্রেতাদের সরবরাহ করা যাবে। উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করে পরবর্তী সময়ে গ্রিড বা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয়ের সুযোগ রাখা হয়নি। এ ধরনের বিধিনিষেধ কার্যকর হলে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আটকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
মুস্তাফা হায়দার আরো বলেন, ‘সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের লক্ষ্য ও নীতিমালার মধ্যে এ ধরনের অসংগতি দূর করা প্রয়োজন। এতে কার্বন নিঃসরণ কমাতে আগ্রহী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো উৎসাহিত হবে। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ছাদে পর্যাপ্ত সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সুযোগ নেই, তারা মার্চেন্ট পাওয়ার প্লান্ট থেকে উৎস শনাক্তযোগ্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারবে।’
আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় বাংলাদেশের দক্ষ দরকষাকষির সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসি ও অনন্ত গ্রুপের চেয়ারম্যান শরীফ জহীর। তিনি বলেন, ‘কপ৩১-এর মতো আন্তর্জাতিক প্লাটফর্মে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের দক্ষ ও দৃঢ় দরকষাকষিকারী হিসেবে ভূমিকা রাখতে হবে। উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে জলবায়ু ক্ষতিপূরণ ও অর্থায়নের ন্যায্য হিস্যা আদায়ে প্রস্তুত করতে হবে নিজেদের।’
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও পরিবেশ সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার পাশাপাশি গ্রিন ফাইন্যান্সের সুযোগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে এ শিল্পোদ্যোক্তা বলেন, ‘খেলাপি ঋণের উচ্চ হারের কারণে অনেক ব্যাংক গ্রিন ফাইন্যান্স ও গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ডের (জিটিএফ) সুবিধা নিতে পারছে না। এসব তহবিল থেকে অর্থায়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের সীমা অন্তত ২০ শতাংশ পর্যন্ত শিথিল করা উচিত। দায়িত্বশীল বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যাংক খাত সবুজ ও টেকসই অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’
শিল্পায়নের স্বার্থে সুষম জ্বালানি নীতি প্রয়োজন উল্লেখ করে শরীফ জহীর আরো বলেন, ‘শিল্পের জন্য জমি ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতেও পর্যাপ্ত জমির প্রয়োজন। সরকারের মালিকানাধীন ৩০ লাখ একর খাসজমি থেকে কৃষিজমির ক্ষতি না করে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে জমি বরাদ্দ দেয়া গেলে বিশ্বব্যাংক কিংবা এডিবির অর্থায়নে আগামী পাঁচ বছরে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব।’
তৈরি পোশাক খাতের সংকট তুলে ধরে হ্যামস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী শফিকুর রহমান বলেন, ‘বর্তমানে আরএমজি খাত ইতিহাসের সম্ভবত সবচেয়ে বড় সংকট ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো জ্বালানি সংকট। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় নীতিগত জটিলতার কারণে আমরা ইতিপূর্বে সোলার এনার্জি থেকে খুব বেশি সুফল নিতে পারিনি। তবে সারা বিশ্বে এটি স্বীকৃত যে সোলার থেকে দিনে গড়ে ৪ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না। একদম না পাওয়ার চেয়ে ৪ ঘণ্টা অনেক বড় বিষয়, কিন্তু শিল্পের জন্য বাকি ২০ ঘণ্টার জ্বালানি সক্ষমতা নিশ্চিত করা আরো জরুরি। আগামী দিনে আরএমজি ও টেক্সটাইল খাতকে টেকসই করতে হলে আমাদের জ্বালানি সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর আরো বেশি মনোযোগ দিতে হবে।’
আন্তর্জাতিক অনুদানের ওপর নির্ভর করে জলবায়ু মোকাবেলার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা যাবে না বলেও মনে করেন এ শিল্পোদ্যোক্তা। তিনি বলেন, ‘সামনে কপ৩১ জলবায়ু সম্মেলন আসছে। বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলনগুলোর আলোচনা ও বাস্তবতা থেকে মনে হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী দেশগুলো অর্থায়নে অনিচ্ছুক। ফলে আন্তর্জাতিক অনুদানের ওপর নির্ভর করে দেশের জলবায়ু মোকাবেলার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা যথেষ্ট হবে না। গত ১০-১২ বছরে পিকেএসএফ প্রায় ১২৫ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করতে পারলেও প্রতিটি প্রকল্প বাস্তবায়নে ছয়-সাত বছর লেগে যায়। তাই শুধু অনুদানের অপেক্ষায় না থেকে বিকল্প অর্থায়ন ও বিনিয়োগের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।’
শফিকুর রহমান আরো বলেন, ‘বর্তমানে নানা কারণে আমাদের তৈরি পোশাক খাতের সক্ষমতা দিন দিন কমে আসছে। জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি ব্যাংকের উচ্চ সুদহার শিল্পপ্রতিষ্ঠান টেকসই করার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া এনবিআর, কাস্টমস ও বন্ড অফিসের সঙ্গে যুক্ত জটিলতাগুলোও আমাদের প্রতিদিনের বড় চ্যালেঞ্জ।’
