Published on
:
2 min read
এই সময়: দিশাহীন নগরায়নের চাপে ক্রমেই সঙ্কুচিত হচ্ছে জলচর পাখিদের নিরাপদ আবাস। গঙ্গা–ইচ্ছামতী অববাহিকার বিস্তীর্ণ প্লাবনভূমিতে একসময় পরিযায়ী ও স্থানীয় জলচর পাখিদের যে সমৃদ্ধ জগৎ ছিল, জলাভূমির চরিত্র বদলে যাওয়ায় তা এখন বিপন্ন। গবেষকদের আশঙ্কা, ২০২৯–এর মধ্যে এই অঞ্চলে পাখিদের মূল নির্ভরস্থল বা ‘কোর হ্যাবিট্যাট’ প্রায় ২০ শতাংশ কমে যেতে চলেছে। একই সময়ে উচ্চমানের পরিবেশগত করিডরের প্রায় ৪৪ শতাংশ হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘রিমোট সেন্সিং অ্যাপ্লিকেশনস: সোসাইটি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’-এ প্রকাশিত গবেষণায় এই ছবি উঠে এসেছে। যাদবপুর ও আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের দল নদিয়া ও উত্তর ২৪ পরগনার প্রায় ৯৮৭ বর্গকিলোমিটার এলাকায় সমীক্ষা করেছে। ‘সেন্ট্রাল এশিয়ান ফ্লাইওয়ে’-র গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই অঞ্চলে রয়েছে ১৯টি বড় জলাভূমি। ২০১৭ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত সমীক্ষায় ২৯ প্রজাতির জলচর পাখির উপস্থিতি নথিবদ্ধ হয়েছে। ভারতীয় গো-বক, খয়েরী কাস্তেচরা, নর্দান ল্যাপউইং, কটন পিগমি গুজ়, স্পট বিল্ড ডাকের পাশাপাশি বক, মাছরাঙা, পানকৌড়ি ও খঞ্জনার মতো পাখিও রয়েছে সেই তালিকায়। গবেষণাটি করেছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুগোল বিভাগের ‘ল্যান্ডস্কেপ ইকোলজি ল্যাবরেটরি’–র বিয়াস দে, দেবজিৎ দত্ত ও প্রশান্তকুমার ঘোষ, আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আজ়নারুল ইসলাম এবং ডক্টর কানাইলাল ভট্টাচার্য কলেজের ভুগোল বিভাগের বিপ্লব সরকার।
গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, শুধু জলাশয়ের আয়তন নয়, জলাশয়গুলির মধ্যে জলপথের সংযোগও পাখিদের টিকে থাকার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইচ্ছামতীর সঙ্গে যুক্ত জলাশয়গুলিতে পাখির বৈচিত্র্য ও সমাগম তুলনামূলক বেশি। বিপরীতে নদী থেকে বিচ্ছিন্ন জলাশয়ে পাখির উপস্থিতি কমে যাচ্ছে। বড় জলাশয়ের কচুরিপানা, জঙ্গল সাফ এবং সংযোগ বিচ্ছিন্নতার চাপে কার্যত মৃতপ্রায়।
মেশিন-লার্নিং মডেলের পূর্বাভাস বলছে, ওই এলাকায় ২০২৯–এর মধ্যে জনবসতি অন্তত ১৫ শতাংশ বাড়তে পারে। নদিয়ার চাকদহ, উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটা ও স্বরূপনগরে নগরায়ণের চাপে কমছে সবুজ ও মুক্ত জলাশয়। ফলে পাখিদের খাদ্য, বিশ্রাম ও প্রজননের জায়গা বিপন্ন হবে।
পরিযায়ী পাখিরা দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এই জলাভূমিতে আসে খাদ্য ও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে। জলাশয় ছোট হয়ে যাওয়া, কচুরিপানার আধিক্য, চারপাশে নির্মাণ এবং জলপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেলে সেই নির্ভরতা ভেঙে পড়ে। ফলে একটি জলাশয়ের সংকট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সংলগ্ন এলাকাতেও। গবেষণার ফল তাই শুধু পাখি সংরক্ষণের বার্তা নয়, প্লাবনভূমির সামগ্রিক পরিবেশ রক্ষারও সতর্কবার্তা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচ্ছিন্ন কয়েকটি জলাভূমি বাঁচিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। নদী ও জলপথের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা, জলাভূমির মধ্যে সবুজ করিডর রক্ষা, অপরিকল্পিত নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষিতে বিষাক্ত কীটনাশকের ব্যবহার কমানো জরুরি। কারণ, জলচর পাখি শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য নয়, গোটা ভূদৃশ্যের স্বাস্থ্য বোঝার গুরুত্বপূর্ণ সূচকও। এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় জলাশয়ের নথিভুক্তি, দখল রোধ এবং নিয়মিত নজরদারির পাশাপাশি নদীর সঙ্গে পুরোনো জলপথের সংযোগ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগও জরুরি। নইলে বিপদ আরও বাড়বে।
