পুলিশ যদি গ্রেপ্তার-বাণিজ্য ও চাঁদাবাজি করতে পারে তবে সরকার-সমর্থক ছাত্রনেতারাও বসে থাকবে কেন? গ্রেপ্তার-বাণিজ্য না হোক, তারা নিয়োগ-বাণিজ্য করে থাকে। আর ছিনতাই তো চলছেই। ঢাকার চকবাজারের এক ব্যবসায়ী টাকা নিয়ে যাচ্ছিলেন ব্যাংকে, জমা দেবেন বলে। চার-পাঁচজন যুবক তাকে ঘিরে ফেলল, ‘ব্যাটা তুই ফ্যাসিবাদের দোসর,’ বলে আর কোনো কথা নেই টেনেহিঁচড়ে রিকশায় তুলে তাকে একটি নির্মাণাধীন ভবনে নিয়ে গিয়ে টাকাগুলো কেড়ে নিল। সাধে কী আর একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র সংগঠনের সভাপতি বলেছেন, লাগলে কোটি টাকা দেবেন, তবুও কমিটি তার চাই।...
অন্যায়ের প্রতিবাদ যে একেবারেই হয় না তা নয়। প্রতিবাদ হয়। মানববন্ধন, সমাবেশ, মিছিল এমনকি হরতাল, অবরোধ ইত্যাদি ডাকা হয়ে থাকে। কিন্তু তাতে তেমন একটা ফল হয় না। প্রতিবাদ এক সময়ে বেশ হতো। বড় সমাবেশ হতো, মিছিল হতো। এখন সেগুলো অতীতের স্মৃতি। জর্জ বুশ যখন ইরাক আক্রমণ করেন তখন ঢাকা শহরে বড় বড় প্রতিবাদের ঘটনা ঘটেছে। জুমার নামাজ শেষে বায়তুল মোকাররম মসজিদ থেকে মুসল্লিরা মস্ত বড় মিছিল বের করেছেন।
তার চেয়েও বড় মিছিল করেছেন প্রগতিশীল সংগঠনগুলো একত্র হয়ে, সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। অথচ এখন যখন মার্কিন, ইসরায়েলি ঘাতকরা ইরানে হত্যাকাণ্ডের বর্বর ও অমানবিক গণহত্যা ঘটিয়ে চলেছে এখন তেমন কোনো প্রতিবাদ নেই। এখন প্রতিবাদী সমাবেশের জন্য খোলা জায়গাই নেই; মিছিল করাও দুঃসাধ্য। ট্রাফিক আছে, রয়েছে পুলিশ। তার চেয়েও বড় সত্য উৎসাহ নেই, উদ্যম নেই মানুষের। মানুষ এখন খুবই একা, বড়ই ব্যস্ত নিজেকে বাঁচানো নিয়ে। সে ভীষণ নিঃসঙ্গ। তাকে শ্রম বিক্রি করে বাঁচতে হয়। বিক্রির বাজারে অবস্থা মোটেই ভালো নয়। বাজার ক্রেতার, বিক্রেতার নয়। কাজ খুঁজতে হয়, অস্থিরভাবে। মূল্যস্ফীতি এমন যে একটা কাজে কুলায় না। ওদিকে পণ্যক্রয়ের জন্য লাইন দিতে হয় টিসিবির ট্রাকের সামনে। ভুগতে হয় নানা প্রকারের নিরাপত্তাহীনতায়।
পত্রিকায় খবর এসেছে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। ডেঙ্গুতে মৃত্যু ইতিহাস ভেঙেছে। বায়ুদূষণে মানুষের গড় আয়ু কমে যাচ্ছে। শিশুরা খর্বাকৃত হচ্ছে। কারখানা বন্ধ রেখে তিন গুণ দামে স্যালাইন আমদানি করা হচ্ছে; বস্তিতে আগুন লেগেছে। আগুন লেগেছে বাজারে। মার্কেটে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। সেখানে যে ব্যবসায়ী ৪ লাখ টাকার জিনিস কিনে রেখেছিলেন, বিক্রি করতে পারবেন বলে, তিনি এক টাকার জিনিসও বিক্রি করতে পারেননি, সর্বস্বান্ত হয়ে পথে বসে পড়েছেন। এসব জায়গায় উন্নয়ন ঘটবে।
উঁচু দালান উঠবে, কিন্তু উৎপাটিতরা আর শিকড় খুঁজে পাবেন না। ওদিকে এক বছরে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে ৫ হাজার। নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া প্রার্থীদের হলফনামায় দেখা গেছে কিছু কিছু সংসদ সদস্যের, তাদের স্ত্রীদের আয় ও সম্পদ বৃদ্ধি ঘটেছে অবিশ্বাস্য, প্রায় অলৌকিক রকমের। এ বিষয়ে একটি দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠায় শীর্ষ শিরোনাম এই রকমের: ‘জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় হলফনামায় দেওয়া তথ্য মন্ত্রী-এমপিদের সম্পদ বেড়েছে ১ থেকে ২০০ গুণ পর্যন্ত’। এদের অনেকেরই আয়ের উৎস নাকি মাছের চাষ।
আর এটা তো এখন কোনো খবরই নয় যে, স্ত্রীকে হত্যা করে লাশ মাটিচাপা দিয়েছে স্বামী। এমনকি এই খবরটাও আমাদের বিস্মিত করার ক্ষমতা হারিয়েছে যে, শরীয়তপুরের আমেনা বেগম তিন সন্তানকে নিয়ে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন; দুই সন্তানকে উদ্ধার করেছে স্থানীয় মানুষ, মা ও বড় ছেলের লাশ খুঁজে পাওয়া যায়নি। আমেনা বেগমের বেকার স্বামী চাপ দিচ্ছিল শ্বশুরবাড়ি থেকে টাকা আনার জন্য; কারণ সে বিদেশে যাবে। স্ত্রী কী করে টাকা আনবে তার বাবার কাছ থেকে? বাবা তো শ্রমজীবী।
টাকা আনতে না পারার অপরাধে স্বামী স্ত্রীকে বলেছে ঘর ছেড়ে চলে যেতে। কোথায় যাবে, স্ত্রীর এই প্রশ্নের জবাবে স্বামী বলেছে, ‘যাওয়ার জায়গা না থাকলে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে মর।’ স্ত্রী সেটাই করেছেন। আর এই খবরটাও তো আমাদের চমকে দেয় না; যাতে বলা হচ্ছে যে বিছানায় পড়ে ছিল কাঁথায় জড়ানো স্ত্রীর রক্তাক্ত মরদেহ, আর পাশে শুয়ে ছিল স্বামী। ছেলে ঘুমাচ্ছিল পাশের কামরায়। ঘটনার কারণ নাকি স্বামী সন্দেহ করত তার স্ত্রীকে। এই খবরও মোটেই চাঞ্চল্যকর নয় যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ঝগড়া করে স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে আত্মহত্যা করেছে?
ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রতিবাদের কথাও শোনা যায়, খুবই অল্প যদিও। যেমন জাতীয় নদী কমিশনের চেয়ারম্যান প্রতিবাদ করেছেন, নদীর বালিখেকোদের বিরুদ্ধে। ফল হয়েছে এই যে, তিনি তার চাকরিটি হারিয়েছেন। তিনি অবশ্য তাতে হতাশ হননি। বলেছেন, ‘আমি সততার সঙ্গে কাজ করেছি। কাজের কোনো শৈথিল্য ছিল কি না সেটা জনগণ দেখবে। তবে এটা বলতে পারি পদ্মা, মেঘনা, যমুনাসহ সব নদনদীতে জলদস্যু, বালুখেকো, দখলদারদের বিজয় হয়েছে।’
ওদের বিজয় মানে যে জনগণের পরাজয় তাতে তো কোনো সন্দেহ নেই। আর তার পদচ্যুতি কেবল যে তার ব্যক্তিগত শাস্তি তা তো নয়, অন্যদের জন্যও সতর্কবাণী বটে। জনগণ সংগ্রামও করেছে, সাময়িক বিজয়ও লাভ করেছে, কিন্তু চূড়ান্ত বিজয় দেখা যাচ্ছে পুঁজিবাদেরই। তবে পুঁজিবাদের চূড়ান্ত পরাজয় যে আসন্ন এমন লক্ষণও দেখা যাচ্ছে। কেবল আমাদের দেশে নয়, পৃথিবীর সর্বত্র।
বিদ্যমান ব্যবস্থাটা তরুণদের জানিয়ে দিয়েছে যে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করার চেষ্টাই ভবিষ্যৎ গড়ার শ্রেষ্ঠ উপায় এবং উদ্যোগ। এটা আগেও ছিল, এখনো আছে। ব্রিটিশ যুগে সরকারি চাকরির চেয়ে বড় কাজ আর কী ছিল? পাকিস্তানামলেও সেই বাস্তবতা অক্ষুণ্ন থেকেছে। ওদিকে রাষ্ট্রীয় চেষ্টাটা তো ছিল একটি পুঁজিবাদী ব্যবস্থা গড়ে তোলার। পুঁজিবাদে কিন্তু ব্যক্তিগত উদ্যোগ, উদ্যম ইত্যাদিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। ব্যক্তিমালিকানাকে বিকশিত করাই তার লক্ষ্য। তাহলে? বাংলাদেশে সরকারি চাকরি কেন ব্যক্তিগত উদ্যোগকে ম্লান করে রেখেছে? এর কারণ নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রই হচ্ছে সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান; এবং রাষ্ট্রশক্তিই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।
রাষ্ট্র তো রয়ে গেছে আগের মতোই আমলাতান্ত্রিক। স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্র যে আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় অধিক আমলাতান্ত্রিক, তাতে সন্দেহের কোনো সুযোগই নেই। বেসামরিক এবং সামরিক আমলাতন্ত্রের হাতেই অদৃশ্য এবং দৃশ্যমান উভয় রূপে রাষ্ট্রের মূল ক্ষমতা ন্যস্ত। ক্ষমতা তো বটেই, সুযোগ-সুবিধাও আমলাতন্ত্রের হাতেই ধৃত। তরুণরা সে খবর রাখে। প্রাইভেট সেক্টরে বেতন অধিক হতে পারে; কিন্তু ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত; এবং উপরি আয় চাইলে অতিরিক্ত পরিশ্রম আবশ্যক হয়।
পুলিশের ক্ষমতা কখন কম ছিল? ব্রিটিশ আমলেই এই বাহিনীর সৃষ্টি। তাদের দায়িত্ব ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা, যাতে ব্রিটিশ রাজ নির্বিঘ্নে শাসনের নামে শোষণ করতে পারে। ওই সুযোগে পুলিশ নিজেও শাসন-শোষণের ব্যাপারে কোনো কার্পণ্য করেনি। পুলিশের লালপাগড়ি দেখলে হৃদ্কম্প বৃদ্ধি পেত না এমন সাহসী মানুষ সেকালে বিরল ছিল বৈকি। লালপাগড়ি এখন নেই, ইউনিফর্ম বদল হয়েছে। সত্য-মিথ্যা জানি না, শুনেছি পুলিশের এবং (র্যাবেরও) ইউনিফর্ম ভাড়া করে নিয়ে ছিনতাই ইত্যাদি ঘটানো হয়ে থাকে।
তবে ইউনিফর্মধারী পুলিশও যে আজকাল ছিনতাইয়ের অভিযোগে আটক হয়েছে এমন খবর তো খবরের কাগজেই পাওয়া যায়। যেমন–এই খবরটা: ‘পুলিশের দুই সদস্য রিমান্ডে। অভিযোগ ৩৫ লাখ টাকা ছিনতাইয়ে অংশগ্রহণ।’ ঘটনা ঢাকাতেই। আরেক খবর ব্যবসায়ী যাচ্ছিলেন টাকা নিয়ে, ব্যাংকে জমা দেবেন। পথে কয়েকজন মিলে তাকে তুলে নিল এক মাইক্রোবাসে, এদের মধ্যে ইউনিফর্ম-পরিহিত ওই দুজন পুলিশও ছিল। আরেকটি খবর; সেটাও ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়ার ব্যাপারেই; তবে বাইরে নয় ভেতরেই।
ব্যাংকের ভেতরে দাঁড়িয়েছেন একজন, ২০ লাখ টাকা জমা দেবেন। ইউনিফর্ম-পরিহিত দুজন পুলিশ তাকে বের করে নিয়ে গেল, মোটরসাইকেলে চড়াল, এবং টাকাগুলো কেড়ে নিয়ে তাকে ফেলে দিল এক নির্জন স্থানে। ব্যাংকে লোক ছিল। ব্যাংকের লোক, ব্যাংকে আসা লোক; কেউ এগিয়ে আসেনি বাধা দিতে। গায়ে ইউনিফর্ম থাকলে নিজের ঘরেও দাপট দেখানো সম্ভব। যেমন নারায়ণগঞ্জে একজন পুলিশ ইন্সপেক্টর দেখিয়েছিল বলে অভিযুক্ত হয়েছেন, এবং তার কারাদণ্ডাদেশ হয়েছিল তিন মাসের। অভিযোগকারী অন্য কেউ নন, পুলিশ সাহেবের স্ত্রী, যিনি নিজে একজন আইনজীবী। অফিসারটি নাকি স্ত্রীকে নিয়মিত চাপ দিতেন বাবার বাড়ি থেকে টাকা এনে দেওয়ার জন্য, ঘুমের মধ্যে বালিশ চেপে ধরে হত্যারও নাকি চেষ্টা করেছেন স্ত্রীকে। এক সময়ে ছিলেন, এখন নেই, সাবেক হয়ে গেছেন, এমন একজন পুলিশ ও সেনাসদস্য ডাকাতিতে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে ধরা পড়েছিল ঢাকার শ্যামপুর এলাকায়।
তবে এটা ঠিক যে, পুলিশের কাজে চাপও কম নয়। আসামি ধরতে গিয়েও বিঘ্ন ঘটে; পথে আসামি ছিনতাইও হয়ে যায়। আর এমন মর্মান্তিক খবরও তো জানতে পেরেছিলাম যে, মাইক্রোবাসে আসামি গ্রেপ্তার অভিযানে বের হয়ে রেললাইনে আটকে পড়ে একসঙ্গে তিনজন পুলিশের মৃত্যু ঘটেছিল।
বাংলাদেশে কে কাকে নিরাপত্তা দেয়? বিশেষ করে যখন কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন দেখা দেয় তখন তো কথাই নেই, পুলিশের জন্য রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। মামলা দিতে হয় অতি দ্রুত; তাতে আসামি করতে হয় জানা-অজানা নানা অপরাধীকে। মৃত, কারাগারে বন্দি, বিদেশে প্রবাসীরাও বাদ পড়েন না। বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেপ্তারের অভিযানেও বের হতে হয়। গ্রেপ্তারের ব্যাপারটা অবশ্য কারও কারও জন্য কখনো কখনো সুবিধাও এনে দেয়। পুলিশের ‘গ্রেপ্তার বাণিজ্য’ যে আগে ছিল না তা নয়, তবে এখন বহু গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। এই বাণিজ্যের প্রসারে অবশ্য বিস্ময়ের কোনো অবকাশ নেই; বাণিজ্যই যে আমাদের অর্থনীতির মূল বৈশিষ্ট্য তাতে এক বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই; সব বাণিজ্য বৃদ্ধি পাবে, আর পুলিশের গ্রেপ্তার-বাণিজ্য পেছনে পড়ে থাকবে, এ তো ভারি অন্যায় আবদার। অন্যদের মতো তারা চাঁদাবাজিও করে থাকেন।
ভালো কথা, পুলিশ যদি গ্রেপ্তার-বাণিজ্য ও চাঁদাবাজি করতে পারে তবে সরকার-সমর্থক ছাত্রনেতারাও বসে থাকবে কেন? গ্রেপ্তার-বাণিজ্য না হোক, তারা নিয়োগ-বাণিজ্য করে থাকে। আর ছিনতাই তো চলছেই। ঢাকার চকবাজারের এক ব্যবসায়ী টাকা নিয়ে যাচ্ছিলেন ব্যাংকে, জমা দেবেন বলে। চার-পাঁচজন যুবক তাকে ঘিরে ফেলল, ‘ব্যাটা তুই ফ্যাসিবাদের দোসর,’ বলে আর কোনো কথা নেই টেনেহিঁচড়ে রিকশায় তুলে তাকে একটি নির্মাণাধীন ভবনে নিয়ে গিয়ে টাকাগুলো কেড়ে নিল। সাধে কী আর একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র সংগঠনের সভাপতি বলেছেন, লাগলে কোটি টাকা দেবেন, তবুও কমিটি তার চাই।
লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
