গ্রাহকসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ঢাকার বাইরের পাঁচটি তরঙ্গ পর্যবেক্ষণকেন্দ্রকে বহুমুখী সেবাকেন্দ্রে রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। এসব কেন্দ্র থেকে আবেদন ও নথি গ্রহণ, টেলিযোগাযোগ সেবার মানসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ এবং ক্ষুদ্র ও নতুন উদ্যোক্তাদের সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সেবা সম্প্রসারণের এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কেন্দ্রগুলোর অধিকাংশ তরঙ্গ পর্যবেক্ষণ যন্ত্রপাতি প্রায় তিন বছর ধরে কার্যত অকার্যকর। কয়েকটি কেন্দ্র চলছে পুরনো ভবনে, আর জনবলও সীমিত। নতুন করে কর্মী নিয়োগ ও অতিরিক্ত ব্যয় ছাড়াই বিদ্যমান দুই-তিনজন কর্মী দিয়ে বাড়তি দায়িত্ব পালনের পরিকল্পনা কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এর
সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমোদন এবং কর্মকর্তাদের পদায়ন নিয়ে অসন্তোষ।
বিটিআরসির অধীনে ঢাকাসহ ছয়টি তরঙ্গ পর্যবেক্ষণকেন্দ্র রয়েছে। ঢাকার বাইরের পাঁচটি কেন্দ্র চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, বগুড়া ও রংপুরে। ২০০৭ সালে একটি প্রকল্পের আওতায় স্থাপিত এসব কেন্দ্রের মূল দায়িত্ব তরঙ্গ পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করা।
গত ৮ জুলাই বিটিআরসির তরঙ্গ পর্যবেক্ষণ বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আমিনুল হক ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে কেন্দ্রগুলোকে নতুনভাবে কাজে লাগানোর প্রস্তাব পাঠান। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯ আগস্ট বিভাগটি সম্মতি দেয়। জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ স্বাক্ষরিত চিঠিতে নতুন জনবল নিয়োগ ও অতিরিক্ত ব্যয় না করার শর্ত দেওয়া হয়। পাশাপাশি অনলাইনে সেবা, আবেদন ও নথি গ্রহণের ব্যবস্থা রাখার কথাও বলা হয়।
এ সম্মতিই নতুন কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রশাসনিক অনুমোদন নিশ্চিত করে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। টেলিযোগাযোগ আইন, ২০০১-এর ৮ ধারায় কমিশনের শাখা কার্যালয় স্থাপনে সরকারের পূর্বানুমোদনের বিধান রয়েছে। বিদ্যমান কেন্দ্রের দায়িত্ব সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে এ বিধান কীভাবে প্রযোজ্য হবে, তা প্রস্তাবের ধরন ও সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ঢাকার বাইরের কেন্দ্রগুলোর অধিকাংশ তরঙ্গ পর্যবেক্ষণ যন্ত্রপাতি প্রায় তিন বছর ধরে কার্যত অকার্যকর। কয়েকটি কেন্দ্র পুরনো বিটিসিএল ভবনের কক্ষে পরিচালিত হচ্ছে। প্রায় দুই বছর আগে বগুড়া কেন্দ্রের ছাদের পলেস্তারা খসে এক কর্মকর্তা আহত হন বলেও সূত্র জানিয়েছে।
জনবল নিয়েও সংশয় রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, কেন্দ্রগুলোর কর্মীদের বড় অংশ ঢাকার কার্যালয়ের ডিজিটাল নথি ও দাপ্তরিক কাজ সামলান। অথচ নতুন দায়িত্বে আবেদন গ্রহণ, উদ্যোক্তাদের সহায়তা ও মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য প্রশিক্ষণ, কারিগরি দক্ষতা, যাতায়াত ও লজিস্টিক সহায়তা প্রয়োজন। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সেবার মান যাচাইয়ে কারিগরি ও অকারিগরি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে দল গঠন করা হলেও প্রতিটি কেন্দ্রে দুই-তিনজন কর্মী দিয়ে একই ধরনের কাজ কতটা কার্যকরভাবে করা যাবে, তা নিয়ে সংশয় আছে।
এদিকে বিটিআরসির কর্মকর্তাদের পদায়ন নিয়েও অসন্তোষের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টদের একাংশ। তাদের অভিযোগ, নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ তুলে গত মার্চে হাইকোর্টে রিট করার পর উপপরিচালক পর্যায়ের দুই কর্মকর্তাকে ঢাকার বাইরে পদায়ন করা হয়েছিল। পরে আদালতের নির্দেশে তা স্থগিত হয়। কর্মকর্তাদের একাংশের আশঙ্কা, নতুন সেবাকেন্দ্রের উদ্যোগ ঢাকার বাইরে পদায়নের কাঠামো তৈরিতে ব্যবহৃত হতে পারে। তাদের বক্তব্য, ঢাকার বাইরে পদায়নে আপত্তি নয়; বরং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, জনবল, দায়িত্বের স্পষ্টতা ও অনুমোদন নিশ্চিত না করে নতুন দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়াই উদ্বেগের বিষয়।
সেবাকেন্দ্র চালুর উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ে সেবা পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে তার আগে যন্ত্রপাতি সচল করা, ভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, জনবলের সক্ষমতা যাচাই এবং প্রশাসনিক অনুমোদন স্পষ্ট করা জরুরি।
এ বিষয়ে জানতে বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারীর সঙ্গে মুঠোফোনে বার্তা পাঠিয়ে যোগাযোগ করা হলে তার প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
