কালবেলা · আন্তর্জাতিক
সৌদি-ইয়েমেন সংঘাতে সামরিকভাবে জড়ানোর পথে মিশর, নেপথ্যে কী?
২০/১০/২০২৬

ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলা থেকে সৌদি আরবকে রক্ষায় সামরিক সহায়তা দেওয়ার অনুমতি নিতে যাচ্ছে মিশর। এ বিষয়ে আগামী সপ্তাহে দেশটির পার্লামেন্টে ভোট হওয়ার কথা রয়েছে। সৌদি আরব সহায়তা চাইলে মিশরীয় সশস্ত্র বাহিনীকে দেশটির প্রতিরক্ষায় অংশ নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে কি না, তা ভোটে নির্ধারিত হবে।
এর মধ্য দিয়ে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ছড়িয়ে পড়া আঞ্চলিক সংঘাতে আরব বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ মিশরের সরাসরি সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা বাড়ছে।
শনিবার এক ভাষণে মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি পার্লামেন্টের অনুমোদন চান। তিনি বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের ভাইদের মিশর কখনো ভুলবে না। সৌদি আরবের নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তাদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত কায়রো।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে মিশরের অবস্থান কী?
ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে উপসাগরীয় মিত্রদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছে মিশর। তবে এত দিন সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়ার বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি দেশটি। সিসির সাম্প্রতিক বক্তব্যকে সেই অবস্থান থেকে সরে আসার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত মে মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতে মিশরের রাফাল যুদ্ধবিমান থাকার বিষয়টি আমিরাতের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে আসে। তবে সিসির ওই সফর নিয়ে মিশরের সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে যুদ্ধবিমান মোতায়েনের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি।
গত আগস্টে সৌদি আরব তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি করলেও মিশর তাতে যোগ দেয়নি। তবে দেশটি জানিয়েছিল, চুক্তিতে যোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে।
সৌদি আরবের তেল অবকাঠামোসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হুতিদের হামলা বাড়ার পর মিশরের অবস্থানে পরিবর্তনের আভাস দেখা যায়। গত মাসে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মিশর সফর করেন। এ সময় দুই দেশের দীর্ঘ উপকূলসংলগ্ন লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি আলোচনায় আসে।
মিশরের স্বার্থ কোথায়?
মিশরের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এসব দেশে কর্মরত মিশরীয় প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম উৎস। একই সঙ্গে এই অর্থের ওপর নির্ভর করে মিশরের বহু পরিবারের জীবিকা। খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কে পৌঁছানোয় এসব আয়ের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
২০১৩ সালে সেনাবাহিনী মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতা প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলো সিসি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সহযোগী। এসব দেশ মিশরকে কয়েক হাজার কোটি ডলারের সহায়তা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আমানত ও বিনিয়োগ দিয়েছে।
সিসি তার ভাষণে বলেন, ওই কঠিন সময়ে উপসাগরীয় দেশগুলো মিশরের পাশে দাঁড়িয়েছিল—এ কথা তারা কখনো ভুলতে পারে না।
মিশরের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের ৫৩০ কোটি ডলারের একটি আমানতের মেয়াদ চলতি মাসে শেষ হওয়ার কথা। এর সঙ্গে ২৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার সুদও পরিশোধের বিষয় রয়েছে।
নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ
বিশ্লেষকদের মতে, ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা উদ্বেগও মিশরকে আরও সক্রিয় অবস্থান নিতে উৎসাহিত করছে। জুলাইয়ে ভূমধ্যসাগরীয় বন্দরনগরী দামিয়েত্তায় দুটি গ্যাসবাহী জাহাজে ড্রোন হামলার ঘটনা দেখিয়েছে, আঞ্চলিক সংঘাত থেকে মিশরের পক্ষে পুরোপুরি দূরে থাকা কঠিন।
রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক এইচ এ হেলিয়ার বলেন, মিশর বুঝতে পারছে, অনির্দিষ্টকাল এ সংঘাতের বাইরে থাকা সম্ভব নয়। তার মতে, দেশটির অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত উদ্বেগ পরস্পরের সঙ্গে জড়িত।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় সৌদি আরবের তেল পরিবহনের জন্য লোহিত সাগরের গুরুত্ব বেড়েছে। অন্যদিকে, সুয়েজ খাল দিয়ে জাহাজ চলাচল থেকে মিশর প্রতিবছর কয়েকশ কোটি ডলার আয় করে। ফলে লোহিত সাগরের নৌপথ নিরাপদ রাখা দুই দেশেরই স্বার্থের সঙ্গে জড়িত।
মিশরের রাজনৈতিক গবেষক ও সাংবাদিক শরিফ আরেফ বলেন, সৌদি আরবের নিরাপত্তা মিশরের জাতীয় নিরাপত্তারও একটি অংশ।
মিশরের সামরিক সক্ষমতা কতটা?
আরব বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সামরিক বাহিনী রয়েছে মিশরের। দেশটির সক্রিয় সেনাসদস্যের সংখ্যা কয়েক লাখ। বিমান, স্থল ও নৌবাহিনীতেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য সামরিক সরঞ্জাম। মিশরের বিমানবাহিনীতে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এফ-১৬, ফ্রান্সের রাফাল এবং রাশিয়ার মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে মিশর প্রতিবছর প্রায় ১৩০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা পায়। এ অর্থ দিয়ে মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম কেনার খরচ মেটানো হয়। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কায়রোর ‘সহযোগিতামূলক ভূমিকার’ কথা উল্লেখ করে এ বছর সহায়তার একটি অংশে মানবাধিকারসংক্রান্ত শর্তও শিথিল করেছে ওয়াশিংটন।
২০১১ সালে প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের পতনের পর মিশরের সেনাবাহিনী সিনাই উপদ্বীপে ইসলামপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। ২০১৫ সালে ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটে বিমান ও নৌবাহিনীর সদস্যও পাঠিয়েছিল মিশর। এ ছাড়া লিবিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় ইসলামিক স্টেটের অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায় দেশটি।
তবে ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের পর থেকে মিশর বড় পরিসরে বিদেশে স্থলসেনা মোতায়েন করেনি। ওই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোটের অংশ হিসেবে কুয়েত থেকে ইরাকি বাহিনীকে হটাতে মিশরীয় সেনারা অংশ নিয়েছিল।
এর কয়েক দশক আগে, ১৯৬০-এর দশকে প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের ইয়েমেনে সেনা পাঠিয়েছিলেন। সেই সামরিক অভিযান মিশরের জন্য ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছিল।
কী ধরনের সামরিক সহায়তা দিতে পারে মিশর?
সিসির ভাষণ বা পরবর্তী বক্তব্যে মিশর কী ধরনের বাহিনী পাঠাতে পারে, তা স্পষ্ট করা হয়নি। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইয়েমেনের ভেতরে মিশরীয় স্থলসেনা পাঠানোর সম্ভাবনা কম।
অবসরপ্রাপ্ত মিশরীয় সামরিক কর্মকর্তা ও আরব ফাউন্ডেশন ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের প্রধান সামির রাগেবের মতে, সম্ভাব্য সহায়তার মধ্যে আকাশ প্রতিরক্ষা ও নৌবাহিনীর ভূমিকা থাকতে পারে। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মোকাবিলায় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং যুদ্ধবিমান ব্যবহার করা যেতে পারে। পাশাপাশি জাহাজের নিরাপত্তা, জলদস্যুতা মোকাবিলা ও সৌদি উপকূল সুরক্ষায় নৌবাহিনী সহায়তা দিতে পারে।
তবে কিংস কলেজ লন্ডনের নিরাপত্তা-বিষয়ক শিক্ষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ মনে করেন, আরেকটি বড় প্রচলিত সামরিক বাহিনী যুক্ত হলেই হুতিদের মোকাবিলা সহজ হবে না। ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, ছড়িয়ে থাকা বাহিনী ও ভৌগোলিক অবস্থান কাজে লাগিয়ে হুতিরা তুলনামূলক কম সামরিক শক্তি নিয়েও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
তার মতে, শুধু বিমান হামলা চালিয়ে হুতিদের হুমকি দূর করা সম্ভব নয়। তবে মিশর সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে, লোহিত সাগরে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে এবং হামলার চাপ ভাগ করে নিতে সহায়তা করতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স
মূল প্রতিবেদনে যান ↗