খুলনায় ভারতীয় ভিসা অফিস ও ইন্ডিয়ান ভিসা অ্যাপ্লিকেশন সেন্টারের (আইভিএসি) সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি পরিচয় দিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে মিঠুন মণ্ডল ও অপু নামের দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে। ভারতীয় হাইকমিশনারের ব্যক্তিগত সচিব (পিএস) পরিচয় ব্যবহার করে ভিসা করিয়ে দেওয়ার আশ্বাসে তারা লাখ লাখ টাকা নিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। এ ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন বহু পরিবার।
অভিযোগের ঘটনায় একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর অভিযুক্ত ব্যক্তিদের তৎপরতা বেড়েছে বলেও দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে, প্রতারণার শিকার ব্যক্তিরা টাকা লেনদেনের তথ্যসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের দাবি, নথিপত্র গুছিয়ে অভিযোগ দায়ের করতে কিছুটা সময় লাগছে।
ফরম পূরণ থেকে ভিসার আশ্বাস, বিভিন্ন ধাপে টাকা আদায়ের অভিযোগ
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রথমে ভারতীয় ভিসার আবেদন করে দেওয়ার কথা বলে ফরম পূরণের জন্য এক হাজার থেকে তিন হাজার টাকা নেওয়া হতো। পরে আবেদনপত্রে দেওয়া মোবাইল নম্বর ও ঠিকানা ব্যবহার করে আবেদনকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হতো।
এ সময় নিজেদের ভারতীয় হাইকমিশন বা ভিসা অফিসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি পরিচয় দিয়ে আবেদনপত্রে সমস্যা রয়েছে বলে জানানো হতো। সমস্যা সমাধান ও ভিসার আবেদন এগিয়ে নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিটি পাসপোর্টের বিপরীতে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক ভুক্তভোগী।
রত্না মল্লিক, বাসন্তী পাঁশারী ও নমিতা হালদারসহ কয়েকজন এ ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেছেন। তাদের ভাষ্য, ভিসা পাওয়ার আশায় টাকা দিলেও পরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় ও কার্যক্রম নিয়ে তাদের সন্দেহ তৈরি হয়।
ভুক্তভোগীদের কেউ কেউ প্রতারণার মোট অঙ্ক কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক হিসাব বা তদন্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ রয়েছে, খুলনার বয়রা ও সোনাডাঙ্গা এলাকায় ভারতীয় ভিসাসংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা দেওয়ার বিজ্ঞাপনসংবলিত ব্যানার টাঙিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করতেন মিঠুন মণ্ডল। এসব বিজ্ঞাপনে মেডিকেল, ট্যুরিস্ট, এন্ট্রি, বিজনেস ও স্টুডেন্ট ভিসার আবেদন, পাসপোর্ট তৈরি ও নবায়ন, বিমান ও ভারতীয় ট্রেনের টিকিট এবং চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্টের মতো সেবা দেওয়ার কথা উল্লেখ ছিল।
ভুক্তভোগীদের দাবি, খুলনার কয়রা এলাকার বাসিন্দা মিঠুন মণ্ডল দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় ভিসা অফিসের সামনে অবস্থান করে বিভিন্ন এলাকার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। ভিসা করিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তিনি টাকা নিতেন বলে অভিযোগ তাদের।
অভিযোগের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে সাংবাদিকদের ভয়ভীতি দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের দাবি, মিঠুন মণ্ডল স্থানীয় কয়েকজনকে ব্যবহার করে তাঁদের হুমকি দেওয়ার চেষ্টা করেন। পরে তাদের সঙ্গে সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া অভিযুক্ত ব্যক্তির পক্ষে অবস্থান নিয়ে কিছু অনলাইন মাধ্যমে সংবাদ প্রচার বন্ধ করে দেওয়ার কথা বলে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ভুক্তভোগীরা জানান, তারা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, টাকা লেনদেনের তথ্য ও অন্যান্য প্রমাণ সংগ্রহ করছেন। এসব নথি প্রস্তুত করতে কিছুটা সময় লাগছে। প্রস্তুতি শেষ হলে তারা আইনগত ব্যবস্থা নেবেন।
বয়রা এলাকার বাসিন্দা আবু বকর বলেন, মিঠুন ও অপু দীর্ঘদিন ধরে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছে বলে আমরা জানি। বিষয়টি তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
ভুক্তভোগীরা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত, অভিযুক্তদের পরিচয় যাচাই, আর্থিক লেনদেন অনুসন্ধান এবং প্রতারণায় জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) উত্তর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. তাজুল ইসলাম বলেন, অভিযোগ পেলে পুলিশ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
এদিকে, ভারতীয় ভিসা অফিসের এক কর্মকর্তা জানান, দালাল বা প্রতারকদের টাকা দিয়ে ভিসা পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ভিসা অফিসের সামনে একটি চক্র মানুষকে প্রতারণা করছে বলে তারা শুনেছেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে অপু নামের ওই ব্যক্তির বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি নিজেকে ঢাকায় ভারতীয় ভিসা ও ইমিগ্রেশন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দেন। তবে তার বক্তব্যের বিস্তারিত পাওয়া যায়নি।
