জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ধানের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে সারাদেশে বাজারে চালসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। সরু চাল কেজিপ্রতি ৭০ থেকে ৭৫ টাকা বিক্রি হচ্ছে। ২৫ কেজির এক বস্তা সরু চাল বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৬৫০ টাকায়। নাজিরশাইল চাল মানভেদে কেজিপ্রতি ৬৫ থেকে ৯৫ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। মাঝারি চাল (পাইজাম, ব্রি-২৮ ও ব্রি-২৯) কেজিপ্রতি ৫৮ থেকে ৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মোটা চাল কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ফলে সাধারণ ক্রেতাদের এখন আগের তুলনায় বেশি অর্থ খরচ করে প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য কিনতে হচ্ছে। জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার প্রভাব সরাসরি পড়েছে বাজারের উপর। সব মিলিয়ে গত এক সপ্তাহে ঢাকাসহ দেশের বেশিরভাগ জেলায় চালের বাজার অস্থির হয়ে পড়েছে। সুযোগ বুঝে দাম বাড়ানোর কৌশল সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। বাজারে এমন অস্থিরতায় জীবনযাত্রার ব্যয়ে আগে থেকেই হিমশিম খাওয়া ভোক্তাদের ওপর চাপ কেবল বেড়েই চলেছে।
রাজধানীর কয়েকটি পাইকারি ও খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সরু চাল কেজিপ্রতি ৭৪-৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগেও এর দাম ছিল ৭২ টাকা। মাঝারি মানের চালের দাম ৫৫-৬২ টাকা থেকে বেড়ে এখন ৫৮-৬৫ টাকা। তবে মোটা চালের দাম বেড়েছে কেজি ৫০-৫৫ টাকার চাল এখন ৫২-৫৬ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। মোটা চালের দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের উপর। বর্তমানে প্রতি কেজি মোটা চাল কিনতে যেয়ে সাধারণ মানুষকে হিমসিম খেতে হচ্ছে। দাম বাড়ার ফলে বর্তমানে গতদিনের বিক্রি চালের বর্তমানে কেজিতে দুই থেকে তিন টাকা বাড়িয়ে বিক্রি করছে বিক্রেতারা।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ি, শান্তিনগর ও কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৬৮ থেকে ৭৬ টাকায়। দেশ অ্যাগ্রো, ডায়মন্ড, মঞ্জুর ও সাগর ব্র্যান্ডের মিনিকেট চালের দাম বর্তমানে ৭৪ থেকে ৭৫ টাকা, যা এক সপ্তাহ আগেও ছিল প্রায় ৭২ টাকা। সপ্তাহ দুয়েক আগেও যেসব মোটা চাল ৪৮ থেকে ৫২ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে বর্তমানে তার দাম হাকা হচ্ছে ৫০ থেকে ৫৪ টাকা।
এদিকে, এমন এক সময়ে চালের দাম বাড়ল, যখন দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, সেপ্টেম্বরে ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ। এটি গত ১২ মাসে দাম বাড়ার গড় হার। রাজধানীর নিমতলীর মেছের বাসিন্দা শামীম হোসেন জানান, এভাবে নিত্যপণ্যের দাম বারবার বাড়ায় বড়ই বিপাকে পড়েছি। বাজারের দাম বাড়ছে কিন্তু বেতন সেই আগের যায়গাতেই থমকে আছে। তার অভিযোগ, এমন কোনো মাস নেই, যখন কোনো না কোনো জিনিসের দাম বাড়ছে না। জীবনযাত্রার এমন উচ্চ ব্যয়ের মধ্যে চালের দাম বাড়ায় আমাদের উপর চাপ আরো বেড়েছে।
এদিকে বর্তমান বাজার চিত্রের বিপরীতে সরকারি তথ্য। তাদের কথা বাজার স্বাভাবিক আছে দাম বাড়ার অভিযোগ বস্তুনিষ্ঠ নয়। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য বলছে, গত এক সপ্তাহে কোনো ধরনের চালেরই দাম বাড়েনি। উল্টো সরু চালের দাম কেজি প্রতি ১ দশমিক ২৭ শতাংশ কমেছে। এই তথ্য সাধারণ মানুষের সঙ্গে নির্মম রসিকতা বলেই মনে করছেন ক্রেতা। যদিও গত এক মাসের ব্যবধানে মাঝারি মানের চালের দাম কেজি প্রতি ২ দশমিক ৫০ শতাংশ বেড়েছে বলে টিসিবি স্বীকার করেছে।
টিসিবির বাজারতথ্য শাখার সহকারী পরিচালক শতদল মণ্ডল গণমাধ্যমকে বলেন, এ পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী আমাদের হিসাব সঠিক বলেই মনে হচ্ছে। তবে গণমাধ্যমে বিষয়টি জানাজানি হবার পরে আমরা গরমিল খতিয়ে দেখব। তিনি বলেন, আমাদের বাজার জরিপ শুধু ঢাকায় সীমিত। এর মধ্যে আছে মিরপুর, মোহাম্মদপুর, মালিবাগ, রামপুরা, মহাখালী ও পশ্চিম আগারগাঁও। তার ভাষ্য, টিসিবির তথ্য একটি পণ্যের ক্ষেত্রে মিলেছে, বাকি দুটির ক্ষেত্রে মেলেনি।
যা বলছেন ব্যবসায়ীরা: চাল ব্যবসায়ীরা বাজার ঊর্ধ্বমুখী এমনটি স্বীকার করতে না চাইলেও প্রকারন্তে তারা স্বীকার করেছেন জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর থেকে পরিবহন ভাড়া বেড়ে গেছে। সেই অতিরিক্ত ভাড়া সমন্বয় করতে যেয়ে চালের দাম একটু বাড়তেও পারে। তবে এই দাম বাড়ার পিছনে ব্যবসায়ীদের কোন কারসাজি নেই। তারা সরাসরি জ্বালানির দাম বাড়ায় পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি ও ধানের দাম বৃদ্ধির কথা বলছেন।
বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৫৪ টাকায়, যা দুই সপ্তাহ আগে ছিল ৪৮ থেকে ৫২ টাকা। মাঝারি মানের বিআর-২৮ ও পাইজাম চাল বিক্রি হচ্ছে ৫৮ থেকে ৬৪ টাকায়। মান ও বাজারভেদে এসব চালের দাম ২ থেকে ৩ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বর্তমানে ২৫ কেজির এক বস্তা সরু চাল ১ হাজার ৬৫০ টাকা এবং মাঝারি মানের চাল ১ হাজার ২১২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে এমনটিই জানালেন মোহাম্মদপুর কৃষি মর্কেটের এক ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় এক ট্রাক চাল আনতে আগে ভাড়া লাগত ২০ হাজার টাকা। জ্বালানির দাম বাড়ার পর লাগছে ২৪ হাজার টাকা।
একই বাজারের আরেক পাইকারি ব্যবসায়ী মামুনুর রশিদ বলেন, মৌসুম শেষ হয়ে আসাও দাম বাড়ার একটি কারণ। কয়েকটি জেলায় আমন ধান কাটা মাত্র শুরু হয়েছে। তবে তার মতে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চালের দাম এখনো কিছুটা কম। একই কথা বলেন কারওয়ান বাজারের পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা মহিউদ্দিন সরকার সাইফুল।
তিনিও পরিবহন খরচ ও ধানের দাম বাড়াকেই চালের দাম বাড়ার কারণ বলে উল্লেখ করেন। এদিকে গত সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে জ্বালানির দাম সমন্বয় করা হয়। বিশ্ববাজারে দামের অস্থিরতা ও ভর্তুকি বাড়ার প্রেক্ষাপটে ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়। বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিলমালিক সমিতি কুষ্টিয়া শাখার সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন প্রধান বলেন, গত এক মাসে মিলগেটে চালের দাম কেজিতে ১-২ টাকা বেড়েছে। জাত অনুযায়ী সরু চাল এখন মিলগেটে ৫৫-৬৭ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
মিলগেট মূল্য হলো মিলমালিকরা যে দামে প্রক্রিয়াজাত চাল পাইকারদের কাছে বিক্রি করেন। সরবরাহ ব্যবস্থার পরবর্তী ধাপে পরিবহন ও অন্যান্য ব্যবসায়িক খরচ যুক্ত হওয়ার আগের দাম এটি। জয়নাল আবেদীন এই মূল্যবৃদ্ধির জন্য ডিজেল ও ধানের বাড়তি দামকে দায়ী করেন।
তিনি বলেন, গত এক মাসে ধানের দাম মণপ্রতি ১ হাজার ১২০ টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ২৪০ টাকা হয়েছে।
তার ভাষ্য, বছরের এ সময়ে ধান আরো ভালোভাবে শুকানো হয়। এতে আর্দ্রতা ও ওজন কমে যায়, ফলে কাঁচামালের খরচ বেড়ে যেতে পারে।
নওগাঁ ধান-চাউল আড়তদার ও ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি নিরোদ বরণ সাহা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, গত পাঁচ দিনে সরু চালের পাইকারি দাম মণপ্রতি ৩০-৫০ টাকা বেড়েছে।
স্থানীয় পাইকারি বাজারে এখন সরু চাল মণপ্রতি (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) ২ হাজার ৫০ থেকে ২ হাজার ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে জানান তিনি। ‘মৌসুম শেষ হয়ে আসায় সম্প্রতি বিভিন্ন জাতের চালের দাম কেজিতে ১ থেকে দেড় টাকা বেড়েছে। বছরের এই সময়ে এটা স্বাভাবিক বলে যোগ করেন তিনি।
অনান্য পণ্য :
চালের পাশাপাশি এক সপ্তাহের ব্যবধানে দেশি পেঁয়াজের দাম কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে ৫৫ থেকে ৬০ টাকায় উঠেছে। রসুনের দাম কেজিতে বেড়েছে ২০ থেকে ৩০ টাকা। এ ছাড়া বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ সংকটের অজুহাতে গত দুই সপ্তাহে খোলা সয়াবিনের দাম লিটারে ৫ টাকা বেড়েছে। এদিকে আমিষের বাজারে কোনো স্বস্তি নেই।
প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ২০০ টাকা এবং ফার্মের মুরগির ডিম প্রতি ডজন ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকায় বিক্রি হয়ে উচ্চমূল্যে স্থিতিশীল রয়েছে। প্রতিনিয়ত নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকায় বাজারে আসা সীমিত ও মধ্যম আয়ের সাধারণ ক্রেতাদের নাভিশ্বাস উঠছে।
বিআলো/অর্নব