রাজধানীতে ভবন নির্মাণ ও ভূমি ব্যবহারের অনুমোদন প্রক্রিয়ায় গতি আনতে অনলাইন সেবা চালু করেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। সংস্থাটির আওতাধীন আটটি জোনে প্লানিং পারমিট ও কনস্ট্রাকশন পারমিটের আবেদন এবং অনুমোদন কার্যক্রম শতভাগ অনলাইনে পরিচালিত হচ্ছে। এতে সেবাগ্রহীতাদের দাপ্তরিক দৌড়ঝাঁপ কমার পাশাপাশি অনুমোদন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়ছে বলে জানিয়েছে রাজউক।
রাজউকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাত মাসে প্লানিং পারমিট ও কনস্ট্রাকশন পারমিটের জন্য মোট ১০ হাজার ৯৮৫টি আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে ৭ হাজার ৯৯৩টি আবেদন অনুমোদন পেয়েছে।
এ সময়ে প্লানিং পারমিটের জন্য ৭ হাজার ৫৫টি আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে ৫ হাজার ৩৯৩টি। অন্যদিকে কনস্ট্রাকশন পারমিটের জন্য জমা পড়া ৩ হাজার ৯৩০টি আবেদনের মধ্যে ২ হাজার ৬০০টি অনুমোদন পেয়েছে।
রাজউক জানিয়েছে, প্লানিং পারমিট নিষ্পত্তির জন্য ৩০ দিন সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। আর কনস্ট্রাকশন পারমিটের আবেদন ২৪ দিনের মধ্যে বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন (বিসি) কমিটিতে উপস্থাপনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আবেদনকারীর দাখিল করা কাগজপত্র ও নকশা সঠিক থাকলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কোনো ত্রুটি বা কাগজপত্রের ঘাটতি থাকলে মোবাইল ফোন, ই-মেইল কিংবা অনলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমে আবেদনকারীকে জানানো হচ্ছে।
রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম রিজু বলেন, আগে প্লানিং পারমিট ও কনস্ট্রাকশন পারমিট নিতে সেবাগ্রহীতাদের নানা ধরনের ভোগান্তির শিকার হতে হতো। এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে ঘুরতে হতো এবং বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে যেতে হতো। এ ভোগান্তি কমাতেই অনলাইনে এসব সেবা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, আগে এসব সেবা পেতে দীর্ঘ সময় লাগত। বর্তমানে অনুমোদনের সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়ায় আবেদন নিষ্পত্তির কার্যক্রম আরও সুশৃঙ্খল হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন বিসি কমিটিতে উপস্থাপনের বিষয়টিও মনিটর করা হচ্ছে।
রাজউক চেয়ারম্যান আরও জানান, সংস্থাটির সব ধরনের সেবা ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনার কাজ চলছে। দরপত্র ও এস্টেট কার্যক্রমসহ অন্যান্য সেবাও পর্যায়ক্রমে ডিজিটাইজেশনের পরিকল্পনা রয়েছে। অনলাইন সেবা নিয়ে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।
রাজউকের পরিচালক (উন্নয়ন) প্রকৌশলী নূর-ই-খোদার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্লানিং পারমিটের সবচেয়ে বেশি আবেদন জমা পড়েছে জোন-৪-এ। এ জোনে ১ হাজার ৬৬৩টি আবেদনের মধ্যে ১ হাজার ৬০৯টি অনুমোদন পেয়েছে। জোন-১-এ ১ হাজার ৫৯টি আবেদনের মধ্যে ৮৭৮টি এবং জোন-৩-এ ১ হাজার ৩০টি আবেদনের মধ্যে ৭৪১টি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া জোন-২-এ ৭৯৭টি আবেদনের মধ্যে ৫৮৯টি, জোন-৫-এ ৫০৩টির মধ্যে ৩০৫টি, জোন-৬-এ ১ হাজার ১৭০টির মধ্যে ৭৬৭টি, জোন-৭-এ ৪৮৩টির মধ্যে ২২৮টি এবং জোন-৮-এ ৩৫০টির মধ্যে ২৭৬টি আবেদন অনুমোদন পেয়েছে।
একই সময়ে কনস্ট্রাকশন পারমিটের ক্ষেত্রেও সবচেয়ে বেশি আবেদন জমা পড়েছে জোন-৪-এ। এ জোনে ১ হাজার ১৮৯টি আবেদনের মধ্যে ৭৫৩টি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। জোন-১-এ ৭০৭টি আবেদনের মধ্যে ৪০১টি, জোন-২-এ ৪১৩টির মধ্যে ২২৫টি এবং জোন-৩-এ ৫২৬টির মধ্যে ৩৬৫টি আবেদন অনুমোদন পেয়েছে।
অন্যদিকে জোন-৫-এ ২২৯টি আবেদনের মধ্যে ৯৭টি, জোন-৬-এ ৪৬১টির মধ্যে ৪০৫টি, জোন-৭-এ ১৮৮টির মধ্যে ১৪৮টি এবং জোন-৮-এ ২১৭টির মধ্যে ২০৬টি আবেদন অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
রাজউকের পরিচালক (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ-১) মো. মনিরুল হক বলেন, যেসব আবেদনে ত্রুটি বা কাগজপত্রের ঘাটতি রয়েছে, সেগুলো অনলাইনে আবেদনকারীর কাছে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। আবেদনকারী প্রয়োজনীয় ঘাটতি পূরণ করে পুনরায় দাখিল করলে তা অনলাইনেই অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় যাচ্ছে। প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ না হলে আবেদন বাতিল করা হচ্ছে।
তবে পারমিটের আবেদন ও অনুমোদন অনলাইনে পরিচালিত হলেও পুরো প্রক্রিয়া এখনো ডিজিটাল হয়নি। নকশা অনুমোদনের পর ভবন নির্মাণকালে তদারকির কাজ এখনো ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে করা হচ্ছে। এ ছাড়া নকশা অনুমোদনের আগে অনেক ক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিস, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) এবং কেপিআইডিসিসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার অনাপত্তিপত্র (এনওসি) সংগ্রহ করতে হয়। এসব সংস্থার অনেক ক্ষেত্রেই অনাপত্তিপত্র দেওয়ার প্রক্রিয়া এখনো পুরোপুরি অনলাইনভিত্তিক নয়। ফলে রাজউকের নিজস্ব সেবা ডিজিটাল হলেও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ম্যানুয়াল প্রক্রিয়ার কারণে অনুমোদন পেতে বিলম্ব হতে পারে।
রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী মো. আশরাফুল ইসলাম জানান, ২০১৬ সালে পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে প্লানিং পারমিট ও নকশা অনুমোদন কার্যক্রম ডিজিটাল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিশ্বব্যাংকের ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) অর্থায়নে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে শুধু জোন-৫, অর্থাৎ ধানমন্ডি এলাকায় ভূমি ব্যবহারের কার্যক্রম ডিজিটাল করা হয়। পরে তা রাজউকের আটটি জোনে সম্প্রসারণ করা হয়।
তিনি আরও জানান, ঢাকা আরবান রেজিলিয়েন্স প্রজেক্টের আওতায় ইলেকট্রনিক কনস্ট্রাকশন পারমিটিং সিস্টেম চালু করা হয়েছে, যা বর্তমানে চলমান রয়েছে।
প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, প্লানিং পারমিট ও নকশা অনুমোদন কার্যক্রম আরও গতিশীল ও স্বচ্ছ করতে ওয়ান উইন্ডো সেলের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে একই ব্যবস্থার আওতায় আনা প্রয়োজন। এতে অনুমোদনের সময় কমার পাশাপাশি সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তিও কমবে।
রাজউক কর্মকর্তাদের মতে, আটটি জোনে অনলাইন পারমিট ব্যবস্থা চালুর ফলে আবেদন ও অনুমোদন প্রক্রিয়া আগের তুলনায় সহজ হয়েছে। তবে পূর্ণাঙ্গ ওয়ান-স্টপ সেবা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার অনাপত্তিপত্র প্রদান, নির্মাণকালীন পরিদর্শন ও অন্যান্য সহায়ক কার্যক্রমও ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করা গেলে ভবন নির্মাণের অনুমোদন প্রক্রিয়ায় সময় ও জনভোগান্তি আরও কমানো সম্ভব হবে।
The post রাজউকের সেবায় নতুন গতি, ৭ মাসে প্রায় ১১ হাজার আবেদন appeared first on ভোরের চেতনা.
