পরপর দুই বা ততোধিকবার গর্ভাবস্থার অকাল সমাপ্তি বা পুনরাবৃত্তিমূলক গর্ভপাতের পেছনে নারীর পাশাপাশি পুরুষের শুক্রাণুর নানা জটিলতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সন্তান সম্ভাবনা তৈরি হওয়ার পর তা হারিয়ে ফেলা যেকোনো দম্পতির জীবনের সবচেয়ে করুণ ও বেদনাদায়ক। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষ্য অনুযায়ী, পরপর দুই বা ততোধিক বার গর্ভাবস্থার অকাল সমাপ্তি ঘটলে তাকে রিক্যারেন্ট প্রেগন্যান্সি লস বা পুনরাবৃত্তিমূলক গর্ভপাত হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়।
সামাজিক নানা কুসংস্কার এবং পুরনো ধারণার কারণে যুগের পর যুগ ধরে বারবার গর্ভপাতের দায়ভার শুধুমাত্র নারীদের শারীরিক জটিলতা, জরায়ুর গঠনগত ত্রুটি, থাইরয়েড অথবা হরমোনের তারতম্যের ওপরই একপাক্ষিকভাবে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন
মেডিকেল সায়েন্সের গবেষণাতেও দীর্ঘ সময় ধরে শুধু মাতৃত্বকালীন শারীরিক কারণ অনুসন্ধান করা হতো। এজন্য দেখা যেত, প্রায় ৪০ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে নারীদের শারীরিক যাবতীয় জটিল পরীক্ষা করার পরও গর্ভপাতের কোনো নির্দিষ্ট বা স্পষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া যেত না।
তবে আধুনিক মেডিকেল সায়েন্স ও রিপ্রোডাক্টিভ এন্ডোক্রিনোলজি এই প্রচলিত ধারণাকে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ফেইনবার্গ স্কুল অব মেডিসিনের গবেষক ড্যানা বি ম্যাককুইন, জন ঝাং এবং জ্যারেড সি রবিন্স দ্বারা পরিচালিত একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও মেটা-এনালাইসিসে উঠে এসেছে এক অবিশ্বাস্য সত্য।
আমেরিকান সোসাইটি ফর রিপ্রোডাক্টিভ মেডিসিনের বিখ্যাত সাময়িকী ‘ফার্টিলিটি অ্যান্ড স্টেরিলিটি‘-তে প্রকাশিত এই গবেষণা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, সন্তান বারবার নষ্ট হওয়ার নেপথ্যে নারীদের জরায়ুর পরিবেশ ছাড়াও পুরুষ সঙ্গীর শুক্রাণুর ডিএনএ ফ্র্যাগমেন্টেশন বা ডিএনএ ভাঙন একটি অন্যতম প্রধান ও শক্তিশালী কারণ হতে পারে।
শুক্রাণুর ডিএনএ ফ্র্যাগমেন্টেশন বা ডিএনএ ভাঙন কী?
পুরুষের শুক্রাণু একটি গতিশীল কোষ ছাড়াও, এটি মূলত পিতৃত্বের বংশগতির সমস্ত তথ্য বহনকারী বিশেষ বায়োলজিক্যাল মেসেঞ্জার। সাধারণ অনুবীক্ষণ যন্ত্রে যখন সিমেন অ্যানালাইসিস করা হয়, তখন শুধুমাত্র শুক্রাণুর মোট সংখ্যা, আকৃতি এবং সাঁতারকাটার ক্ষমতা পরিমাপ করা হয়।
একজন পুরুষের বীর্য পরীক্ষায় যদি সচল শুক্রাণুর সংখ্যা ৭০ বা ৮০ মিলিয়নও থাকে, তাহলেও বাহ্যিকভাবে বোঝা সম্ভব নয় তার ভিতরের ক্রোমোজোমগুলো কতটা নিরাপদ রয়েছে। বরঞ্চ আসল রহস্যটি লুকিয়ে থাকে শুক্রাণুর মাথার ভিতরে থাকা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বংশগত উপাদান অর্থাৎ ডিএনএ চেইনের মধ্যে।
সুস্থ ও পরিণত শুক্রাণুর ভিতরে প্রোটামিন নামক এক বিশেষ প্রোটিন স্তরের মাধ্যমে ডিএনএ খুব শক্ত ও সুসংগঠিতভাবে পেঁচিয়ে মোড়ানো থাকে। এই প্রোটামিন গঠন বাইরের ক্ষতিকর কেমিক্যাল ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ঘাটতি থেকে ডিএনএ চেইনকে বর্মের মতো রক্ষা করে।
তবে কোনো কারণে যদি এই সুরক্ষাবলয় ভেঙে যায় এবং ডিএনএ চেইনের সূক্ষ্ম তন্তুতে এক-একক বা দ্বি-একক ভাঙন সৃষ্টি হয়, তবে তাকে উদ্ভিদ ও প্রাণীবিজ্ঞানের ভাষায় ‘স্পার্ম ডিএনএ ফ্র্যাগমেন্টেশন’ বলা হয়।
শুক্রাণুর ডিএনএ ভাঙনের প্রধান কারণসমূহ
পুরুষের শরীরে সুস্থ শুক্রাণু তৈরি হওয়ার প্রাথমিক উপাদান থাকা সত্ত্বেও, কীভাবে অণ্ডকোষ বা প্রজনননালীতে এর ডিএনএ চেইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তা জানা চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য অত্যন্ত জরুরি। গবেষণায় এর নেপথ্যে বেশ কিছু অনুঘটক উঠে এসেছে:
১) অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ও ফ্রি রেডিকেলের আক্রমণ:
অণ্ডকোষ ও প্রজননতন্ত্রে যখন রিয়্যাক্টিভ অক্সিজেন স্পিসিজ বা ক্ষতিকর ফ্রি রেডিকেলের আধিক্য ঘটে, তখন কোষের ভিতরের সাধারণ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সুরক্ষা ভেঙে পড়ে। যার দরুণ বিষাক্ত রাসায়নিক সরাসরি শুক্রাণুর বাইরের মেমব্রেন ভেদ করে ভিতরের ডিএনএ পেঁচকে ক্ষতবিক্ষত করে।
২) ভ্যারিকোসিল রোগ:
অণ্ডকোষের চারপাশের শিরাগুলো অস্বাভাবিক ফুলে রক্ত সঞ্চালন ব্যাহত করলে সেখানে তাপমাত্রা বেড়ে যায়। স্বাভাবিকভাবে শুক্রাণু তৈরির জন্য শরীরের মূল তাপমাত্রার চেয়ে কম তাপমাত্রা প্রয়োজন। অতিরিক্ত উত্তাপ প্রোটামিন ক্ষয় করে ডিএনএকে অত্যন্ত ভঙ্গুর বানিয়ে ফেলে।
৩) ধূমপান, অ্যালকোহল ও আধুনিক খাদ্যাভ্যাস:
বিষাক্ত নিকোটিন ও অ্যালকোহল রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে সরাসরি অণ্ডকোষের কোষে জমা হয়। অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত ফাস্টফুড গ্রহণ এবং ব্যায়ামের অভাব কোষের ভিতরের প্রোটোমিক গঠন নষ্ট করে ফেলে।
৪) পরিবেশগত টক্সিন ও পেশাগত ঝুঁকি:
যেসব পুরুষ অতিরিক্ত তাপে (যেমন মেটাল ইন্ডাস্ট্রি বা বেকারি) কাজ করেন, কিংবা দীর্ঘদিন প্লাস্টিক, ভারী ধাতু, কেমিক্যাল ও কীটনাশকের সংস্পর্শে থাকেন, তাদের শুক্রাণুর ডিএনএ ফ্র্যাগমেন্টেশন ইনডেক্স বহুগুণ বেড়ে যায়।
৫) ল্যাপটপের ক্ষতিকর ব্যবহার:
দীর্ঘ সময় কোলে ল্যাপটপ নিয়ে কাজ করা অথবা প্যান্টের পকেটে অতিরিক্ত গরম হওয়া ফোন রাখা অণ্ডকোষের তাপমাত্রা বাড়িয়ে শুক্রাণুর ডিএনএ গঠন বিকৃত করতে পারে।
একটি সাধারণ ও সুস্থ গর্ভাবস্থায় শুক্রাণু যখন ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করে জাইগোট গঠন করে, তখন ডিম্বাণুর নিজস্ব একটি প্রাকৃতিকভাবে প্রদত্ত মেরামত করার সক্ষমতা সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘ম্যাটারনাল ওসাইট রিপেয়ার মেকানিজম’।
যদি পুরুষ থেকে আসা শুক্রাণুটির ভিতরে অল্প পরিমাণ ডিএনএ ভাঙন থাকে, তবে সুস্থ ও তরুণ ডিম্বাণু তার অভ্যন্তরীণ এনজাইম ব্যবহার করে প্রথম কয়েকটি কোষ বিভাজনের আগেই সেই ভাঙন সফলভাবে জোড়া লাগিয়ে মেরামত করে নিতে পারে। তবে সমস্যা দেখা দেয় তখনই, যখন শুক্রাণুর ডিএনএ ভাঙনের হার ডিম্বাণুর স্বাভাবিক সারণি বা মেরামত ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করে ফেলে।
যখন পিতা থেকে আসা ক্ষতিগ্রস্ত জীনগত তথ্য মেরামত করা অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন কোষ বিভাজনের তৃতীয় বা চতুর্থ দিনে জাইগোটটি হঠাৎ গতি হারিয়ে ফেলে। ভ্রূণটি ব্লাস্টোসিস্ট ধাপে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয় কিংবা জরায়ুর দেয়ালে ইমপ্লান্টেশন হওয়ার পরপরই নিজের অস্তিত্ব হারায়।
কারণ, জরায়ু একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর অঙ্গ। ভ্রূণের মারাত্মক জীনগত অসঙ্গতি টের পাওয়া মাত্রই মাতৃত্বকালীন শরীর প্রাকৃতিক প্রতিরোধব্যবস্থা হিসেবে সেই প্রেগন্যান্সি গ্রহণ বন্ধ করে দেয়। এর ফলেই ঘটে মর্মান্তিক মিসক্যারেজ বা গর্ভপাত।
প্রসঙ্গত অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, যেখানে কোটি কোটি শুক্রাণুর মধ্য থেকে তীব্র প্রতিযোগিতা করে মাত্র একটি শুক্রাণু ডিম্বাণুতে প্রবেশ করার সুযোগ পায়, সেখানে সেই বিজয়ী শুক্রাণুটি ত্রুটিযুক্ত হয় কীভাবে?
আপাতদৃষ্টিতে একে বিজয়ী মনে হলেও, প্রজননবিজ্ঞানের মতে এই প্রতিযোগিতাটি মূলত শুধু গতি এবং সাঁতার কাটার প্রতিযোগিতা। যে শুক্রাণুটির সাঁতার কাটার ক্ষমতা বেশি, সেটি দ্রুত ডিম্বাণুর কাছে পৌঁছে যায়। কিন্তু দ্রুত সাঁতার কাটতে পারা শুক্রাণুটির মাথার ভিতরের ডিএনএ চেইন শতভাগ নিরাপদ রয়েছে কি না, তা শুধুমাত্র গতি দিয়ে বিচার করা সম্ভব নয়।
এজন্য একটি গতিশীল কিন্তু ডিএনএ-ভাঙন থাকা শুক্রাণু ডিম্বাণুকে প্রাথমিক নিষিক্ত করতে পারলেও, পরবর্তীতে জিনগত ত্রুটির কারণে ভ্রূণের বৃদ্ধি থমকে যায়। বারবার গর্ভপাতের সূত্রপাত ঘটে।
বাস্তব চিকিৎসা ক্ষেত্রে অনেক দম্পতি বছরের পর বছর সন্তান ধারণের ব্যর্থতায় মানসিক যন্ত্রণায় ভোগেন শুধুমাত্র সঠিক অনুসন্ধানের অভাবে।
আধুনিক প্রতিরোধ, চিকিৎসা ও আধুনিক আইভিএফ কৌশল
লুকিয়ে থাকা শুক্রাণুর ডিএনএ ভাঙন শনাক্ত হওয়ার পর বর্তমানে চিকিৎসাবিজ্ঞানে চমৎকার কিছু সমাধান ও চিকিৎসাপদ্ধতি রয়েছে:
১) লাইফস্টাইল পরিবর্তন ও হাই- ডোজ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থেরাপি:
গবেষণায় দেখা গেছে, ৩ থেকে ৬ মাস জিংক, সেলেনিয়াম, ভিটামিন সি, ভিটামিন ই এবং কোএনজাইম কিউ-১০ সমৃদ্ধ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট গ্রহণ করলে ফ্র্যাগমেন্টেশন মাত্রা নাটকীয়ভাবে কমে আসে।
২) মাইক্রো-সুরক্ষামূলক সার্জারি:
অণ্ডকোষে ভ্যারিকোসিল ধরা পড়লে মাইক্রোসার্জারির মাধ্যমে আক্রান্ত শিরা বেঁধে দেওয়া হয়। এতে রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক হয় এবং অল্প কয়েক মাসের মধ্যেই শুক্রাণুর সুস্থতা ফিরে আসে।
৩) মাইক্রোফ্লুইডিক স্পার্ম সর্টিং টেকনোলজি:
যেসব দম্পতি আইভিএফ বা আইসিএসআই পদ্ধতির দিকে যাচ্ছেন, তাদের ক্ষেত্রে সাধারণ ল্যাব প্রসেসিংয়ের বদলে মাইক্রোফ্লুইডিক চিপ প্রযুক্তি ব্যবহার করে বীর্য থেকে শতভাগ অক্ষত ডিএনএ সম্পন্ন শুক্রাণু আলাদা করে ডিম্বাণুতে ইনজেক্ট করা সম্ভব।
৪) টেস্টিকুলার স্পার্ম এক্সট্রাকশন:
বীর্যে থাকা শুক্রাণুর ডিএনএ এপিডিডাইমিস নালী অতিক্রম করার সময় যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে সরাসরি অণ্ডকোষ থেকে সূক্ষ্ম নিডেলের মাধ্যমে তাজা শুক্রাণু বের করে এনে সুস্থ ভ্রূণ তৈরি করা যায়।
পরিশেষে, বারবার সন্তান হারানোর মতো হৃদয়বিদারক ঘটনায় শুধু নারীদের ওপর দায় চাপিয়ে দেওয়ার মানসিকতা মেডিকেলসায়েন্স পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে। পুরুষ সঙ্গীর শুক্রাণুর ডিএনএ ভাঙনের মতো অদৃশ্য সূচকগুলো চিহ্নিত করে সময়মতো পদক্ষেপ নিতে পারলে হাজারো দম্পতির অকাল গর্ভপাতের করুণ পরিণতি এড়ানো সম্ভব।
খাদিজা রুমি/অমিয়/
