তিনবার সুযোগ পেয়েছেন, প্রতিবারই ফিরেছেন আরও দৃঢ় হয়ে। আফগান বোলারদের হাতছাড়া করা সুযোগের মূল্য দিয়েছেন ব্যাট হাতে। শেষ পর্যন্ত সেঞ্চুরি, সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৯ হাজার রানের মাইলফলক। আবুধাবিতে লিটন কুমার দাসের দিনটি তাই হয়ে থাকল ব্যক্তিগত অর্জন আর দলীয় সাফল্যের মিশেলে।
ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্ট ও শর্ট থার্ড ম্যানের মাঝ দিয়ে বল সীমানা পার হতেই ব্যাট-হেলমেট উঁচিয়ে ধরলেন লিটন দাস। এরপর হেলমেটে চুমু। এমন উদ্যাপনে যেন প্রকাশ পেল অপেক্ষার অবসানের আনন্দ। আফগানিস্তানের বিপক্ষে তিনবারের চেষ্টায় প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি পেলেন বাংলাদেশের এই উইকেটকিপার ব্যাটার। এটি তার টেস্ট ক্যারিয়ারের সপ্তম শতক।
সেঞ্চুরির মুহূর্তটি যতটা আনন্দের, পরের ঘটনাটি ততটাই আক্ষেপের। মোহাম্মদ সেলিমের বাউন্সারে পুল করতে গিয়ে উইকেটরক্ষক ইকরাম আলী খিলের হাতে ক্যাচ তুলে দেন লিটন। ফলে তিন অঙ্ক ছোঁয়ার পর আর কোনো রান যোগ করা হয়নি তার। ১১৭ বলে ১৪টি চারে ১০২ রান করে সাজঘরে ফেরেন তিনি। সতীর্থ মেহেদী হাসান মিরাজের পিঠ চাপড়ে দেওয়া আর ডাগআউটের করতালিতে বিদায় নেন এই ব্যাটার।
লিটনের বিদায়ের পরই ইনিংস ঘোষণা করেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। ৭ উইকেটে ৩৭২ রান নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংস শেষ করে বাংলাদেশ। প্রথম ইনিংসের লিড যোগ করে আফগানিস্তানের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ৪৭৯ রান।
দিনের শুরুতে অবশ্য লিটনের ইনিংসের ভবিষ্যৎ এতটা উজ্জ্বল মনে হয়নি। ৬ উইকেটে ২২৩ রান নিয়ে চতুর্থ দিনের খেলা শুরু করেছিল বাংলাদেশ। প্রথম সাত ওভারের মধ্যেই দুবার জীবন পান তিনি। কায়েস আহমেদের বলে কাট করতে গিয়ে স্লিপে ক্যাচ তুলেছিলেন ১৪ রানে। কিন্তু শাহিদুল্লাহ কামাল বলটি ধরতে পারেননি। চার ওভার পর একই বোলারের বলে সোজা ড্রাইভে ফিরতি ক্যাচ দিয়েও বেঁচে যান ২৬ রানে। এবার সুযোগ হাতছাড়া করেন কায়েস নিজেই।
দুইবার জীবন পাওয়ার পর ইনিংসের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেন লিটন। কখনো নিখুঁত টাইমিংয়ে, কখনো আক্রমণাত্মক শটে আফগান বোলারদের চাপে রাখেন। তাঁর ব্যাটে রান আসতে থাকে নিয়মিত। অন্য প্রান্তে মিরাজও ছিলেন সাবলীল। দুজনের জুটি বাংলাদেশের সংগ্রহকে নিয়ে যায় বড় উচ্চতায়।
মিরাজও অবশ্য পুরোপুরি বিপদমুক্ত ছিলেন না। জিয়াউর রহমানের বলে স্লগ সুইপ করতে গিয়ে তার ব্যাটে লেগে বল স্লিপে চলে যায়। ফিল্ডার ডাইভ দিয়ে ক্যাচ ধরলেও আম্পায়ার আউট দেননি। পরে রিপ্লেতে দেখা যায়, বলটি লেগেছিল মিরাজের গ্লাভসের ওপরের অংশে।
লাঞ্চ বিরতিতে বাংলাদেশ ৬ উইকেটে ৩৩৭ রান তুলেছিল। লিটনের সংগ্রহ তখন ৮১। সেঞ্চুরি থেকে ১৯ রান দূরে থাকা এই ব্যাটার বিরতির পরও নিজের ছন্দ হারাননি। ১০৫তম ওভারের পঞ্চম বলে কায়েস আহমেদের ডেলিভারি কাট করে চার মেরে পূর্ণ করেন শতক। ১১৫ বলে আসে তার সপ্তম টেস্ট সেঞ্চুরি।
এই ইনিংসের আরেকটি বিশেষত্ব আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৯ হাজার রানের মাইলফলক। বাংলাদেশের পঞ্চম ব্যাটার হিসেবে এই অর্জন ছুঁয়েছেন লিটন। তার আগে এই তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন মুশফিকুর রহিম, তামিম ইকবাল, সাকিব আল হাসান ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। দেশের ক্রিকেটের এই অভিজাত তালিকায় নিজের নাম যুক্ত করে ক্যারিয়ারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় লিখেছেন তিনি।
লিটনের সঙ্গে সপ্তম উইকেটে মিরাজের জুটিটিও ছিল বাংলাদেশের বড় সংগ্রহের অন্যতম ভিত্তি। ২০১ বলে ১৪৯ রান যোগ করেন দুজন। মিরাজ পূর্ণ করেন ক্যারিয়ারের ১১তম টেস্ট ফিফটি। ৯৭ বলে পাঁচটি চারে ৫২ রান করে অপরাজিত থাকেন তিনি। আফগানিস্তানের হয়ে মোহাম্মদ সেলিম, ইয়ামিন আহমাদজাই ও জিয়াউর রহমান নেন দুটি করে উইকেট।
এখন বাংলাদেশের সামনে ম্যাচ জয়ের হাতছানি। তবে লক্ষ্যটা সহজ নয় আফগানিস্তানের জন্যও নয়, বরং তাদের সামনে অপেক্ষা করছে টেস্ট ইতিহাসের অন্যতম কঠিন চ্যালেঞ্জ। চতুর্থ ইনিংসে সর্বোচ্চ ৪১৮ রান তাড়া করে জয়ের রেকর্ড ওয়েস্ট ইন্ডিজের। ২০০৩ সালে অ্যান্টিগায় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তিন উইকেটে জিতে এই কীর্তি গড়েছিল তারা।
চার শতাধিক রান তাড়া করে টেস্ট জয়ের ঘটনা ঘটেছে মাত্র চারবার। সর্বশেষ ২০০৮ সালে চেন্নাইয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের দেওয়া ৪১৪ রানের লক্ষ্য পেরিয়ে ছয় উইকেটে জিতেছিল ভারত। এর আগে ১৯৭৬ সালে পোর্ট অব স্পেনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৪০৪ রান তাড়া করে জেতে ভারত। আর ১৯৪৮ সালে লিডসে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে একই রান তাড়া করে জয় পেয়েছিল অস্ট্রেলিয়া।
আফগানিস্তানের সামনে এবার লক্ষ্য ৪৭৯। ইতিহাসের কঠিন সমীকরণ পেরোতে হলে তাদের প্রয়োজন অসাধারণ ব্যাটিং। তবে শুরুতেই বাংলাদেশ তুলে নিয়েছে তাদের ২ উইকেট। এ রিপোর্ট লেখার সময় তাদের সংগ্রহ ২য় ইনিংসে ২ উইকেট হারিয়ে ৫১ রান। বলাই যায় জয়ের পথে টাইগাররা।
