চতুর্থ শতকে স্কটল্যান্ড ও পিক্টদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্রিটেন শাসন করা রোমান সম্রাট ম্যাগনাস ম্যাক্সিমাস নিজের সৈন্য পরিচালনা করেছিলেন।
তবে ওয়েলসের ফ্রেনি ফাওয়ার পাহাড়ের কাছে তিনি একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছিলেন এমন দাবি দীর্ঘদিন ধরে কেবল লোককাহিনীর অংশ বলেই বিবেচিত হয়ে আসছিল।
অবশেষে সেই মধ্যযুগীয় উপাখ্যান বাস্তবে রূপ নেওয়ার শক্ত ইঙ্গিত মিলেছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান।
ওয়েলসের পেমব্রোকশায়ারে নতুন আবিষ্কৃত এক রোমান দুর্গে পাওয়া গেছে চতুর্থ শতকের কয়েকটি ধাতব মুদ্রা’সহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। আবিষ্কারটি ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের মধ্যে ব্যাপক রোমাঞ্চ তৈরি করেছে।
ওয়েলসের প্রাচীন দুর্গটি আবিষ্কার করেছেন ‘ইউনিভার্সিটি অফ অক্সফোর্ড’-এর অন্যতম শীর্ষ রোমান ইতিহাস বিশেষজ্ঞ ড. মার্ক মেরোনি।
পৌরাণিক কাহিনী, জাদু ও অলৌকিক ঘটনার সংকলন হিসেবে পরিচিত বিখ্যাত মধ্যযুগীয় মহাকাব্য ‘ম্যাবিনোগিয়ন’-এ স্থান পাওয়া ম্যাগনাস ম্যাক্সিমাসের সেই কাহিনীকে বাস্তবের আলোয় নিয়ে আসছে তার পরিচালিত প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজ।
উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে ড. মেরোনি বলেছেন, ম্যাবিনোগিয়নে সম্রাটের অবস্থানের কথা যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, সেই ভৌগোলিক এলাকার কাছে আবিষ্কৃত একমাত্র রোমান সামরিক ঘাঁটি এটাই।
“যদি ম্যাগনাস ম্যাক্সিমাস সত্যিই সেখানে গিয়ে থাকেন তবে সেখানে বিশাল এক সেনাবাহিনী অবস্থান নেওয়ার কথা।
“অঞ্চলটি দুর্গম ও প্রত্যন্ত। অথচ প্রাচীন গল্পটিতে প্রিসেলি পাহাড়ের পূর্বাঞ্চলীয় চূড়ার কথা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, যেখানে ঠিক দুর্গটির সন্ধান পেয়েছি আমরা।
“সুদৃঢ় রোমান সহায়ক দুর্গের উপস্থিতি প্রায় এক হাজার সাতশ বছর ধরে টিকে থাকা ম্যাবিনোগিয়ন কাহিনীর রহস্যের জট খুলতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।”
ওয়েলশ ভাষার বিখ্যাত লোকগাথা ‘ডিলিউশন অফ ম্যাকসেন ওলেডিগ’ বা ‘ম্যাকসেনের স্বপ্ন’-এ মধ্যযুগীয় গল্পকারেরা ক্ষমতার শীর্ষে সম্রাটের উত্থানের চিত্র তুলে ধরতে ওয়েলশ ভাষায় নিজে নাম ব্যবহার করেছিলেন।
সেখানে বর্ণনা করা হয়েছে, সামরিক অভিযানের সময় প্রিসেলি পাহাড়ের সবচেয়ে পূর্বাঞ্চলীয় চূড়া ৩৯৫ মিটার উঁচু ফ্রেনি ফাওয়ারের কাছে সম্রাট নিজের সামরিক ক্যাম্প স্থাপন করেছিলেন।
ফ্রেনি ফাওয়ার চূড়ায় বা এর পাদদেশে কোনো রোমান ক্যাম্প বা দুর্গের অস্তিত্বের প্রত্নতাত্ত্বিক কোনো প্রমাণ মেলেনি।
২০২৪ সালে চূড়াটির কেবল সাড়ে তিন কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রথমবারের মতো এ দুর্গের সন্ধান পান ড. মেরোনি।
স্যাটেলাইট চিত্রে একটি ঝোপঝাড়ে ঘেরা মাঠে স্পষ্ট জ্যামিতিক নকশা দেখে তিনি সেখানে যান ও অনুসন্ধানের শুরুতেই এক রোমান টাইলস তার দৃষ্টি কাড়ে। পরবর্তীতে সেখানে আরও অনেক প্রত্নবস্তু উদ্ধার হয়।
‘ইউনিভার্সিটি অফ অক্সফোর্ড’-এর আর্থিক সহায়তা ও গণ-অর্থায়নের মাধ্যমে নির্ধারিত কয়েকটি খননকাজের মধ্যে প্রথম পর্যায়ের কাজটি সম্প্রতি শেষ হয়েছে, যা স্থানটি সম্পর্কে তার ঐতিহাসিক তত্ত্ব ও গুরুত্বকে নিশ্চিত করেছে।
খননকাজ শুরুর আগে ড. মার্ক মেরোনির ভাই নিক ঠাট্টা করে তাকে বলেছিলেন, ‘ম্যাগনাস ম্যাক্সিমাস’-এর তত্ত্ব সত্য প্রমাণ করতে দুটি মুদ্রা খুঁজে বের করতে।
স্মৃতিচারণ করে ড. মেরোনিব ভাই বলেছেন, “সে কাজ থেকে ফিরে এসে বলল, ‘এই দুটো হলে চলবে?’ আমি তো বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না! চতুর্থ শতকের শেষদিকের দুটি প্রাচীন মুদ্রা খুঁজে পেয়েছে সে।
“এই দুটি মুদ্রা ম্যাবিনোগিয়নে ‘ম্যাকসেন ওলেডিগ’ বা ‘ম্যাগনাস ম্যাক্সিমাস’-এর উপাখ্যানের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে ভেবে সত্যিই রোমাঞ্চ লাগে। গ্রিক সাহিত্যের ওডিসির মতোই ওয়েলশ সংস্কৃতিতে সমান তাৎপর্য বহন করে এই মহাকাব্য।”
ড. মেরোনি রোমান-ব্রিটিশ আমলের অন্যতম শীর্ষ বিশেষজ্ঞ। এর আগে, পেমব্রোকশায়ারের ফোর্ড ও অক্সফোর্ডশায়ারের কাটেসলোতে দুটি রোমান ভিলার অস্তিত্ব আবিষ্কার করেছিলেন তিনি।
পরবর্তীতে ২০২২ সালে প্রিসেলি পাহাড়ের দক্ষিণ ঢাল ধরে এক রোমান সড়কের অস্তিত্ব শনাক্ত করেন ড. মেরোনি, যা ‘ওয়েলসের গভীরে রোমানরা কখনও পা রাখেনি’ এমন পুরনো ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে।
তার এই নতুন গবেষণার তথ্য প্রকাশিত হবে প্রত্নতত্ত্ব, প্রাচীন শিল্প ও ইতিহাস বিষয়ক ত্রৈমাসিক সাময়িকী ‘অ্যান্টিকুয়াস’-এ।
এ ছাড়া তার আসন্ন বই ‘লাইভস অফ দ্য রোমান এম্পেররস: ফ্রম অগাস্টাস টু রোমুলাস অগাস্টুলাস’-এও স্থান পাবেন সম্রাট ম্যাগনাস ম্যাক্সিমাস।
১৮০ মিটার দীর্ঘ ও ১৫০ মিটার বিস্তৃত দুর্গটি পাহাড়ের ঢালে এমনভাবে তৈরি, যেখান থেকে আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা স্পষ্ট দেখা যায়।
দুর্গটিতে অন্তত ৫০০ সেনা অবস্থান করত। আর এই আবিষ্কারের মাধ্যমে ওই অঞ্চলের স্থানীয় সেল্টিক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে রোমান আক্রমণকারীদের ‘শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক ছিল’ বলে চলে আসা পুরনো বিশ্বাসও ভুল প্রমাণিত হল।
ড. মেরোনি বলেছেন, দুর্গটির গঠন ‘চারটি কোণ বাঁকানো তাস বা প্লেয়িং কার্ডের মতো’, যার মাঝ দিয়ে একটি লম্বাকৃতির রাস্তা রয়েছে।
এখন পর্যন্ত দুর্ঘটনাস্থলটি থেকে বিরল এক লোহার স্টাইলাস, অসংখ্য মাটির পাত্রের টুকরা, বিপুল পরিমাণ রোমান টাইলস ও শক্ত মাটির তৈরি মেঝে উদ্ধার হয়েছে, যা রোমান সামরিক ঘাঁটিগুলোর সাধারণ এক বৈশিষ্ট্য।
দুর্গ চত্বরে রোমান ঘোড়ার গাড়ি চলাচলের দাগ বা চাকার চিহ্নও অক্ষত অবস্থায় মিলেছে।
ভূ-পদার্থগত সমীক্ষায় চত্বরের মাঝামাঝি জায়গায় আয়তাকার ভবন ও ঠিক দক্ষিণে আরেকটি অপেক্ষাকৃত বড় ভবনের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
ড. মেরোনি বলেন, “স্থাপত্যের এই বিন্যাস দেখে বোঝা যায়, পূর্বমুখী হয়ে শত্রুর মুখোমুখি থাকা ভবনটি ছিল সামরিক সদর দপ্তর এবং তার পাশের ভবনটি ছিল সেনাপতির বাসভবন।”
