সাইবার পুলিশ ইউনিট কতটা কার্যকর হবে?
আরেফিন তানজীবপ্রকাশ:

অনলাইনে প্রতারণা, হয়রানি, ব্যক্তিগত তথ্য চুরি এবং ভুয়া আইডি ব্যবহার করে মানহানির ঘটনা বাড়ছে। এসব অপরাধে ক্ষতিগ্রস্তরা শুধু আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন না, ভোগছেন মানসিক চাপ, ভয় ও সামাজিক মর্যাদাহানিতেও। ঘরে বসে কাজ করে আয় বা ইউটিউবে লাইক দিয়ে আয়ের প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারকরা শিক্ষার্থী, গৃহিণী ও বেকার তরুণদের লক্ষ্য করছেন। শুরুতে ছোট অঙ্কের বোনাস দিয়ে আস্থা তৈরি করে পরে বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করানো হয়।
সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় সরকার কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব ও সাইবার ল্যাব চালু হয়েছে। ডিএমপির গোয়েন্দা শাখায় একটি সাইবার ল্যাব রয়েছে। সিটিটিসিতে ফরেনসিক ল্যাব চালুর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের জন্য নতুন মডিউল যুক্ত করা হচ্ছে এবং দেশজুড়ে ‘ট্রেনিং অব ট্রেইনার্স’ কোর্স চালু হয়েছে।
অনলাইন প্রতারণা, হ্যাকিং ও ডিজিটাল হয়রানি বাড়ার এই সময়ে পুলিশের নতুন বিশেষায়িত ইউনিট, ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সাইবার অপরাধ দমনে কতটা ভূমিকা রাখবে, তা এখন আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাইবার অপরাধসংক্রান্ত ৩২টি জিআর ও ১৫৯টি সিআরসহ মোট ১৯১টি মামলা হয়েছে। একই সময়ে এ ধরনের অভিযোগে ১০১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ডিএমপির তথ্যে দেখা যায়, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে রাজধানীর রমনা বিভাগে ৮৮টি মামলায় ১৬৩ জন, তেজগাঁও বিভাগে ৫৩টি মামলায় ৪৯ জন এবং মতিঝিল বিভাগে ৩৩টি মামলায় ৪৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
১ অক্টোবর ঢাকায় স্বতন্ত্র ‘সাইবার পুলিশ ইউনিট’ গঠন করা হয়েছে। অনুমোদিত কাঠামো অনুযায়ী ইউনিটে ৪ হাজার ৫৯২ জন পুলিশ সদস্য ও কর্মী থাকবেন। একজন অতিরিক্ত আইজিপির নেতৃত্বে ইউনিটটি পরিচালিত হচ্ছে। বিভাগ, জেলা ও থানা পর্যায়েও সাইবার অপরাধ তদন্তের জন্য পৃথক কার্যক্রম বা ডেস্ক রয়েছে।
সম্প্রতি মিরপুরের পুলিশ স্টাফ কলেজে সাইবার অপরাধের মামলা তদন্ত বিষয়ে ১০ দিনের বিশেষ টিওটি কোর্স পরিচালিত হয়েছে। এতে ৩৩২ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তারা পরে মাঠপর্যায়ের তদন্তকারীদের প্রশিক্ষণ দেবেন।
সাইবার অপরাধ তদন্তে পুলিশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ সদরদপ্তর। নতুন ল্যাব, বিশেষায়িত ইউনিট ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
পুলিশ সদরদপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, নতুন সাইবার পুলিশ ইউনিটের তদন্তে ব্যবহৃত হবে ডিজিটাল ফরেনসিক প্রযুক্তি। মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, হার্ডডিস্ক, মেমোরি কার্ড ও ক্লাউড স্টোরেজ থেকে প্রমাণ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হবে। পাশাপাশি অনলাইন লেনদেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রম, আইপি ঠিকানা, ইমেইল, ভুয়া আইডি এবং সন্দেহভাজন লিংকের উৎস শনাক্তে প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ করা হবে।
সাইবার প্রতারণা, হ্যাকিং, অনলাইন হয়রানি, অর্থপাচার, ভুয়া খবর ছড়ানো এবং ক্রিপ্টোকারেন্সিভিত্তিক অপরাধ তদন্তে বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজন রয়েছে। এ কারণে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, সিস্টেম বিশ্লেষক, আর্থিক তথ্য বিশ্লেষক, নেটওয়ার্ক প্রশাসক, ম্যালওয়্যার বিশ্লেষক, ডার্ক ওয়েব বিশ্লেষক, ক্রিপ্টো বিশ্লেষক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশ্লেষক নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, মামলা নিষ্পত্তির সময় কমাতে পুলিশ কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রথমত, ডিজিটাল প্রমাণ দ্রুত সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা। দ্বিতীয়ত, ফরেনসিক ল্যাবে প্রমাণ পরীক্ষার সময় কমানো। তৃতীয়ত, তদন্তকারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, যাতে তারা প্রযুক্তিগত প্রমাণ সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করতে পারেন। এছাড়া আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে উন্নত প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগও রয়েছে।
সাইবার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু ল্যাব ও জনবল বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না। ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ, দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থাও শক্তিশালী করতে হবে।
সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেটর আরিফ মঈনুদ্দীন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, সাইবার অপরাধে আইনে কী ধরনের শাস্তির বিধান রয়েছে, কোথায় অভিযোগ করতে হবে এবং কীভাবে আইনি সহায়তা পাওয়া যাবে এসব তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে সহজ ভাষায় ব্যাপকভাবে তুলে ধরে সরকারের পক্ষ থেকেও ব্যাপক জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো প্রয়োজন। ব্যক্তি সচেতনতা, সরকারি জনসচেতনতা এবং কার্যকর আইন প্রয়োগ এই তিনটির সমন্বয়েই প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণা মোকাবিলা করা সম্ভব।
তিনি বলেন, সাইবার পুলিশ ইউনিটের কার্যক্রম পুরোদমে চালু হলে অভিযোগ গ্রহণ, প্রমাণ সংগ্রহ, তদন্ত ও গ্রেপ্তার প্রতিটি ধাপে সমন্বয় বাড়ার প্রত্যাশা রয়েছে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে প্রশিক্ষিত জনবল, আধুনিক ল্যাব, দ্রুত তথ্য বিনিময় এবং আইনি প্রক্রিয়ার সঙ্গে প্রযুক্তিগত তদন্তের সফল সমন্বয়ের ওপর।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাইবার অপরাধের শিকার ব্যক্তিরা প্রায়ই লজ্জা বা ভয়ে অভিযোগ করেন না। ফলে অনেক ঘটনা রেকর্ডে আসে না। পুলিশের পাশাপাশি স্কুল, কলেজ, ব্যাংক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়াতে হবে। নারী ও শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তায় আলাদা সহায়তা কেন্দ্রও দরকার।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, আগামী দিনগুলোতে প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ আরও ব্যাপক আকার ধারণ করবে। ভবিষ্যতে রোবোটিক্স ব্যবহার করেও অপরাধ সংঘটিত হতে পারে। তাই এখন থেকেই প্রস্তুতি না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে। সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় পুলিশের উদ্যোগ প্রশংসার যোগ্য।
তিনি বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ তদন্ত করতে হলে শুধু প্রচলিত তদন্ত পদ্ধতি যথেষ্ট নয়। ডিজিটাল ফরেনসিক, এআই, ভয়েস অ্যানালাইসিস, সাইবার ট্র্যাকিং, ডেটা অ্যানালিটিকস এবং প্রযুক্তিগত প্রমাণ সংগ্রহের বিষয়ে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। একইভাবে ডিজিটাল অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনবল তৈরি করতে হবে। দক্ষ জনবল তৈরি, আধুনিক প্রযুক্তি ও ফরেনসিক ল্যাবের সক্ষমতা বাড়ানো, আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা এবং ভুক্তভোগীদের দ্রুত প্রতিকার দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাইবার অপরাধ দমনে পুলিশের নতুন উদ্যোগের ফল কতটা আসবে, তা নির্ভর করবে প্রশিক্ষিত জনবল, আধুনিক প্রযুক্তি, দ্রুত তদন্ত এবং জনসচেতনতার সমন্বয়ের ওপর। পুলিশের সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি নাগরিকদেরও সতর্ক থাকতে হবে। তবেই ডিজিটাল পরিসর নিরাপদ হবে এবং সাইবার অপরাধীরা আইনের আওতায় আসবে।
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…