অরুণাচল প্রদেশের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি)-য় চিনা বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতের পরিস্থিতি বৃহস্পতিবার খোলাখুলি কবুল করেছেন ভারত-তিব্বত সীমান্ত পুলিশের (আইটিবিপি) ডিজি শত্রুজিৎ সিংহ কপূর। শুক্রবার বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জায়সবাল স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, চিনা ফৌজ টহলদারির নির্ধারিত নকশা বদলানোর ফলেই সংঘাতের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে অরুণাচলে। ইতিহাস বলছে, ২০১৭ সালের ডোকলামে এবং ২০২০ সালে পূর্ব লাদাখেও ঠিক এমনটাই করেছিল পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ)।
আইটিবিপি প্রধান জানিয়েছেন, গত জুলাই মাসে তাকসিং (আপার সুবনসিরি জেলার) এলাকায় ভারতীয় বাহিনীকে নিয়মিত টহলদারি পয়েন্টগুলিতে যেতে বাধা দিয়েছিল চিন। সেই থেকেই সংঘাতের সূত্রপাত। তাকসিং সার্কেলের অন্তর্গত আসাফিলা এবং লংজুর টহলদারি পয়েন্ট (পেট্রোলিং পয়েন্ট বা পিপি) এই মুহূর্তে সবচেয়ে সংবেদনশীল বলে ‘ইন্ডিয়া টুডে’র একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এখনও পর্যন্ত কোনও বড় ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা না ঘটলেও দু’পক্ষের টহলদারদের মধ্যে মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা ঘটছে বলে প্রতিবেদনে প্রকাশ।
ঘটনাচক্রে, ২০২০ সালের এপ্রিল মাস থেকে ঠিক একই কৌশলে পূর্ব লাদাখের গোগরা, হট স্প্রিং, ডেপসাং, গলওয়ান এবং প্যাংগং হ্রদের তীরবর্তী ফিঙ্গার এরিয়ায় ভারতীয় সেনার চিরাচরিত টহলদারি রুটে বাধা দিয়েছিল পিএলএ। পূর্বনির্বাধিত রণকৌশল মেনেই শি জিংপিঙের বাহিনী এমনটা করেছিল বলে ২০২২ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিরক্ষা গবেষণাপত্রে দাবি করা হয়। একদলীয় চিনের কমিউনিস্ট শাসকদের এই কৌশলকে ‘সালামি স্লাইসিং’ বলে দাবি করা হয়েছিল গবেষণাপত্রে। ইঞ্চি ইঞ্চি করে জমি দখলের লক্ষ্যেই কারাকোরাম পাস থেকে চুমুর পর্যন্ত বিস্তৃত ৬৫টি পিপি-র মধ্যে ২৬টিতে ভারতীয় বাহিনীর টহলদারি সীমাবদ্ধ হয়েছে বা বন্ধ রয়েছে বলে ওই গবেষণাপত্রে দাবি করা হয়েছিল। গত এক দশকে এলএসি-তে দু’তরফের সেনার হাতাহাতি, পাথর ছোড়াছুড়ি এমনকি লাঠালাঠিও হয়েছে। তাতে অল্পবিস্তর জখম হওয়ার খবরও মিলেছে। কিন্তু গলওয়ানের ঘটনায় স্পষ্ট হয়েছিল, ‘হ্যান্ড টু হ্যান্ড কমব্যাট’কে রক্তক্ষয়ী করে তোলার জন্য চিনা বাহিনীর পূর্বপ্রস্তুতি ছিল। অতীতে অধিকৃত তিব্বতে বৌদ্ধদের বিক্ষোভ বা জিনজিয়াংয়ে উইঘুর মুসলিমদের প্রতিবাদ আন্দোলন দমন করতে পেরেক বসানো লাঠি ব্যবহার করেছে চিন সেনা। ২০২০ সালের ১৫ জুনের রাতে ১৬ বিহার রেজিমেন্টের অফিসার ও জওয়ানদের বিরুদ্ধেও একই অস্ত্র প্রয়োগ করে তারা। যার পরিণামে এক কর্নেল-সহ ২০ জন ভারতীয় সেনা নিহত হয়েছিলেন। ভারতীয় সেনার সময়োচিত প্রতিরোধে রক্ত ঝরেছিল হামলাকারী চিনা শিবিরেও।
১৯৯৬ এবং ২০০৫ সালের ভারত-চিন সীমান্ত চুক্তি অনুযায়ী প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা (এলএসি)-র দু’কিলোমিটারের মধ্যে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার না করার কঠোর নিয়ম (রুলস অফ এনগেজ়মেন্ট) রয়েছে। গলওয়ানে চিনা বাহিনী গুলি না-চালালেও পেরেক বসানো লাঠি আর ধারাল অস্ত্র নিয়ে টহলদার ভারতীয় সেনার উপর পরিকল্পিত হামলা চালিয়েছিল। সে ক্ষেত্রে আত্মরক্ষার প্রয়োজনে প্রথমে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের আগাম অনুমতি থাকলে ক্ষয়ক্ষতি কিছুটা কম হত বলে মনে করছেন সেনা আধিকারিকদের একাংশ। সংঘর্ষের পরিস্থিতিতে প্রত্যাঘাতের দ্রুত অনুমতির জন্য উপযুক্ত বন্দোবস্তের প্রয়োজনীয়তাও সে সময় উঠে এসেছিল বিভিন্ন আলোচনায়। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের একাংশ ভবিষ্যতে ওই ধরনের ঘটনার মোকাবিলায় রণকৌশলগত কিছু পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছিলেন। যা আংশিক ভাবে কার্যকরের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছিল।
গত কয়েক মাসে অরুণাচল সীমান্তে লালফৌজের আগ্রাসী আচরণ অদূর ভবিষ্যতে গলওয়ান-কাণ্ডের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকেই। ইন্ডিয়া টুডে-তে প্রকাশিত প্রতিবেদন জানাচ্ছে, গত কয়েক মাসে একাধিক বার ‘ফ্ল্যাগ মিটিং’, হটলাইন যোগাযোগ, সামরিক আধিকারিক স্তরের বৈঠকে সাময়িক ভাবে উত্তেজনা প্রশমিত হলেও তাকসিং সার্কেলের ‘সংঘাতের ক্ষেত্রগুলি’তে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। এরই পাশাপাশি সমাস্তরাল ভাবে এলএসি-র ওপারে ১৯৫০ সালে দখল করা তিব্বতীয় ভূখণ্ডে দ্রুত সামরিক পরিকাঠামো নির্মাণ করছে চিন। তৈরি হচ্ছে সেনাশিবির, সড়ক, সেতু এমনকি নতুন জনপদও! যা চিনা সেনার দীর্ঘমেয়াদি রণকৌশলেরই অংশ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সামরিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ। আইটিবিপি প্রধানও বৃহস্পতিবার স্বীকার করেছেন, অরুণাচল সীমান্তে সামরিক পরিকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে ভারতের চেয়ে এগিয়ে চিন।
