মৃত্যুর পর প্রিয়জনকে বিদায় জানানোই যেখানে প্রচলিত রীতি, সেখানে ইন্দোনেশিয়ার তানা তোরাজা অঞ্চলে দেখা যায় এক ব্যতিক্রমী ঐতিহ্য। এই অঞ্চলের তোরাজা সম্প্রদায়ের অনেক পরিবারে মৃত্যুর পরও মাসের পর মাস, কখনো বছরের পর বছর মরদেহ বাড়িতে রাখা হয়। পরিবারের সদস্যরা মৃত ব্যক্তিকে অসুস্থ স্বজনের মতো বিবেচনা করেন। প্রতীকীভাবে তাকে খাবার ও পানীয় দেওয়া হয়, পরানো হয় পছন্দের পোশাক, এমনকি তার সঙ্গে কথাও বলেন স্বজনেরা। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ইন্দোনেশিয়ার দক্ষিণ সুলাওয়েসি প্রদেশের পার্বত্য অঞ্চল তানা তোরাজা। এখানকার মানুষের কাছে এই প্রথা মৃত স্বজনের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও পারিবারিক দায়িত্ব পালনের প্রকাশ।
কেন দীর্ঘদিন ঘরে রাখা হয় মরদেহ? তোরাজা সংস্কৃতিতে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শুধু শেষকৃত্য নয়; বরং বড় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আয়োজন। এতে দূর-দূরান্ত থেকে আত্মীয়স্বজন ও পরিচিত ব্যক্তিরা অংশ নেন। মৃত ব্যক্তির সামাজিক অবস্থান, পরিবারের সামর্থ্য এবং প্রচলিত রীতির ওপর নির্ভর করে আয়োজনের ব্যাপ্তি নির্ধারিত হয়। এ ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজন করতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। ঐতিহ্য অনুযায়ী, অনেক অনুষ্ঠানে একাধিক মহিষ ও শূকর বলি দেওয়া হয়। অর্থের ব্যবস্থা করা এবং আত্মীয়স্বজনকে একত্র করতে সময় লাগায় কোনো কোনো পরিবার শেষকৃত্যের প্রস্তুতি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত মরদেহ বাড়িতে রাখে। মরদেহ সংরক্ষণে বিশেষ রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। এ সময় পরিবারের সদস্যরা মৃত ব্যক্তিকে ঘরের একজন সদস্য হিসেবেই বিবেচনা করে। খাবার দেওয়া বা কথাবার্তা বলার রীতিগুলো তাদের কাছে প্রিয়জনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার প্রতীক। তোরাজা সম্প্রদায়ের আরেকটি পরিচিত ঐতিহ্য হলো ‘মা নেনে’। এই রীতিতে পরিবারের সদস্যরা কয়েক বছর পরপর পূর্বপুরুষদের সমাধি থেকে মরদেহ বের করে। এরপর সেগুলো পরিষ্কার করে নতুন পোশাক পরানো হয় এবং শ্রদ্ধার সঙ্গে আবার সমাধিতে ফিরিয়ে রাখা হয়।
এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে তারা পূর্বপুরুষদের স্মরণ করে, পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখে। তোরাজাদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় মহিষের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। তাদের ঐতিহ্যগত বিশ্বাস অনুযায়ী, বলি দেওয়া মহিষ মৃত ব্যক্তির আত্মাকে পরকালে পৌঁছাতে সহায়তা করে। বলির সংখ্যা অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য ও মৃত ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে বড় আয়োজনের জন্য কোনো কোনো পরিবারকে দীর্ঘদিন অর্থ সঞ্চয় করতে হয়। সময়ের সঙ্গে তানা তোরাজার জীবনযাত্রা ও ধর্মীয় বিশ্বাসে পরিবর্তন এলেও অনেক পরিবার এখনো পুরোনো রীতিগুলো ধরে রেখেছে। অবশ্য সব পরিবার একইভাবে এসব প্রথা পালন করে না। তোরাজাদের এই ঐতিহ্য মৃত্যু ও শোককে দেখার এক ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে। তাদের কাছে বিদায় শুধু একটি দিনের ঘটনা নয়; বরং প্রিয়জনের স্মৃতি, পারিবারিক দায়িত্ব ও পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা ঘিরে গড়ে ওঠা দীর্ঘ এক প্রক্রিয়া।
