যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ চলার মধ্যে স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট সেবা স্টারলিংকের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত রাখবে ইরান। একইসঙ্গে বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্যবহারে আরো বিধিনিষেধ আরোপেরও ইঙ্গিত দিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। খবর আল জাজিরা।
ইরানে স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট সেবা ব্যবহার এবং ইলন মাস্কের মালিকানাধীন স্টারলিংকের টার্মিনাল বিতরণের জন্য জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
চলতি বছর ইরানের ৯ কোটি মানুষ রাষ্ট্রীয়ভাবে বৈশ্বিক ইন্টারনেট বন্ধের দুটি দীর্ঘ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। জানুয়ারিতে দেশজুড়ে বিক্ষোভের সময় টানা তিন সপ্তাহ ইন্টারনেট বন্ধ ছিল। আর চলমান যুদ্ধ শুরুর দিকে টানা ৮৮ দিন বৈশ্বিক ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ রাখা হয়।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সাইবারস্পেস কাউন্সিলের সচিব মোহাম্মদ আমিন আগামিরি স্টারলিংককে শত্রুদের ‘যুদ্ধের হাতিয়ার’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তিনি বলেন, ‘শত্রুপক্ষ এটি নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণ, গুপ্তচরবৃত্তি এবং তথ্য সংগ্রহের কাজে ব্যবহার করে। স্টারলিংকের স্যাটেলাইট টার্মিনাল বন্ধ করার জন্য আমাদের একাধিক ব্যবস্থা রয়েছে।’
স্টারলিংক বন্ধ করতে কী ধরনের ব্যবস্থা বা যন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি আগামিরি। তবে তিনি বলেন, জানুয়ারির বিক্ষোভের সময় এ ধরনের একটি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল এবং ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ এমন দেশগুলোর সঙ্গে তা ভাগাভাগি করে নিতে কর্তৃপক্ষ প্রস্তুত ছিল।
জাতীয় নিরাপত্তার উদ্বেগ থেকে স্টারলিংক নিষিদ্ধ বা সীমিত করেছে এমন কয়েকটি দেশের মধ্যে ইরানও রয়েছে।
স্টারলিংক ব্যবহার বা এর যন্ত্র নিজেদের কাছে রাখার জন্য ইরানে ছয় মাস থেকে দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। যন্ত্র আমদানি ও বিতরণের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। এর সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা বা গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ যুক্ত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ডও হতে পারে।
আগামিরি ইরানিদের দেশীয় ডিজিটাল প্লাটফর্ম ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছেন। এসব প্লাটফর্মকে কর্তৃপক্ষের ভাষায় ‘ন্যাশনাল ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক’ বা জাতীয় তথ্য নেটওয়ার্কের সহায়তায় পরিচালিত করা হয়।
ইন্টারনেটে স্তরভিত্তিক প্রবেশাধিকারের মডেলকেও সমর্থন করেছেন তিনি। এ ব্যবস্থায় ইন্টারনেট ব্যবহারে বিধিনিষেধের সময় ব্যবসায়ী, গবেষক ও সাংবাদিকদের মতো নির্বাচিত গোষ্ঠীকে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেটে সুরক্ষিত প্রবেশাধিকার দেয়ার কথা বলা হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তেহরানভিত্তিক ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগ খাতের এক বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, স্টারলিংকের সংযোগ বন্ধ করতে ইরানের কর্তৃপক্ষ একাধিক পদ্ধতি ব্যবহার করে।
এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের কনফিগারেশনের একাধিক জ্যামার ব্যবহার করে সেবাটির কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটানো। নতুন যন্ত্র স্থাপনের প্রক্রিয়া ধীর করতে জিপিএসের ভুয়া অবস্থানসংকেতও ব্যবহার করা হয়। এছাড়া স্টারলিংকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইন্টারনেট প্রোটোকল স্থানীয় অ্যাপ ও সেবার সঙ্গে সংযুক্ত হলে সেগুলো শনাক্ত করতে পারে কর্তৃপক্ষ।
স্টারলিংকের টার্মিনাল জব্দ করতেও শারীরিকভাবে অভিযান চালানো হয়। এ জন্য টহল ও ড্রোনের মাধ্যমে তল্লাশি চালানোর পাশাপাশি যেসব স্থানে এসব যন্ত্র বিক্রি হয়, সেখানেও অভিযান চালায় কর্তৃপক্ষ।
গত জুনে ইসরায়েলের রাজনীতিক নাফতালি বেনেট দাবি করেন, ২০২১-২২ সালে প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের সহায়তা করতে ইরানে হাজার হাজার স্টারলিংক যন্ত্র পাচার করেছিল ইসরায়েল।
২০২৩ সাল থেকে আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (আইটিইউ) রেডিও রেগুলেশনস বোর্ডেও বিষয়টি নিয়ে তৎপরতা চালাচ্ছে ইরান। স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কটির নিয়ন্ত্রক সংক্রান্ত নথিপত্রের ক্ষেত্রে ভূমিকা রয়েছে নরওয়ের। যুক্তরাষ্ট্র ও নরওয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করে স্টারলিংকের সম্প্রচার বন্ধ করানোর চেষ্টা করছে তেহরান।
গত ৪ অক্টোবর তেহরানে নিযুক্ত নরওয়ের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অনুমোদনহীন স্টারলিংক কার্যক্রম বন্ধে ব্যবস্থা না নেয়ার অভিযোগে প্রতিবাদ জানাতেই তাকে তলব করা হয়।
সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে সাইবারস্পেস কাউন্সিলের এক নীতিনির্ধারণী বৈঠকে ইরানের উপপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোহাম্মদ হাফেজ হাকামি সতর্ক করে বলেন, স্টারলিংকের ব্যাপক বিস্তার ঘটলে তা ইরানের সাইবারস্পেস নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ‘কফিনে শেষ পেরেক’ হয়ে উঠতে পারে। কারণ, এর মাধ্যমে ইন্টারনেটে অবাধ প্রবেশাধিকার পাওয়া যায়।
তিনি উল্লেখ করেন, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে ২০১৭-১৮ সালের বিক্ষোভের পর সরকার টেলিগ্রাম মেসেজিং অ্যাপ বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু ২০১৯ সালে দেশজুড়ে বিক্ষোভের সময় প্রথমবারের মতো এক সপ্তাহের জন্য ইন্টারনেট বন্ধ করতে হয় কর্তৃপক্ষকে।
এরপর ২০২২-২৩ সালের বিক্ষোভের পর হোয়াটসঅ্যাপ ও ইনস্টাগ্রাম বন্ধ করে দেয়া হয়। আর ২০২৬ সালের জানুয়ারির বিক্ষোভের সময় প্রায় পুরোপুরি ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল।
হাকামি বলেন, ‘এ ধারা অব্যাহত থাকলে পরবর্তী সংকটের সময় আমাদের বিদ্যুৎ বন্ধ করতে হবে। কারণ, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে যাওয়ার নতুন মাধ্যম হিসেবে স্টারলিংক মৌলিকভাবেই আমাদের নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল নয়।’
২০২২ সাল থেকে রাষ্ট্রীয় বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে ইরানের বিক্ষোভের ভিডিও বিদেশে পাঠানোর সুযোগ করে দিয়েছে স্টারলিংক। এরপর থেকে দেশটিতে হাজার হাজার টার্মিনাল পাচার করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তবে সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি।
রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের ঝুঁকি, সীমিত প্রাপ্যতা ও উচ্চ ব্যয়ের কারণে এখনো অধিকাংশ মানুষ স্টারলিংক ব্যবহারের সুযোগ পান না। তাদের ইরানের অভ্যন্তরীণ ইন্টারনেটের ওপর নির্ভর করতে হয়, যেখানে অধিকাংশ আন্তর্জাতিক সেবা ও হাজার হাজার ওয়েবসাইট বন্ধ রাখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও ব্যাংকিং খাতের বিধিনিষেধও ইরানিদের বৈশ্বিক সেবা ব্যবহারের সুযোগ সীমিত করছে।
ইন্টারনেটে প্রবেশের এসব বাধা এড়াতে অধিকাংশ ইরানি ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (ভিপিএন) এবং অন্যান্য পদ্ধতি ব্যবহার করেন। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে তুলনামূলকভাবে অবাধ ইন্টারনেট ব্যবহার করা যায়। তবে এগুলো সংযোগের গতি কমিয়ে দিতে পারে, ব্যয়বহুল হতে পারে কিংবা অনিরাপদ সংযোগের কারণে ব্যবহারকারীর তথ্য ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। রাষ্ট্রীয়ভাবে ইন্টারনেট বন্ধের সময় এসব ব্যবস্থার ব্যবহারও কঠিন হয়ে পড়ে।
গত মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে ইরান সরকারের মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি বলেন, ‘আমাদের তথ্যভান্ডার ও ইন্টারনেটভিত্তিক সেবাগুলোর গুরুত্বের কারণে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থাগুলো কখনো কখনো ইন্টারনেটের গতি কমাতে বাধ্য হয়। আমরা বিষয়টি অস্বীকার করছি না।’
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কিছু প্লাটফর্মের ওপর থেকে বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।
গত মঙ্গলবার রাতে রাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমে সাইবারস্পেসের নীতিমালা ও পরিচালনাব্যবস্থার একটি নথি প্রকাশ করা হয়। এ নথি অনুযায়ী, গুগল প্লে ও হোয়াটসঅ্যাপের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হতে পারে। অন্যদিকে, ইউটিউব ও টেলিগ্রাম চালু করতে হলে ইরানের সঙ্গে আলোচনা করে কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত কিছু শর্ত মেনে নিতে হবে। তবে এসব শর্ত মেনে নিতে আন্তর্জাতিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর সম্মত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম বলে মনে করা হচ্ছে।
