নেত্রকোনার দুর্গাপুরে স্থানীয় সাংবাদিক লুৎফর জামান ওরফে আলিফ ফকির হত্যার রহস্য এখনও উদ্ঘাটিত হয়নি।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কেউ গ্রেপ্তারও হয়নি। কোনো মামলাও হয়নি স্থানীয় থানায়। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে কয়েকটি টিম মাঠে কাজ করছে। প্রাথমিকভাবে কিছু ক্লু পাওয়া গেছে। সেসব ক্লু ধরে কিছু তথ্যের যাচাইবাছাই করা হচ্ছে। এদিকে আলিফের স্বজনরা দাবি করেছেন, মাদক, চোরাচালান- প্রভৃতি নিয়ে রিপোর্ট করার কারণেই তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।
এদিকে শনিবার সকালে নেত্রকোনা আধুনিক সদর হাসপাতালের মর্গে আলিফের মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। পরে দুপুরের দিকে মরদেহটি তার গ্রামের বাড়ি কলমাকান্দা উপজেলার ধীতপুর শুনই গ্রামে নেয়া হয়। ধীতপুর ফকিরবাড়ির ময়দানে বিকেল ৫টার দিকে জানাজার পর স্থানীয় কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। জানাজায় আলিফের স্বজনরা ছাড়াও এলাকার বিপুল মানুষ অংশগ্রহণ করেন। এর আগে বৃহস্পতিবার রাত সোয়া আটটার দিকে দুর্গাপুরের উৎরাইল বাজার সংলগ্ন তেলুঞ্জিয়া এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে প্রাণ হারান আলিফ। প্রকাশ্যে পিস্তল উঁচিয়ে পরপর ছয়টি গুলি করে হত্যা করা হয় তাকে।
আরও পড়ুন
জানা গেছে, কলমাকান্দার ধীতপুর গ্রামের মহব্বত আলীর ছেলে লুৎফর জামান ওরফে আলিফ ফকির (৪৫) প্রথম জীবনে সেনা সদস্য ছিলেন। সেখান থেকে চাকরিচ্যুত (কারণ জানা যায়নি) হওয়ার পর এলাকায় ফিরে সাংবাদিকতায় যুক্ত হন। রূপসী বাংলা নামক একটি আইপি টিভিতে কাজ করতেন তিনি। পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিক্যাল’ নামে একটি ফেজবুক পেজ পরিচালনা করতেন। ওই পেজে দুর্গাপুর-কলমাকান্দার সীমান্ত এলাকার চোরাচালান, মাদক ব্যবসা, বালু লুটপাটসহ বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে লেখালেখি ও ভিডিও প্রচার করতেন।
স্বজনরা জানান, আলিফ প্রায় ছয় বছর আগে দুর্গাপুরের তেলুঞ্জিয়া গ্রামের আদিবাসী (গারো) ফিলিপ রাংসার মেয়ে আনন্দিতা সাংমাকে বিয়ে করেন। তাদের সংসারে চার বছর বয়সী এক মেয়ে ও দেড় বছর বয়সী এক ছেলে রয়েছে। ছেলেমেয়েদের নিয়ে তেলুঞ্জিয়া গ্রামেই বাস করতেন আনন্দিতা। আর আলিফ কখনও গ্রামের বাড়িতে আবার কখনও স্ত্রীর বাসায় থাকতেন।
আরও পড়ুন
বৃহস্পতিবার (ঘটনার দিন) তেলুঞ্জিয়া গ্রামে স্ত্রীর বাসাতেই ছিলেন আলিফ ফকির। রাত পৌণে আটটার দিকে ছেলে আইয়ানকে স্ত্রীর কোলে দিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যান তিনি। এ সময় আনন্দিতাকে বলে যান, ‘বাচ্চাদের খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দাও। একটা নিউজ নিয়ে ব্যস্ত আছি। তাই আসতে একটু দেরি হবে।’ এর কিছুক্ষণ পরই গুলির শব্দ শুনতে পান আনন্দিতা। প্রথমে ভেবেছিলেন, কেউ পটকা ফুটাচ্ছে। কিন্তু প্রতিবেশীরা এসে জানান, তার স্বামীকে গুলি করা হয়েছে। তখন বের হয়ে বাসার ২০ গজ দূরের রাস্তায় তার লাশ পড়ে থাকতে দেখেন।’
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাত আটটার দিকে তেলুঞ্জিয়া বাজারের একটি দোকানে বসে চা পান করেন আলিফ ফকির। চা খেয়ে বিরিশিরি এলাকার উৎরাইল বাজারের দিকে রওনা দেন। কিন্তু ওই দোকানে মোবাইল ফোনটি ভুলে রেখে এসেছিলেন তিনি। তাই মিনিট কয়েক পরে আবার ওই দোকানের দিকে ফিরে যান। দোকান থেকে মোবাইল নিয়ে বের হওয়ার সময় আগে থেকে ওৎ পেতে থাকা দুই যুবকের একজন তাকে লক্ষ্য করে পরপর কয়েকটি গুলি ছুঁড়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। ধারণা করা হচ্ছে, যুবকরা কিছুটা দুরে রাখা মোটরসাইকেলে করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। পরে গুলির শব্দে স্থানীয় লোকজন ও স্বজনরা এসে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
আরও পড়ুন
দোকানের মালিক রবিন রাংসা সাংবাদিকদের বলেন, ‘ঘটনার সময় আমি চায়ের কাপ পরিস্কার করছিলাম। তখন দুই যুবক এসে সিগারেট চায়। এর পরপরই আলিফ ফকিরকে গুলি করে মুহূর্তের মধ্যে পালিয়ে যায়। তাদের একজনের পরনে লুঙ্গি, আরেকজনের পরনে থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট ছিল। আলিফকে তারা খুব কাছে থেকে গুলি করেছে। আমি চার-পাঁচটি গুলির শব্দ শুনেছি। ঘটনা দেখে আমি ভয়ে পেয়ে দোকানে ঢুকে পড়ি।’
আলিফ হত্যার খবর পেয়ে পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলামসহ জেলা পুলিশের উর্ধতন কর্মকর্তারা রাতেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। শনিবার সন্ধ্যায় তিনি দৈনিক খবরের কাগজকে বলেন, আমরা কিছু ক্লু পেয়েছি। সেসব ক্লু ধরে তদন্ত করা হচ্ছে। একাধিক ইউনিট মাঠে কাজ করছে। এছাড়া অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) হাফিজুল ইসলামকে প্রধান করে একটি বিশেষ তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। আমরা দ্রুত সময়ের মধ্যে হত্যাকারীদের চিহ্নিত ও গ্রেপ্তার করার চেষ্টা করছি।‘
পুলিশ সুপার আরও বলেন,‘ ‘আলিফকে পিস্তলের গুলিতে হত্যা করা হয়েছে, এ ব্যাপারে মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে পিস্তলটি কী ধরনের, দেশি না বিদেশী- সেটি পরীক্ষা নিরিক্ষার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। তবে অন্য একটি অসমর্থিত সূত্র জানিয়েছে, উদ্ধার করা গুলির খোসা ও অবিষ্ফোরিত গুলির আলামত দেখে মনে হচ্ছে, আলিফ হত্যায় ৯ এমএম গুলি ব্যবহার করা হয়েছে।
ওদিকে দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ বলেন, ‘ময়নাতদন্ত, জানাজা এবং দাফন সংক্রান্ত কারণে স্বজনরা এখনও মামলা দায়ের করতে পারেনি। তবে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে এবং আসতে বলা হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, রাতের মধ্যেই মামলা দায়ের নিশ্চিত করা যাবে।’ তিনি আরও জানান, দুর্বৃত্তদের চিহ্নিত করতে আশপাশের ভিডিও ফুটেজসহ বিভিন্ন আলামত এবং আলিফের ফেসবুক আইডি, পেজ ইত্যাদি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
এদিকে আলিফের বড়ভাই শহীদ ফকির সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার ছোটভাই অত্যন্ত সাহসী ছিলেন। মাদক, চোরাচালান, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লিখতেন। এ কারণেই তাকে হত্যা করা হয়েছে।’
আলিফের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা বলেন, ‘সন্ত্রাসীরা আমাকে বিধবা এবং দুই সন্তানকে এতিম বানিয়েছে। আমি এই ঘটনার সর্বোচ্চ বিচার চাই। দ্রুত সন্ত্রাসদের গ্রেপ্তার দেকতে চাই।’
আলিফের স্বজনরা জানান, এর আগেও আলিফকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। একাধিকবার তার ওপর হামলা করা হয়েছে। গত বছরের নভেম্বর মাসে দুর্গাপুরের সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় দুর্বৃত্তরা তাকে কুপিয়ে আহত করেছিল।
এসএন/
