Published on
:
3 min read
এই সময়, নয়াদিল্লি ও কলকাতা: মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ‘হাতের পুতুল’ মাত্র, আদতে তাঁকে দিয়ে ‘ভোটচুরি’র কাজটা করাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালরা— গত কয়েকদিন ধরে এই মর্মেই আক্রমণ শাণিয়ে চলেছেন রাহুল গান্ধী–সহ বিরোধী নেতৃত্ব। ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন (সার) আদতে ‘ভোটচুরি’রই অস্ত্র, অভিযোগ তুলে জ্ঞানেশকে ‘রাজসাক্ষী’ হওয়ার ডাকও দিয়েছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা। এ বার প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনারকে ভোটের টিকিট দেওয়ার প্রসঙ্গ তুলে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ময়দানে নামলেন কেন্দ্রীয় শিল্প-বাণিজ্য মন্ত্রী পীযূষ গোয়েল। শুধু তাই নয়, মঙ্গলবার গুজরাট পুরভোটে গান্ধীনগর–সহ তিন পুরসভায় বিজেপির জয়জয়কারকে তুলে ধরে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের তোপ— ‘এটা জনাদেশ, সার–এফেক্ট নয়, আর এটা যত তাড়াতাড়ি কংগ্রেস বুঝবে, ততই ভালো!’
এ দিকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা যখন কংগ্রেসকে জবাব দিতে ব্যস্ত, তখন ‘ব্লুমবার্গ ইকোনমিক ফোরাম’–এর মঞ্চ থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে বলতে শোনা গেল, ‘ভারত গণতন্ত্রের জননী। এই দেশে বিবিধ বিষয় নিয়ে লোকজন প্রকাশ্যে বিতর্ক করতে পারেন, ভিন্নমত নিয়ে স্বচ্ছন্দে চলে আলোচনা। এটাই ভারতের বিশেষত্ব।’ নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিল্লির রাজপথে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) ডাকে দেশের যুবসমাজ এবং বিরোধীরা যখন প্রতিবাদে সরব, আর সেই প্রতিবাদ নিয়ন্ত্রণে দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে বেপরোয়া লাঠিচার্জ, ধরপাকড়ের অভিযোগ উঠছে— তখন দেশে স্বাধীন মত প্রকাশের পর্যাপ্ত পরিসর রয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রীর এই বার্তাকে ইঙ্গিতবাহী বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, এর মধ্যে দিয়ে জেন জ়ি প্রজন্মের উদ্দেশেও নমো একটা বার্তা দিতে চাইলেন।
মঙ্গলবারের অনুষ্ঠানে মোদীর তাৎপর্যপূর্ণ সংযোজন, ‘সরকারের কর্তৃত্ব আছে মানেই নাগরিকদের প্রশাসনের উপরে নির্ভরশীল করে তুলতে হবে, এমনটা নয়। বরং নাগরিকদের ক্ষমতায়নই সরকারের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত, আর ভারত সে পথেই এগোচ্ছে। জ্ঞান, সম্পদ ও ক্ষমতার ব্যবহারটাই গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের হাজার হাজার বছরের ঐতিহ্য আমাদের সেটাই শিখিয়েছে আর আমাদের প্রশাসন এবং কর্মসংস্কৃতিতে সেই ছাপই স্পষ্ট।’ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিরোধী শিবির ও যুুবসমাজের প্রতিবাদ নিয়ে সরাসরি মন্তব্য না–করেও ভারতকে ‘বিতর্কের উন্মুক্ত মঞ্চ’ হিসেবে তুলে ধরে পরোক্ষে নিজের সরকারের উদারমনস্কতাই তুলে ধরেছেন মোদী।
তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যরা অবশ্য সরাসরি আক্রমণ শাণিয়েছেন বিরোধীদের উদ্দেশেই। মঙ্গলবার দিল্লিতে সাংবাদিক বৈঠক করে পীযূষ গোয়েলের তোপ, ‘গত কয়েক দিন ধরে আমরা রাহুল গান্ধীর আচরণ, তাঁর দ্বিমুখী নীতি এবং ছেলেমানুষি দেখছি। কংগ্রেস নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, অথচ নিজেদের অতীতের কার্যকলাপ ভুলে যায়। তারা এক জন নির্বাচন কমিশনারকে ভোটের টিকিট দিয়েছিল, আরও এক জনকে মন্ত্রী বানিয়েছিল এবং দু’জনকে রাজ্যপাল হিসেবেও নিয়োগ করেছিল। এমএস গিল যখন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ছিলেন, তখন তাঁকে ‘পদ্মবিভূষণ’ সম্মান প্রদানও কি ঘুষের সামিল ছিল না? পরে তিনি কংগ্রেসে যোগ দেন এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হন।’
টিএন সেশনের উদাহরণ টেনে পীযূষের দাবি, ১৯৯৯–এ লালকৃষ্ণ আদবানির বিরুদ্ধে নির্বাচনে লড়ার জন্য কংগ্রেস তাঁকে টিকিট দিয়েছিল। সেশন সেই লড়াইয়ে হেরে যান৷ নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নবীন চাওলার নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন পীযূষ। তাঁর দাবি, নবীনের নিয়োগের পেছনে যে সনিয়া গান্ধীর ভূমিকা ছিল, ২০০৫–এর সংবাদ প্রতিবেদন ও টিভি ফুটেজেই স্পষ্ট। পীযূষের প্রশ্ন, ‘কোনও সরকারি পদে না থাকা সত্ত্বেও সনিয়া কী ভাবে এই নিয়োগে নাক গলালেন?’
আরও এক প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার আরকে দ্বিবেদীর প্রসঙ্গও তোলেন পীযূষ। অবসরের মাত্র দু’মাসের মধ্যেই তাঁকে গুজরাটের রাজ্যপাল নিয়োগ করা হয়। সাম্প্রতিক অতীতে কেরলমের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক রত্ন ইউ কেলকারকে মুখ্যমন্ত্রীর প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ নিয়েও কংগ্রেসকে খোঁচা দিয়েছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। তাঁর কটাক্ষ, ‘ভোটে হারলেই কংগ্রেস নির্বাচন কমিশন নিয়ে প্রশ্ন তোলে, অথচ জয়ী হলে নির্বাচনী প্রক্রিয়া সঠিক? কংগ্রেসের এই সুবিধাবাদী রূপ বুঝে গিয়েছেন দেশবাসী।’ কংগ্রেস আর তৃণমূলের পারস্পরিক সম্পর্ককেও বিঁধেছেন পীযূষ। তাঁর দাবি, ‘মাত্র কয়েকমাস আগেও তৃণমূলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে কংগ্রেস৷ রাহুল গান্ধী ও তাঁর সহযোগীরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমালোচনা করেছেন। কংগ্রেসই অভিযোগ তুলেছিল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুর্নীতি পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের পথ প্রশস্ত করেছে। এর পরেও আজ তারা লজ্জার মাথা খেয়ে একজোট হন কী করে!’
একই সুরে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী গিরিরাজ সিংয়ের খোঁচা, ‘রাহুল গান্ধীকে দিল্লিওয়ালা ডান্ডা দিয়ে পেটানো উচিত, উনি শহুরে নকশালদের মতো আচরণ করছেন৷’ পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সাংগঠনিক ইনচার্জ সুনীল বনসলের দাবি, ‘দিল্লিতে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের হার লুকোতে রাজনৈতিক নাটক করছে, অন্য কার্ড খেলার চেষ্টা করছে। তাতে লাভ হবে না।’ বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আবার বিরোধী শিবিরের পাশাপাশি নাম না–করে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)–কেও বিঁধেছেন। নদিয়ার কল্যাণীতে এ দিন শুভেন্দু ফের হুঁশিয়ারি দেন, ‘নজর রাখবেন, রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি যাতে মাথাচাড়া দিয়ে না–উঠতে পারে। আরশোলা, ছারপোকা— এদেরকে একদম পরিষ্কার করে দিতে হবে।’