আফগানিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় বিবিসির বেতার সম্প্রচার বন্ধ করে দিয়েছে তালেবান সরকার। সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বারবার নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত কার্যকর রাখা হবে বলে জানিয়েছে দেশটির তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়। তবে ঠিক কোন নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি কর্তৃপক্ষ।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) এ সিদ্ধান্তের বিষয়টি সামনে আসে। তালেবান সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র খবাইব ঘুফরান জানান, বারবার নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সারা দেশে বিবিসির বেতার কার্যক্রম আপাতত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর সুনির্দিষ্ট বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি।
প্রাসঙ্গিক সংবাদ
এদিকে সম্প্রচার বন্ধের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে বিবিসি কর্তৃপক্ষ। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, আফগানিস্তানের লাখো মানুষ নির্ভরযোগ্য সংবাদ ও প্রয়োজনীয় তথ্যের জন্য প্রতিষ্ঠানটির ওপর নির্ভর করেন। সমস্যা সমাধান এবং সম্প্রচার কার্যক্রম পুনরায় চালুর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।
বেতারের নির্ধারিত তরঙ্গে সম্প্রচার বন্ধ হলেও আফগানিস্তানের শ্রোতাদের কাছে সংবাদ পৌঁছে দেওয়ার অন্যান্য মাধ্যম চালু রাখার কথা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। স্বল্পতরঙ্গ ও মধ্যম তরঙ্গের বেতার, অন্তর্জাল এবং উপগ্রহের মাধ্যমে পশতু, দারি ও ইংরেজি ভাষায় সংবাদ ও অনুষ্ঠান প্রচার অব্যাহত থাকবে বলে জানানো হয়েছে। ফলে প্রচলিত বেতার তরঙ্গের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শোনার সুযোগ সীমিত হলেও বিকল্প মাধ্যমে সংবাদ পাওয়ার সুযোগ থাকছে।
আফগানিস্তানে বিবিসির দীর্ঘদিনের কার্যক্রম রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির আফগান বিভাগ ১৯৮১ সাল থেকে দেশটির মানুষের কাছে সংবাদ ও তথ্য পৌঁছে দিচ্ছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশটির প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর ২০ শতাংশেরও বেশি মানুষ প্রতি সপ্তাহে তাদের সংবাদ ও বিভিন্ন অনুষ্ঠান শুনে থাকেন।
এ ছাড়া মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত মেয়েদের জন্যও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়। ফলে বেতার সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের শ্রোতা এবং বিকল্প তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ সীমিত এমন মানুষের ওপর বিশেষ প্রভাব পড়তে পারে।
২০২১ সালে তালেবান পুনরায় আফগানিস্তানের ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে দেশটির সংবাদমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও বিধিনিষেধ বেড়েছে। সংবাদ প্রচার, অনুষ্ঠান নির্মাণ এবং গণমাধ্যমে নারী-পুরুষের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও নানা সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বিনোদনমূলক বিষয় প্রচারের ওপরও বিধিনিষেধ রয়েছে।
আফগানিস্তানে তথ্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে আরও কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। দেশটির বহু এলাকায় বিদ্যুতের ঘাটতি, অন্তর্জাল ব্যবহারের উচ্চ ব্যয় এবং সাক্ষরতার নিম্ন হার মানুষের কাছে তথ্য পৌঁছানোর পথ কঠিন করে তুলেছে। এ পরিস্থিতিতে বেতার এখনো অনেক মানুষের কাছে সংবাদ ও প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংবাদমাধ্যমের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হলে সাধারণ মানুষের তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে তার সুনির্দিষ্ট কারণ প্রকাশ, স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় অভিযোগ পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য শোনার সুযোগ থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে তালেবান সরকারের পক্ষ থেকে বিবিসির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। ফলে কী ধরনের নিয়ম ভঙ্গের কারণে সম্প্রচার স্থগিত করা হয়েছে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
সব মিলিয়ে, আফগানিস্তানে বিবিসির বেতার সম্প্রচার বন্ধের সিদ্ধান্ত দেশটির গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মানুষের তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিকল্প মাধ্যমে অনুষ্ঠান প্রচার অব্যাহত রাখার ঘোষণা থাকলেও বেতারের প্রচলিত তরঙ্গের ওপর নির্ভরশীল শ্রোতারা কতটা প্রভাবিত হবেন, তা পরিস্থিতির পরবর্তী অগ্রগতির ওপর নির্ভর করছে।
-20261013134421.jpg&w=1440&q=75)