কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সাতটি জাহাজ হামলা কিংবা সমুদ্র-মাইনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) নৌবাহিনী। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা অব্যাহত থাকলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে পাল্টা পদক্ষেপের পরিধি বাড়ানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) ইরানের সামরিক বাহিনীর বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) এ তথ্য জানিয়েছে। তবে সাতটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দাবি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইআরজিসির নৌবাহিনী জানিয়েছে, বুধবার উত্তর পারস্য উপসাগরে তেল স্থানান্তরের কাজে নিয়োজিত চারটি জাহাজ শনাক্ত করার পর সেগুলোতে একযোগে হামলা চালানো হয়। এতে জাহাজগুলোতে আগুন ধরে যায় বলে দাবি করেছে ইরানি বাহিনী। এ ছাড়া হরমুজ প্রণালির পশ্চিমে আরও তিনটি জাহাজ সমুদ্র-মাইনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে তারা।
তবে ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজগুলোর নাম, কোন দেশের পতাকাবাহী ছিল, হতাহতের ঘটনা ঘটেছে কি না এবং ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত মাত্রা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। এপি জানিয়েছে, ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এসব তথ্যের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ সংস্থা ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনসও (ইউকেএমটিও) সর্বশেষ ঘটনাগুলোর বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিবেদন দেয়নি।
আইআরজিসির নৌবাহিনী সতর্ক করে বলেছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোও ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা পদক্ষেপের আওতায় আসতে পারে।
তেহরানের বক্তব্য, প্রণালির নির্দিষ্ট কিছু পথে জাহাজ চলাচল ঘিরে মার্কিন সামরিক তৎপরতা ইরানের নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সব অভিযোগের বিস্তারিত জবাব পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা কমাতে মধ্যস্থতাকারীরা আবারও আলোচনার পথ খোঁজার চেষ্টা করছেন। এদিকে ইরান জানিয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ করা হলে এক সপ্তাহের মধ্যে হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণভাবে খুলে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে তারা। এসব শর্তের মধ্যে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়টিও রয়েছে।
এপি ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। তবে দুই পক্ষের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা অব্যাহত থাকার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। ফলে সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি কূটনৈতিক উদ্যোগও সংকট নিরসনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। যুদ্ধের আগে এ নৌপথ দিয়ে বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হতো। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসসহ অন্যান্য জ্বালানি পরিবহনেও এ পথের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে জ্বালানির দাম, সামুদ্রিক পরিবহন ব্যয় এবং জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর অর্থনীতিতে।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালি ও পারস্য উপসাগর ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনা আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে সাতটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দাবির স্বাধীন যাচাই, জাহাজগুলোর পরিচয় এবং প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির তথ্য এখনো অনিশ্চিত। পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথ নির্ভর করবে সামরিক পদক্ষেপ, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান কূটনৈতিক যোগাযোগের ওপর।
The post হরমুজে সাত জাহাজে হামলার দাবি ইরানের, মার্কিন ঘাঁটিতে বড় আঘাতের হুঁশিয়ারি appeared first on ভোরের চেতনা.
