Published on
:
3 min read
সুদেষ্ণা ঘোষাল, নয়াদিল্লি
দিল্লির কনৌট প্লেসে বিক্ষোভ সমাবেশ হলে উৎসবের মরশুমে তাঁদের কোটি কোটি টাকার ব্যবসা মার খাবে— এই যুক্তিতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)–র ডাকা ‘লেহরা দো তেরঙ্গা’ জমায়েত বন্ধের আর্জি নিয়ে বৃহস্পতিবার দিল্লি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন সেখানকার ব্যবসায়ীরা। হকারদের সমস্যা মেনে নিয়েও প্রতিবাদ নিষিদ্ধ করতে রাজি হয়নি আদালত, আর দিল্লি পুলিশের আশ্বাস ছিল, বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের সব রকম ব্যবস্থা করবে তারা। শুক্রবার সুপ্রিম কোর্টে ব্যবসায়ীদের সংগঠনের তরফে মামলা হলেও অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিতে রাজি হয়নি শীর্ষ আদালতও। তবে শুক্রবার সকাল থেকে কনৌট প্লেসের সেন্ট্রাল পার্ককে ঘিরে দিল্লি পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানের সমাবেশ বুঝিয়ে দিয়েছিল, বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে ফাঁক রাখছে না প্রশাসন।
সেন্ট্রাল পার্কের গেটে টাঙানো দিল্লি পুরনিগমের বিজ্ঞপ্তি— ‘প্রশাসনিক কারণে দু’দিন বন্ধ থাকছে পার্ক’৷ ভিতরে কয়েকশো পুলিশ৷ একটু দূরে উড়ছে ২০৭ ফুট উঁচু জাতীয় পতাকা৷ তবে সেন্ট্রাল পার্ককে ঘিরে থাকা কনৌট প্লেসের ইনার সার্কেলে অধিকাংশ দোকানপাটই ছিল খোলা! চলেছে কেনাকাটাও৷ দিব্যি কাজ করেছে মোবাইল ইন্টারনেটও৷ ট্র্যাফিক চলাচলেও বাধা নেই৷ মাইকে দিল্লি পুলিশের ঘোষণা— ‘গোটা এলাকায় লাগু আছে বিএনএসএসের ১৬৩ ধারা (পূর্বতন সিআরপিসির ১৪৪ ধারা)৷’ অর্থাৎ কোনও জমায়েতের চেষ্টা হলেই প্রতিহত করবে পুলিশ৷ এ দিকে, শুক্রবার বিকেল পাঁচটায় কনৌট প্লেসে জড়ো হওয়ার জন্য সোশ্যাল মিডিয়ায় আহ্বান জানিয়েছিল সিজেপি। তার মধ্যেও আশেপাশের সব পরিষেবা এমন স্বাভাবিক রাখার প্রয়াস দেখে প্রশ্ন জাগছিল, তবে কি কনৌট প্লেসে পৌঁছনোর আগেই সিজেপি এবং বাম যুবনেতৃত্বকে আটকে দেবে পুলিশ? বিকেল গড়াতেই জল্পনা সত্যি হলো৷ সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিত্ দীপকে করোলবাগের বাড়ি থেকে কনৌট প্লেসের উদ্দেশে বেরোতেই তাঁকে আটক করল দিল্লি পুলিশ৷ অন্যদিকে, মান্ডি হাউসের সামনে তেরঙ্গা নিয়ে পদযাত্রা শুরু হওয়া মাত্র আটক হন বাম ছাত্র সংগঠন আইসার নেত্রী নেহা বোরাও। জাতীয় পতাকা হাতে কনৌট প্লেস পর্যন্ত পৌঁছনোর আগেই দিল্লি পুলিশের হাতে আটক হলেন অন্তত ১৫০ জন!
শুক্রবার দুপুরেই অবশ্য নোটিস হাতে দীপকের দিল্লির বাড়িতে পৌঁছে গিয়েছিলেন দিল্লি পুলিশের আধিকারিক। ভাইরাল ভিডিয়োয় (সত্যতা যাচাই করেনি ‘এই সময়’) দেখা গিয়েছে, সোফায় বসে থাকা দীপকের সঙ্গে দিল্লি পুুলিশের সংক্ষিপ্ত কথোপকথন৷ দীপকে সরাসরি পুলিশকে প্রশ্ন করছেন, ‘আমার নামে কী অভিযোগ এনেছেন?’ দীপকের হাতে একটি ‘নোটিস’ ধরিয়ে দিল্লি পুলিশের সংশ্লিষ্ট আধিকারিক জানান, সোশ্যাল মিডিয়ায় দিল্লিবাসীকে যে ভাবে উস্কানি দেওয়া হয়েছে, সেটা বেআইনি। দীপকের পাল্টা বক্তব্য, ‘এগুলো কী ধরনের আজব অভিযোগ? আপনারা যা ইচ্ছে লিখে হাজির করছেন! এ সব না করে আমাকে বরং ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিন!’ এ কথার জবাব না দিয়ে দীপকেকে কর্মসূচি বাতিলের প্রস্তাব দিয়ে বেরিয়ে যান দিল্লি পুলিশের আধিকারিক৷ এর পরেই বিকেলে আটক হন দীপকে। দিল্লি পুলিশকে দীপকে প্রশ্ন করেন, ‘আমাকে ধরছেন কেন? কী আইন ভেঙেছি? আমি তো একা আছি!’ কথায় কান না–দিয়েই তাঁকে জোর করে গাড়িতে তোলেন পুলিশ অফিসাররা। সিজেপি সমর্থকরা রাস্তা আটকালে, তাঁদের জোর করে সরিয়ে বেরিয়ে যায় দিল্লি পুলিশের গাড়ি। পরে সিজেপি সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখে, ‘যুবসমাজের সঙ্গে কেন জঙ্গির মতো ব্যবহার করছেন? আমরাও তো নাগরিক!’ অন্য দিকে, মান্ডি হাউস থেকে কনৌট প্লেসের দিকে এগোনোর আগেই দিল্লি পুলিশের মহিলা আধিকারিকরা আটক করেন আইসা সভাপতি নেহাকে। আইসার অভিযোগ, সাদা পোশাকের পুলিশ এসে নেহাকে কার্যত ‘অপহরণ’ করে নিয়ে গিয়েছে!
তবে, যে ভাবে দিল্লি পুলিশ এবং আধা সামরিক বাহিনীর ২৫,০০০ জওয়ান মিলে জনজীবন স্বাভাবিক রেখে জমায়েত আটকে দিয়েছেন, সেটা নিয়েই চলছে আলোচনা। সূত্রের দাবি, দিল্লি পুলিশের কমিশনার অনুরাগ কুমারের সঙ্গে আলোচনা করে এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ব্লু প্রিন্ট তৈরি করেছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ৷ ১০ অক্টোবর যন্তর মন্তরে সিজেপির প্রতিবাদ কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণের জন্য গোটা দিল্লিকে কার্যত স্তব্ধ করে দেওয়া নিয়ে শীর্ষ আদালতের প্রশ্নের মুখে পড়েছে দিল্লি পুলিশ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। সূত্রের খবর, সেই কারণেই এ দিন স্ট্র্যাটেজি বদল করে দিল্লি পুলিশ৷ তার মাঝেই অবশ্য আম আদমি পার্টি (আপ) এবং আরজেডি পতাকা মিছিল করেছে, তবে তাতে বিশেষ কোনও প্রভাব পড়েনি৷ সন্ধে নামতেই বছরের অন্যান্য দিনের মতো জমজমাট কনৌট প্লেস।
তবে, দীপকে, নেহাদের আটকের কড়া সমালোচনা করেছেন বিরোধী নেতানেত্রীরা। কালীঘাট–তৃণমূলের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক্স হ্যান্ডলে লেখেন, ‘স্বাধীন ভারতে আমাদের যুবসমাজকে শান্তিপূর্ণ ভাবে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের জন্য আটক করা হচ্ছে, এটা অঘোষিত জরুরি অবস্থা ছাড়া আর কী! ফ্যাসিস্ট শাসন চলছে, যারা বিরুদ্ধ স্বর সহ্য করতে পারে না!’ সিজেপির উদ্দেশে মমতার বক্তব্য, ‘দিদি তোমাদের সঙ্গে আছে। কোনও আটক, ক্ষমতার আস্ফালন গণতন্ত্রকে ধ্বংস করতে পারবে না।’ আপ–সুপ্রিমো অরবিন্দ কেজরিওয়ালের প্রশ্ন, ‘নিজেদের দেশে যদি তেরঙ্গা তুলতে না–পারি, তা হলে কি পাকিস্তানে যেতে হবে?’ ডিএমকে প্রধান এমকে স্ট্যালিনও অবিলম্বে দীপকে ও নেহার মুক্তি দাবি করে বলেন, ‘এই বিক্ষুব্ধ স্বরকে যত দমাতে চাইবেন, এটা ততই শক্তিশালী হবে।’
