- চিকিৎসকের ১২০ পদ ফাঁকা
- ৫০ শয্যার হাসপাতালে ভর্তি ১০০ রোগী
- অচল যন্ত্রপাতি ও বিশেষজ্ঞ সংকটে ব্যাহত চিকিৎসাসেবা
৫০ শয্যার হাসপাতালে ভর্তি ৯০ থেকে ১০০ রোগী। তাদের চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন সীমিতসংখ্যক চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী। কোথাও অ্যানাস্থেশিয়া চিকিৎসক থাকলেও নিয়মিত পাওয়া যায় না, কোথাও আল্ট্রাসোনোগ্রাম মেশিন থাকলেও তা পরিচালনার জন্য নেই চিকিৎসক। আবার কোথাও প্যাথলজি বিভাগ চালু থাকলেও প্যাথলজিস্ট নেই, এক্স-রে ও আল্ট্রাসোনোগ্রাম মেশিনও অচল। ফলে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য রোগীদের যেতে হচ্ছে বেসরকারি ক্লিনিক কিংবা জেলা শহরে।
এ চিত্র যশোরের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর। জেলার সাতটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অনুমোদিত ১ হাজার ৩৯৮টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৯৪১ জন। শূন্য রয়েছে ৪৫৭টি পদ, যা মোট অনুমোদিত পদের প্রায় ৩২ দশমিক ৭ শতাংশ। এর মধ্যে চিকিৎসকের ২৮৭টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৬৭ জন। অর্থাৎ চিকিৎসকের ১২০টি পদই শূন্য।
চিকিৎসক ও অন্যান্য জনবলের এই ঘাটতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অতিরিক্ত রোগীর চাপ, প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব এবং যন্ত্রপাতির অকার্যকারিতা। এতে উপজেলা পর্যায়ে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের সংকট।
যশোরের চৌগাছা, ঝিকরগাছা, বাঘারপাড়া, অভয়নগর, শার্শা, মণিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জনবলসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে এ চিত্র পাওয়া গেছে।
শয্যার চেয়ে দ্বিগুণ রোগী, চিকিৎসক সংকট প্রকট
চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫০ শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন ভর্তি থাকেন ৯০ থেকে ১০০ রোগী। তাদের চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। চিকিৎসকের ৪৩টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ২৫ জন বলে প্রাপ্ত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। তবে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. আহসানুল মিজান রুমীর ভাষ্য অনুযায়ী, কর্মরত চিকিৎসকের সংখ্যা ২৪ জন।
তিনি বলেন, হাসপাতালে শুধু সিজারিয়ান অপারেশন করা হয়। কিন্তু অ্যানাস্থেশিয়া চিকিৎসকের পদটি দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। আল্ট্রাসোনোগ্রাম মেশিন থাকলেও তা পরিচালনার জন্য কোনো চিকিৎসক নেই। হাসপাতালের মোট ২২১টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১২৭ জন। শূন্য রয়েছে ৯৪টি পদ।
একই ধরনের সংকট রয়েছে মণিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও। সেখানে ৫০ শয্যার বিপরীতে ভর্তি থাকেন ৯০ থেকে ১০০ রোগী। চিকিৎসকের ৪৭টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ২৬ জন। হাসপাতালের ২৪৭টি অনুমোদিত পদের মধ্যে কর্মরত ১৬৯ জন, শূন্য ৭৮টি।
মণিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ফাইয়াজ আহমেদ ফয়সাল বলেন, অতিরিক্ত রোগীর চাপের কারণে জনবল সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে।
অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা বেশি। ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে ভর্তি থাকেন ৬০ থেকে ৭০ জন রোগী। চিকিৎসকের ৩৮টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ২৪ জন। হাসপাতালের মোট ১৩৮টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ১১০ জন।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মিজানুর রহমান বলেন, রোগীর চাপ বিবেচনায় হাসপাতালে আরও জনবল প্রয়োজন।
অস্ত্রোপচারেও অনিয়মিত সেবা
ঝিকরগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের ৪৬টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ২৯ জন। জনবল সংকটের কারণে এখানে সপ্তাহে মাত্র বৃহস্পতিবার সিজারিয়ান অপারেশন করা হয়।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. আবদুর রশিদ বলেন, জনবল সংকটের মধ্যেই সেবা চালিয়ে যেতে হচ্ছে। অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসক থাকলেও তিনি সপ্তাহে তিন দিন ঝিকরগাছায় দায়িত্ব পালন করেন। একইসঙ্গে চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হয় তাকে। এক্স-রে ও আল্ট্রাসোনোগ্রাম মেশিন থাকলেও আল্ট্রাসোনোগ্রাম করার জন্য সরকারি চিকিৎসক নেই।
ঝিকরগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ২২৮টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৮২ জন। শূন্য রয়েছে ৪৬টি পদ।
বাঘারপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও একই চিত্র। চিকিৎসকের ৪০টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ২০ জন। অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসক থাকলেও তিনি সপ্তাহে মাত্র দুই দিন বাঘারপাড়ায় দায়িত্ব পালন করেন। বাকি চার দিন অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন যশোর সদর হাসপাতালে।
বাঘারপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. অরুপ জ্যোতি ঘোষ বলেন, সীমিত জনবল দিয়ে বাড়তি রোগীর চাপ সামলাতে হচ্ছে। হাসপাতালের ১৫০টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১০৪ জন। শূন্য রয়েছে ৪৬টি পদ।
শার্শা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের ৩০টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৮ জন। সেখানে অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসক থাকলেও তাকে যশোর সদর হাসপাতালে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়। হাসপাতালের ১৯৪টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১০২ জন। শূন্য রয়েছে ৯২টি পদ।
শার্শা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তৌফিক পারভেজ বলেন, চিকিৎসক সংকটের মধ্যেই হাসপাতালের কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে।
যন্ত্রপাতি থাকলেও মিলছে না সেবা
কেশবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের ৪৩টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ২৫ জন। হাসপাতালের ২২০টি অনুমোদিত পদের মধ্যে কর্মরত ১৪৭ জন। শূন্য রয়েছে ৭৩টি পদ।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রেহেনেওয়াজ বলেন, প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতির সীমাবদ্ধতার কারণে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। প্যাথলজি বিভাগ চালু থাকলেও প্যাথলজিস্ট নেই। ফলে বিভিন্ন পরীক্ষার জন্য রোগীদের বাইরের বেসরকারি ক্লিনিকে যেতে হয়। এ ছাড়া হাসপাতালের এক্স-রে ও আল্ট্রাসোনোগ্রাম মেশিন অচল।
চিকিৎসক ও কারিগরি জনবলের অভাবে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এতে উপজেলা পর্যায়ে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা রোগীদের বাড়তি অর্থ ব্যয় করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে।
সংকট নিরসনে চাহিদা পাঠানোর কথা সিভিল সার্জনের
যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে রোগীর চাপ দ্রুত বাড়লেও সে অনুযায়ী চিকিৎসক ও অন্যান্য জনবল বাড়েনি। ফলে শয্যার অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে সীমিত জনবলকে বাড়তি দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, অচল যন্ত্রপাতি মেরামত এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও টেকনিশিয়ান নিয়োগ না হওয়ায় রোগীদের জেলা শহর কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দিকে যেতে হচ্ছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় চাহিদা জানানো হয়েছে। দ্রুত এ সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
রেজওয়ান বাপ্পী/এএমকে
