বাংলার লোকসংস্কৃতি ও দর্শনের ইতিহাসে লালন ফকির এক অনন্য নাম। তার গান শুধু সুর ও কথার সমন্বয় নয়, বরং মানুষের অস্তিত্ব, আত্মপরিচয়, প্রেম, দেহতত্ত্ব ও মানবধর্মের গভীর অনুসন্ধান। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে থেকেও তিনি নিজের উপলব্ধি ও সাধনার মধ্য দিয়ে এমন এক জীবনদর্শন নির্মাণ করেছিলেন, যা আজও মানুষের চিন্তা ও মননকে আলোড়িত করে।
লালনের জন্মসাল ও জন্মস্থান নিয়ে মতভেদ রয়েছে। প্রচলিত অনুযায়ী, তিনি ১৭৭২ সালের দিকে জন্মগ্রহণ করেন। জীবনের একটি পর্যায়ে গুরু সিরাজ সাঁইয়ের সান্নিধ্যে এসে তার সাধনজীবনের বিকাশ ঘটে। কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় তিনি আখড়া প্রতিষ্ঠা করে শিষ্যদের নিয়ে সাধনা ও সংগীতচর্চা করতেন। তার জীবন ও সাধনাকে ঘিরে গড়ে ওঠে বাউল দর্শনের এক সমৃদ্ধ ধারা।
লালনের গানের সবচেয়ে বড় শক্তি মানুষের প্রতি মানুষের বিভেদকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। জাত, ধর্ম, বর্ণ কিংবা সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষকে বিচার করার প্রবণতার বিরুদ্ধে তিনি উচ্চারণ করেছেন সাম্যের বাণী। তার বিখ্যাত গান ‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে’ মানুষের পরিচয় ও জাতপাতের প্রচলিত ধারণাকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। আবার ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ গানে মানবদেহ, জীবন ও আত্মার রহস্য অনুসন্ধানের এক গভীর দার্শনিক অনুভব প্রকাশ পেয়েছে।
লালনের দর্শনে মানুষই ছিল মুখ্য। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের বাহ্যিকতা কিংবা সামাজিক পরিচয়ের চেয়ে মানুষের অন্তর্গত সত্য ও মানবিক গুণাবলিকে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। তার গান সহজ ভাষায় রচিত হলেও এর অন্তর্নিহিত অর্থ বহুমাত্রিক। লোকজ জীবন, আধ্যাত্মিক সাধনা ও মানবতাবাদী চিন্তার সম্মিলনে তার সৃষ্টি বাংলা সংগীতকে দিয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।
১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় লালন ফকিরের জীবনাবসান ঘটে বলে বহুল প্রচলিত। তার মৃত্যুর পরও তার গান ও দর্শনের চর্চা থেমে থাকেনি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার সৃষ্টি দেশ-কাল ও ভাষার সীমানা অতিক্রম করে মানুষের কাছে পৌঁছেছে। গবেষক, সংগীতশিল্পী ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের কাছে তিনি আজও আগ্রহের এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।