এম. হাসানুল হক উজ্জ্বল, লন্ডন : যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষা নিতে ইচ্ছুক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। শিক্ষার্থী ভিসা আবেদন প্রত্যাহারের হার বৃদ্ধি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর নতুন বিধিনিষেধ এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী বিষয়ে কঠোর নজরদারির কারণে অনিশ্চয়তায় পড়ছেন অনেক শিক্ষার্থী। পরিস্থিতি সামাল দিতে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশ থেকে শিক্ষার্থী ভর্তি সীমিত করছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান আবেদনকারীদের দেওয়া ভর্তির প্রস্তাবও প্রত্যাহার করছে।
তবে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য যুক্তরাজ্যে শিক্ষার্থী ভিসা বন্ধের কোনো সাধারণ সরকারি নিষেধাজ্ঞা নেই। দেশটির সরকার ২০২৬ সালের মার্চে আফগানিস্তান, ক্যামেরুন, মিয়ানমার ও সুদানের নাগরিকদের জন্য শিক্ষার্থী ভিসায় বিশেষ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। অন্যদিকে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে মূল সংকট তৈরি হয়েছে ভিসা-সংক্রান্ত ঝুঁকি, আবেদন প্রত্যাখ্যানের হার এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নতুন নিয়োগনীতির কারণে।
১০ অক্টোবর প্রকাশিত ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার নির্ধারিত সীমার মধ্যে রাখতে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভর্তির প্রস্তাব প্রত্যাহার করছে। এতে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও নাইজেরিয়ার মতো দেশ থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদনকারীরা বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের আবেদন প্রত্যাহার বেড়েছে
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে যুক্তরাজ্যে পড়তে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশি আবেদনকারীদের শিক্ষার্থী ভিসা আবেদনের ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে এ হার ছিল ৭ দশমিক ১ শতাংশ।
একই সময়ে পাকিস্তানি আবেদনকারীদের ভিসা আবেদন প্রত্যাহারের হার বেড়ে ৪০ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৩ শতাংশ। নাইজেরিয়ার ক্ষেত্রে এ হার ২২ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছেছে। আগের বছর এই হার ছিল ৪ দশমিক ৫ শতাংশ।
তবে আবেদন প্রত্যাহার এবং ভিসা প্রত্যাখ্যান এক বিষয় নয়। কোনো বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে দেওয়া ভর্তির প্রস্তাব প্রত্যাহার করলে, সেই প্রস্তাবের ভিত্তিতে শুরু হওয়া ভিসা আবেদনও প্রত্যাহার হয়ে যেতে পারে। ফলে আবেদন প্রত্যাহারের পরিসংখ্যান বাড়ার অর্থ এই নয় যে সব আবেদন সরাসরি যুক্তরাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ৫ শতাংশের সীমা
যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভিসা স্পনসর করার অনুমতি বা লাইসেন্স বজায় রাখতে নির্দিষ্ট মানদণ্ড পূরণ করতে হয়। নতুন মূল্যায়নব্যবস্থায় ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার ৫ শতাংশের নিচে রাখার শর্ত দেওয়া হয়েছে। আগে এ সীমা ছিল ১০ শতাংশ।
এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের ভর্তি ও কোর্স সম্পন্ন করার হার নিয়েও কঠোর শর্ত রয়েছে। সরকারের নিয়ম অনুযায়ী, শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার হার কমপক্ষে ৯৫ শতাংশ হতে হবে। ২০২৭ সালের জুন থেকে কোর্স সম্পন্ন করার হারও কমপক্ষে ৯০ শতাংশে উন্নীত করার শর্ত কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের গ্রীষ্মকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য লাল, হলুদ ও সবুজ—এই তিন স্তরের মূল্যায়নব্যবস্থা চালু হতে পারে। যেসব প্রতিষ্ঠান লাল শ্রেণিতে পড়বে, তাদের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী নিয়োগ সীমিত করা হতে পারে। প্রয়োজনীয় উন্নতি না হলে তারা বিদেশি শিক্ষার্থী নিয়োগের অনুমতিও হারাতে পারে।
এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি ভিসা পাওয়ার সম্ভাবনা এবং আবেদনসংক্রান্ত ঝুঁকিও বিবেচনা করছে।
বাংলাদেশিদের জন্য কেন পরিস্থিতি কঠিন
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে যুক্তরাজ্য দীর্ঘদিন ধরে উচ্চশিক্ষার জনপ্রিয় গন্তব্য। আন্তর্জাতিক ডিগ্রির গ্রহণযোগ্যতা, বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার সুযোগ এবং পেশাগত অভিজ্ঞতা অর্জনের সম্ভাবনা তাঁদের আকৃষ্ট করে।
কিন্তু নতুন নিয়মের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিজেদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার নিয়ন্ত্রণে রাখতে হচ্ছে। কোনো প্রতিষ্ঠান মনে করলে যে নির্দিষ্ট দেশ থেকে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী আনার ফলে তাদের সামগ্রিক ভিসা-সংক্রান্ত পরিসংখ্যান খারাপ হতে পারে, তাহলে তারা ওই দেশ থেকে শিক্ষার্থী গ্রহণ কমিয়ে দিতে পারে। ফলে শিক্ষাগত যোগ্যতা, অর্থের উৎস ও পড়াশোনার উদ্দেশ্য যথাযথ থাকা সত্ত্বেও কিছু শিক্ষার্থী বাড়তি অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছেন। ভর্তি-প্রস্তাব পাওয়ার পরও ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে কি না, তা নিয়ে তাঁদের উদ্বেগ বাড়ছে।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে যুক্তরাজ্যে শিক্ষার্থী ভিসা আবেদনের সামগ্রিক প্রত্যাহারের হার ১০ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছেছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে এ হার ছিল ২ দশমিক ৩ শতাংশ।
আর্থিক চাপেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো
যুক্তরাজ্যের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের বড় একটি অংশ আসে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি থেকে। বিদেশি শিক্ষার্থী কমে গেলে এসব প্রতিষ্ঠানের আয় কমতে পারে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী নিয়োগের ওপর বেশি নির্ভরশীল বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আর্থিক চাপের মুখে পড়তে পারে।
ভর্তি কমে যাওয়া, কোর্স বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা এবং কর্মীসংখ্যা কমানোর মতো সমস্যাও তৈরি হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে একদিকে সরকারি অভিবাসনবিধি ও স্পনসর লাইসেন্সের শর্ত পূরণ করতে হচ্ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করে আয় ধরে রাখার চেষ্টা করতে হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের করণীয়
যুক্তরাজ্যে পড়তে ইচ্ছুক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের আবেদন করার আগে কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।
প্রথমত, সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী স্পনসর করার অনুমোদনপ্রাপ্ত কি না এবং বাংলাদেশি আবেদনকারীদের জন্য তাদের বর্তমান ভর্তি নীতি কী, তা সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে নিশ্চিত হতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ভর্তির প্রস্তাব পেলেই ভিসা নিশ্চিত হয়েছে ধরে নেওয়া যাবে না। বৈধ কনফার্মেশন অব অ্যাকসেপ্টেন্স ফর স্টাডিজ (ঈঅঝ), প্রয়োজনীয় আর্থিক নথি, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং অন্যান্য ভিসার শর্ত পূরণ করতে হবে।
তৃতীয়ত, কোনো এজেন্টের আশ্বাসের ভিত্তিতে বড় অঙ্কের অর্থ পরিশোধের আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা উচিত। ভর্তি-প্রস্তাব প্রত্যাহার হলে অর্থ ফেরতের নিয়ম এবং বিকল্প কোর্সে ভর্তির সুযোগ সম্পর্কেও আগে থেকে জেনে নেওয়া প্রয়োজন।
ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে প্রত্যাখ্যানপত্রে উল্লেখ করা কারণ বুঝে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করতে হবে। প্রয়োজনে যোগ্য অভিবাসন পরামর্শকের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
উচ্চশিক্ষার পথ বন্ধ নয়, বাড়ছে অনিশ্চয়তা
যুক্তরাজ্যের বর্তমান নীতিতে নির্দিষ্ট চার দেশের নাগরিকদের জন্য সরাসরি শিক্ষার্থী ভিসা নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিয়োগনীতি ও ভিসা-সংক্রান্ত যাচাই কঠোর হচ্ছে।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তাই সরকারি পর্যায়ে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা নয়; বরং কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নিয়োগ সীমিত করা, ভর্তি-প্রস্তাব প্রত্যাহার এবং ভিসা আবেদনের অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষার সুযোগ এখনো রয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সতর্ক পরিকল্পনা, নির্ভুল নথিপত্র এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
