প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে জনসচেতনতা ও পূর্বপ্রস্তুতির মাধ্যমে এর ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমানো সম্ভব। বাংলাদেশের মতো ভৌগোলিকভাবে দুর্যোগপ্রবণ দেশে এটি আরো গুরুত্বপূর্ণ।
বজ্রপাতের সময় মানুষ ফাঁকা স্থানে থাকলে তার শিকার হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। এদিক থেকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন দেশের কৃষকরা। এমনকি দেশে বজ্রপাতে যত মানুষ মারা যান, তার বড় অংশে রয়েছেন কৃষক। যেমন গত এক বছরে কেবল যশোরে বজ্রপাতে মারা গেছেন ৫১ জন। তাদের মধ্যে ২৮ জনই কৃষক বলে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষি উৎপাদনের প্রধানতম মৌসুম ধরা হয় এপ্রিল, মে ও জুনকে। এ তিন মাস আবার বজ্রপাতের পিক সময়। তাই বজ্রপাতে কৃষকদের হতাহতের ঝুঁকি বেশি থাকে। আবার বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে ক্রমেই বজ্রপাতে হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে।
কিন্তু বজ্রপাত কেবল বাংলাদেশের সমস্যা না, বিশ্বব্যাপী সংঘটিত হওয়া দুর্যোগ এটি। পৃথিবীতে প্রতি মিনিটে প্রায় ৮০ লাখ বজ্রপাত সৃষ্টি হয়। কিন্তু ক্রমেই বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে বজ্রনিরোধক খুঁটি বা পোল স্থাপন ও মানুষকে সচেতন করে বজ্রপাতে হতাহতের সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়েছে। এমনকি কোন সময় কোন এলাকায় বজ্রপাতের ঝুঁকি বেশি তার পূর্বাভাসও প্রযুক্তির মাধ্যমে দেয়া সম্ভব। কিন্তু দেশে এক্ষেত্রে আজও কার্যকর পূর্বাভাস ও পূর্বপ্রস্তুতি ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। তবে শুধু এক্ষেত্রেই নয়, প্রায় সব ধরনের দুর্যোগ মোকাবেলায় দক্ষ ব্যবস্থাপনার বড় ঘাটতি রয়েছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে জনসচেতনতা ও পূর্বপ্রস্তুতির মাধ্যমে এর ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমানো সম্ভব। বাংলাদেশের মতো ভৌগোলিকভাবে দুর্যোগপ্রবণ দেশে এটি আরো গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও। এ দুই কারণে দুর্যোগের ঝুঁকি বেড়ে চলেছে। প্রায় প্রতি বছরই বন্যা, খরা, ঝড়, তাপপ্রবাহ, বজ্রপাতের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এ দেশে আঘাত হানে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে এ দেশের ৬৩ লাখের বেশি মানুষের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বলে জার্মানওয়াচের ‘দ্য ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স ২০২৫’ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বিগত সময়ে দেশ দুর্যোগ মোকাবেলায় অনেক সাফল্য দেখিয়েছে। বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায়। এছাড়া সময়ে সময়ে দুর্যোগ মোকাবেলায় নানা নীতি-কৌশল নেয়া হয়েছে, যেমন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন ২০১২, জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা ২০১০-১৫, দুর্যোগবিষয়ক স্থায়ী আদেশাবলি ২০১৯ ইত্যাদি। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় খাদ্য ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ বিভাগ, ত্রাণ ও পুনর্বাসন অধিদপ্তর, ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কেন্দ্র, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর, বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্ক সংকেত কেন্দ্র এবং বিভিন্ন সামরিক ও বেসামরিক বাহিনী সমন্বিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু বর্তমানে দেশে দুর্যোগের ধরনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। প্রতি বছর অতিবৃষ্টির কারণে ব্যাপক বন্যা হচ্ছে। পাহাড় ধসের ঘটনা বাড়ছে। খরা, অতিরিক্ত তাপপ্রবাহ নতুন সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে। সুতরাং মানুষের আরো নানাভাবে সুরক্ষা প্রয়োজন।
বর্তমানে দুর্যোগের ধরন যেমন পাল্টেছে, তেমনি মোকাবেলায় অত্যাধুনিক প্রযুক্তিরও উদ্ভাবন ঘটেছে। প্রশ্ন হলো দেশ কি আগের নীতি-কৌশলে আটকে থাকবে নাকি ভিন্নভাবে চিন্তা করবে?
২০১৬ সালে বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। প্রায় প্রতি বছর কমবেশি ৩০০ জন বজ্রপাতে মারা যাচ্ছে, যার অধিকাংশই কৃষক। কিন্তু আজও এ নিয়ে জনসচেতনতা বা প্রস্তুতিমূলক কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়নি। যদিও বজ্রপাতে মৃত্যুহার কমাতে বিপুল অংকের টাকা বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে, যেগুলো আলোর মুখ দেখেনি। তালগাছ প্রকল্পের কথাই বলা যায়। তালগাছ বড় হতে দীর্ঘ সময় ও যত্ন প্রয়োজন। তাহলে তালগাছ লাগিয়ে বজ্রপাতের মতো ঝুঁকি মোকাবেলা করা কি সম্ভব! অথচ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফসলের মাঠের কাছে কৃষকদের জন্য আশ্রয়স্থলসহ বজ্রনিরোধন দণ্ড স্থাপন করা হয়েছে। এমনকি বজ্রনিরোধক বাস কৃষি খেতের পাশে দাঁড়িয়ে থাকার নজিরও রয়েছে বিশ্বে। অথচ দেশের নীতিনির্ধারকরা আজও তালগাছের চারা রোপণের প্রকল্পে আটকে আছে। কার্যকরভাবে পূর্বপ্রস্তুতি নেয়া ও কৃষকদের সচেতন করে তুলতে পারছেন না। সুতরাং দুর্যোগের ঝুঁকি প্রশমনে নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই ভিন্নপথে হাঁটতে হবে।
সব ক্ষেত্রেই পূর্বাভাস বা পূর্বপ্রস্তুতি জোরদার করা প্রয়োজন। তবে এর সঙ্গে কীভাবে কিছু দুর্যোগ কমানো যায়, সেটিও চিন্তা করতে হবে। যেমন দেশের শহরগুলো কেন হিট আইল্যান্ড হয়ে উঠছে, সেটি বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। এর পেছনে কিছু স্থানীয় দায় রয়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাধার ভরাট, বন ধ্বংস, অতিমাত্রায় কার্বন নিঃসরণ ইত্যাদি কর্মকাণ্ড প্রকৃতি পরিবেশ নষ্ট করেছে। ফলে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বেড়েছে। এসব কাজ কমিয়ে আনতে হবে। প্রকৃতি রক্ষায় জোর দেয়া জরুরি, নয়তো ভবিষ্যতে তাপমাত্রা বৃদ্ধিজনিত দুর্যোগ বাড়তে থাকবে। এর বাইরে ঢাকাসহ বড় শহরগুলো বর্তমানে ঘনবসতিপূর্ণ এবং এখানকার ভবনগুলো খুব বেশি দুর্যোগ সহনীয় নয়। গবেষণা বলছে, বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে রাজধানীর অর্ধেক ভবন আংশিক বা সম্পূর্ণ ধসে পড়ার আশঙ্কা আছে। অর্থাৎ নগর পরিকল্পনা সুষ্ঠু হলে, বিল্ডিং কোড বাস্তবায়ন হলে এ ধরনের দুর্যোগ সহজে মোকাবেলা করার সুযোগ ছিল। এর বাইরে প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা হলেও সেসব এলাকায় উদ্ধারকাজে ধীর গতি, অসমন্বয়ের অভিযোগ পাওয়া যায়। সুতরাং সামগ্রিকভাবে দেশে দুর্যোগ মোকাবেলার সক্ষমতা জোরদার করার দিকে মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন।
