ভারতে এখন তরুণদের উত্তাল আন্দোলন চলছে। অভিযোগ উঠেছে নির্বাচন কমিশন বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা (Special Intensive Revision) বা সংক্ষেপে এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি মানুষের নাম বাদ দিয়েছে। এর শিকার প্রধানত মুসলিম, স্থানান্তরিত মানুষ, দলিত, নারী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। আন্দোলন দিল্লির যন্তর-মন্তর থেকে পশ্চিমবঙ্গ, কর্ণাটকসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। এই মুহূর্তে মূল দাবি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ। অক্টোবর মাসে এই আন্দোলন গণআন্দোলনে রূপ নিয়েছে।
বিজ্ঞাপন
আন্দোলনের নেতৃত্বে জেনজি, ককরোচ জনতা পার্টি, বিরোধী দলগুলোর জোট বা ইন্ডিয়া ব্লক আছে। এই মুহূর্তে আন্দোলনের সামনের সারিতে যাকে আন্দোলনের মুখপাত্র হিসেবে দেখা যাচ্ছে, তিনি নিখিল ভারত ছাত্র সমিতি বা আইসার সভাপতি রয়েছেন ছাত্রনেত্রী নেহা বোরা। এসআইআরের বিরুদ্ধে নারী অধিকার সংগঠনও সোচ্চারভাবে দাঁড়িয়েছেন। কারণ খুব স্পষ্ট। এসআইআর সরাসরি নারীÑবিশেষ করে মুসলিম এবং প্রান্তিক নারীদের ভোটের অধিকার এবং নাগরিকত্ব মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলেছে। ১৩ কোটি ভোটারের বাদ পড়া ভোটারদের মধ্যে নারীর সংখ্যাই বেশি। পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লাখ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে, তার মধ্যে ৬২ শতাংশ নারী। একইভাবে উত্তরপ্রদেশ, বিহারে নারী ভোটার বাদ পড়ার হার ৬০ শতাংশ, আসামে ৭০ শতাংশ।
যদি ধরেও নেওয়া যায় যে এসআইআর অনুপযুক্ত এবং ডুপ্লিকেট ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার উদ্দেশ্য করা হয়েছে, কিন্তু কাদের ‘অনুপযুক্ত’ বলে চিহ্নিত করেছে, নির্বাচন কমিশন সেই চিত্র দেখলে উদ্দেশ্য সম্পর্কে ভিন্ন ধারণা হয়। বিশেষ এর মধ্যে নারীবিরোধী আচরণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জনগণ সেটি বুঝেই এর বিরুদ্ধে নেমেছে। বিভিন্ন তথ্য সূত্রে জানা যাচ্ছে, ২০২৫ সালে বিহারে এসআইআর করা হলো, তখন ৬৫ লাখ নাম বাদ গেল, যার মধ্যে নারীর সংখ্যা ছিল ৩১ লাখ। নারী-পুরুষ অনুপাত প্রতি হাজার পুরুষের ৮৯২ নারী হয়ে গেল, যা আগে ছিল প্রতি হাজার পুরুষে ৯০৭ নারী। গুজরাটেও নারী-পুরুষ অনুপাত কমে গিয়ে দাঁড়াল ৯৩৮ নারী, মধ্যপ্রদেশে ৯৩৪ এবং রাজস্থানে ৯২০ নারীতে গিয়ে দাঁড়াল। অর্থাৎ প্রায় ১২টি রাজ্যে নারীরা পুরুষের তুলনায় বেশি বাদ পড়েছেন, ফলে নারী-পুরুষ ভোটারের অনুপাতও কমে গেল।
নিঃসন্দেহে নারীদের বাদ দেওয়ার কারণ বৈষম্যমূলক এবং সেটি যে প্রক্রিয়ায় করা হয়েছে, তাতে এই বৈষম্যের প্রকাশ স্পষ্ট। যেমন বিবাহিত নারীদের বাবা-মায়ের নাম ছাড়াও তাদের বাপের বাড়ির ঠিকানায় গিয়ে ও আগের নথিপত্র যাচাই করতে বাধ্য করা হচ্ছে। এটি জেনেই যে প্রান্তিক নারীদের জন্য এ কাজ অনেক কঠিন। শ্রমজীবী নারীদের নিজস্ব স্থায়ী নথিপত্র দেখাতে বলা হচ্ছে এবং না দিতে পারলে বাদ দেওয়া হয়েছে। নারীবাদী নেটওয়ার্ক, বিশেষ করে অল-ইন্ডিয়া ফেমিনিস্ট অ্যালায়েন্স (ALIFA-NAPM) এই নথিপত্র চাওয়ার বিষয়কে পিতৃতান্ত্রিক বংশধারা অনুসরণ করছে বলে অভিযোগ করেছে, যা মূলত পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় বিবাহিত, প্রান্তিক এবং মাইগ্রেন্ট নারীকে বৈষম্যের মধ্যে ফেলে।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিবাহিত নারীদের সমস্যা অনেক জটিল। বিয়ের পর তাদের নামের পদবি পরিবর্তন হয়ে যায়, তাদের ঠিকানা বদলে যায়। সবকিছু স্বামীর নাম ও ঠিকানার সঙ্গে জুড়ে থাকে। যারা গরিব এবং শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত তাদের জন্মনিবন্ধন খুঁজে পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। ভারতের আর্থসামাজিক পরিস্থিতিতে ভোটার তালিকায় নাম রাখতে গিয়ে বাবার বাড়ির নথিপত্র দিতে বাধ্য করা আর কিছুই নয়, এই নারীদের বাদ দেওয়ার ইচ্ছাই প্রতিফলিত হয়। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে বিশেষ বাংলাদেশের মানুষ বলেও ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার অজুহাত দেওয়া হয়।
নারীদের মধ্যে যারা বাদ পড়ছেন, বলাবাহুল্য তারা অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল, শিক্ষার দিক থেকে পিছিয়ে আছেন এবং তাদের সরকারের প্রশাসনিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ সীমিত। এদের বড় অংশই হচ্ছে আদিবাসী, দলিত এবং শ্রমজীবী নারী। এই জনগোষ্ঠীকে নির্বাচনে ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত করার অর্থ হচ্ছে তাদের প্রতিনিধিত্ব নির্বাচিত করার পথ বন্ধ করে দেওয়া। তাদের ভোটাধিকার হরণ ছাড়াও নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাই নারীরা সোচ্চার হয়েছেন। ঠিক যেমন এর আগে নাগরিকত্ব (সংশোধন) আইন বা Citizen Amendment Act CAA এবং জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (National Register of Citizens NRC হাজার হাজার আন্দোলনে তীব্র শীতের মধ্যে খোলা আকাশের নিচে দিনের পর দিন রাস্তায় বসে থেকে প্রতিবাদ করেছেন। ২০১৯ সালের সে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সাধারণ নারীরা । শিক্ষক, ছাত্রী, গৃহিণী, তরুণ এবং বৃদ্ধ নারী সব এক হয়ে গিয়েছিলেন। ধর্মীয় পরিচয়ে অধিকাংশ ছিলেন মুসলমান। আন্দোলন ছিল অহিংস এবং শান্তিপূর্ণ। তারা শুধু রাস্তায় বসে থাকেননি, বাড়ি বাড়ি গিয়েও প্রচার চালিয়ে ছিলেন। আন্দোলনের মূল কেন্দ্র ছিল দিল্লির শাহীনবাগ এবং এখানে টানা ১০০ দিন তীব্র শীতের মধ্যেও রাস্তায় ধর্মঘট পালন করেছিলেন। সবচেয়ে লক্ষ করার বিষয় ছিল আন্দোলনে নেতৃত্বে যেমন তরুণ নারী ছিলেন, তেমনি ছিলেন ৮২ বছর বয়সি বিলকিস বানু বা বিলকিস দাদির মতো প্রবীণ নারীরা। এই আন্দোলন নিয়ে ভারত যথেষ্ট বিপাকে পড়েছিল, তবে ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারি ও লকডাউনের কারণে সমাপ্ত হয়েছিল। জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তার জন্য পুরো এলাকাটি ফাঁকা করে দেওয়া হয়।
ভারতে নারীরা যখন রাজনীতিতে নিজেদের যোগ্যতায় এগিয়ে আসছেন, এমন একটি সময়ে নারীদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার সবচেয়ে বড় মাপের এ ঘটনা ঘটেছে এবং এ ঘটনা ঘটেছে একবিংশ শতাব্দীর প্রথম অংশেইÑমাত্র ২০ বছর না পার হতেই। এখন নারী আন্দোলন তাই পুরো ভোটার তালিকার বিষয়টির সংস্কার দাবি করছে। তারা দাবি করছে যেসব কারণে নারী ভোটারদের নাম অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বাদ পড়েছে তা চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনে বাদ পড়া ভোটারদের অন্তর্ভুক্ত করার। প্রান্তিক নারীদের যেসব নথি চাওয়া হয়েছে অথচ তারা সেগুলো দিতে পারছে না, তার বাস্তব কারণ রয়েছে। এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীদের আইনি অস্তিত্ব প্রমাণের নথি সহজে পাওয়া যায় না। সে ক্ষেত্রে তাদের জন্য বিকল্প পদ্ধতিতে নথিভুক্ত করার প্রস্তাব এসেছে। শুধু তাই নয়, ট্রান্সজেন্ডার এবং তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের আইডি কার্ড দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। আপাতদৃষ্টিতে এই এসআইআর শুধু ভোটের অধিকার হরণ মনে হলেও এর পরিণাম আরো সুদূরপ্রসারী। সরকারের কাছে সুবিধা পেতে হলে ভোটার আইডি কিংবা নাগরিকত্বের প্রমাণ প্রয়োজন। নারীদের ক্ষেত্রে মাতৃত্বকালীন ভাতা, বিধবা ভাতা বা রেশন সুবিধা থেকেও তারা বঞ্চিত হবে। তাদের ভারতের নাগরিক নয় বলে অন্য দেশেও পাঠিয়ে দিতে পারে। মুসলমান এবং বাংলাভাষী হলে তাদের জন্য ঝুঁকি আরো অনেক বেশি।
এসআইআর বা বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা আর কিছুই নয়, নারী এবং প্রান্তিক মানুষকে নিশ্চিহ্ন করার নগ্ন চেষ্টা। প্রতিরোধকারীদের জয় হোক।
