জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় সেরা হিসেবে নির্বাচিত তরুণদের নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে পাঠাতে সরকার সহযোগিতা করবে বলে জানিয়েছেন প্রধান মন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন। তিনি বলেছেন, দেশব্যাপী স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে। সেখান থেকে চূড়ান্তভাবে বিজয়ী ও সেরা তরুণদের সরকারি অর্থায়নে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে, যাতে তারা বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন।
শুক্রবার সকালে জাতীয় সংসদের এলডি হলে ‘বাংলাদেশ ইউথ মডেল ইউনাইটেড নেশনস ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন মাহ্দী আমিন। ‘ফিউচার বাংলাদেশ’-এর আয়োজনে দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণেরা জাতীয় ও বৈশ্বিক নীতি নিয়ে বিতর্কে অংশ নিচ্ছেন।
প্রস্তাবটি বাস্তবায়নে সরকারের সহযোগিতার বিষয়ে আশ্বাস দিয়ে মাহ্দী আমিন বলেন, প্রধান মন্ত্রীর পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করছি, আগামী বছর থেকে এই প্রস্তাবনা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাস্তবায়নে সরকার সব ধরনের সহযোগিতা নিশ্চিত করব।
শিক্ষার্থীদের মেধা ও সৃজনশীলতার বিকাশে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া, এই তিন ক্ষেত্রের সমন্বয়ে বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা। তিনি বলেন, এ পরিকল্পনার আওতায় দেশজুড়ে বিভিন্ন ধরনের প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে। একই সঙ্গে গণিত অলিম্পিয়াড, পদার্থবিজ্ঞান অলিম্পিয়াড, নতুন কুঁড়ি, ক্বিরাআত ও হিফজ প্রতিযোগিতা, বিতর্ক এবং কুইজ প্রতিযোগিতাসহ শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশে আয়োজিত বিভিন্ন কর্মসূচিতে সরকারের সর্বাত্মক সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা অব্যাহত থাকবে।
‘বাংলাদেশ ইউথ মডেল ইউনাইটেড নেশনস ২০২৬’ আয়োজনের জন্য আয়োজকদের প্রশংসা করেন মাহ্দী আমিন। দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে তরুণ প্রজন্মকে অভিহিত করে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তরুণদের মধ্য থেকেই আগামী দিনের বাংলাদেশের নেতৃত্ব গড়ে উঠবে। তারা শিক্ষা, সংস্কৃতি, শিল্প, রাজনীতি, নীতি প্রণয়ন ও সাংবাদিকতাসহ সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন।
শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, তরুণদের উপস্থিতি প্রমাণ করে, দেশকে ঘিরে তাদের সুন্দর স্বপ্ন ও সুস্পষ্ট লক্ষ্য রয়েছে। নিজেদের প্রজন্মের সেরা হিসেবে গড়ে তুলতে তাঁরা দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে আসছেন। একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে তরুণদের মধ্যে সঠিক মূল্যবোধ, আদর্শ, মেধা, যোগ্যতা ও সততার চর্চা অপরিহার্য।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তরুণদের অবদানের কথা স্মরণ করে মাহ্দী আমিন বলেন, রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে তরুণেরাই একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছেন। সে সময় তারা বৈষম্যহীন ও মেধাভিত্তিক সমাজের ভিত্তি রচনা করেছেন, যেখানে সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাক্স্বাধীনতা ও মানবাধিকার নিশ্চিত করবেন।
প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা আরও বলেন, সরকার এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যেখানে কোনো নাগরিকের সফল হওয়া কিংবা আত্মবিকাশের সুযোগ পাওয়ার জন্য বিশেষ কোনো রাজনৈতিক দলের পরিচয়ের প্রয়োজন হবে না। সমাজে ন্যায়বিচার ও সমতা বজায় থাকবে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় নিশ্চিত করা হবে স্বচ্ছতা ও কার্যকর জবাবদিহি।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়তে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি সহশিক্ষা ও বিভিন্ন সৃজনশীল কার্যক্রমে আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হতে হবে। ঐতিহাসিক সংসদ চত্বরের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, আজকের তরুণদের মধ্য থেকেই আগামী দিনে অনেকে সংসদ সদস্য ও নীতিনির্ধারক হিসেবে এই সংসদে বসে দেশ পরিচালনায় ভূমিকা রাখবেন।
অনুষ্ঠানে নিজের শিক্ষার্থীজীবনের স্মৃতিচারণা করে মাহ্দী আমিন জানান, ২০০৭ সালে সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কের বারুক কলেজে অধ্যয়নকালে তিনিও ‘মডেল ইউনাইটেড নেশনস’-এ অংশ নিয়েছিলেন। সে সময় বারুক কলেজের প্রতিনিধিত্ব করে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল তার।
মাহ্দী আমিন বলেন, বিশ্বের খুব কম দেশেই তরুণদের এমন গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত ইতিহাসের প্রতিটি বাকে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র সুরক্ষায় এ দেশের শিক্ষার্থীরা রাজপথে রক্ত দিয়ে মুক্তির পথ রচনা করেছেন।
বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভাগ্য তরুণদের ভাগ্যের সঙ্গে জড়িত বলে সরকার বিশ্বাস করে। দেশকে স্বনির্ভর ও স্বাবলম্বী করতে তরুণদের আকাঙ্ক্ষাকে রাষ্ট্র পরিচালনায় ধারণ করতে হবে। এ জন্য তরুণদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত ক্ষেত্রে পূর্ণ ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, নীতি প্রণয়নের প্রতিটি স্তরে তরুণদের প্রত্যাশা, দৃষ্টিভঙ্গি ও মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, যুগোপযোগী দক্ষতা তৈরি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে নীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় তরুণদের মতামত সরাসরি সম্পৃক্ত করা জরুরি।
কেবল বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে তরুণদের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা ও উদ্ভাবনী ধারণা মনোযোগ দিয়ে শোনার জন্য আয়োজকদের আরও বেশি ‘নীতি সংলাপ’ আয়োজনের আহ্বান জানান মাহ্দী আমিন। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তোমরাই আগামীর নেতা এবং তোমরাই দেশকে ইতিবাচক পরিবর্তনের পথে নেতৃত্ব দেবে। তরুণদের পাশে থেকে অভিভাবকত্ব, সঠিক দিকনির্দেশনা ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার সর্বাত্মক ব্যবস্থা নেবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজিবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুল-আওয়াল এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ড. ডেভিড ডাউল্যান্ড।
