নেট ও মিডিয়া দুনিয়ায় কয়েকদিন ধরে অপ্রতীমের হত্যাকাণ্ড বেশ সাড়া জাগিয়েছে। এহেন নির্মম ও জঘন্য হত্যাকাণ্ড সভ্য সমাজে চিন্তা করাও অকল্পনীয়। অপ্রতীমের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদানকারী ডক্টরেট ডিগ্রিধারী মা ও সমাজের সচেতন শ্রেণির প্রতিনিধিত্বকারী বাবার প্রতি সমবেদনা জানানো ছাড়া সাধারণ
ড. সায়ীদ ওয়াকিল
নেট ও মিডিয়া দুনিয়ায় কয়েকদিন ধরে অপ্রতীমের হত্যাকাণ্ড বেশ সাড়া জাগিয়েছে। এহেন নির্মম ও জঘন্য হত্যাকাণ্ড সভ্য সমাজে চিন্তা করাও অকল্পনীয়। অপ্রতীমের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদানকারী ডক্টরেট ডিগ্রিধারী মা ও সমাজের সচেতন শ্রেণির প্রতিনিধিত্বকারী বাবার প্রতি সমবেদনা জানানো ছাড়া সাধারণ মানুষের খুব বেশি করণীয় আছে বলে মনে হয় না। হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া অপ্রতীমের অমন নিষ্পাপ মুখদর্শনে সেই এলাকার জনপ্রতিনিধির অঝোর কান্না এবং ‘মাত্র একটা মোবাইলের জন্য এমন হত্যাকাণ্ড মেনে নেওয়া যায় না’-এমন সরলোক্তি বিবেকবান প্রতিটি মানুষকে নাড়া দিয়েছে। ‘আর আমার তো একটাই সন্তান ছিল, আমি কি নিয়ে বাঁচবে?’ নিহতের মায়ের এমন হৃদয় বিদীর্ণ আর্তনাত পাষাণ হৃদয়কেও কাঁদিয়েছে। আবার এমন একজন কিশোরের মৃত্যুতেও এক শ্রেণির মানুষের মনে পৈশাচিক আনন্দের হিল্লোলও বয়ে গেছে। মিডিয়ার কল্যাণে আমরা তা অবলোকনও করেছি।
সময় এবং সমাজ এগিয়েছে বেশ দূর। ‘আমরা কি আর মানুষ হয়নি?’-এইভাবে পরিবেশকে মূল্যায়নের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের সময় এসেছে বলে সচেতন মহল মনে করেন। সচেতন মহল মনে করুক বা না করুক এমন পরিবর্তন কিন্তু বাস্তবে ঘটে গেছে। আমাদের পূর্ব-পুরুষদের বিনিয়োগ এবং চিন্তা ভাবনা ছিল ‘জমি’ কেন্দ্রীক। বছর বছর জমি কেনা কারো কারো নেশাতেও পরিণত হয়েছিল। কিন্তু সেটা এখন পরিবর্তিত হয়ে এসে দাঁড়িয়েছে ‘সন্তানে’। নিজের জীবনের সমস্ত সঞ্চয় পর্যন্ত সন্তানের জন্য বিনিয়োগ করতে মানুষ পিছপা হচ্ছে না। সমস্ত কিছুর বিনিময়ে সন্তান সমাজে প্রতিষ্ঠিত হোক এমনই তাদের চাওয়া। তাই সন্তানের প্রতি ‘স্নেহ-মহব্বতের’ মাত্রাটাও ভিন্ন মাত্রায় উপনীত হয়েছে। আমরা ভুলে যাচ্ছি সেই তত্ত্বের কথা, ‘সন্তানের জন্য মাতৃস্নেহের বিকল্প নেই, কিন্তু মাত্রাহীন মাতৃস্নেহ সন্তানের অমঙ্গল ডেকে আনে।’ পানি ছাড়া নৌকা চলবে না। কিন্তু সেই পানি যদি নৌকার পেটে ঢুকে পড়ে তাহলে সেই পানিও নৌকাটির পতনের কারণ হবে এটা আমাদের উপলব্ধিতে রাখতে হবে। পরিবার পরিজনকে ব্যবসায়ের পরিধির অন্তর্ভুক্ত না করেও ‘কর্পোরেট’ এই দুনিয়ার সূত্রে আমরা বলতে পারি যথার্থ উৎপাদন হাতে পেতে ‘ভূমি-শ্রম-মূলধন-সংগঠন’ এই চারটি উপাদানকে সমন্বিত করার বিকল্প এখনও মানুষের হাতে আসে নি। এই চারটির যে কোন একটি বিশৃঙ্খলায় পতিত হলে উৎপাদন আশা করা বাতুলতা হবে।
আমরা সমাজ ছাড়া বাঁচতে পারবো না। আর অধিকতর পরিশীলিত হতে মানুষকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হতেই হবে। সমাজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আমাদের জীবনের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। অবাক করা বিষয় হচ্ছে সমাজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনেক সময় সন্তানের বিপথে যাওয়ার পথকে প্রশস্ত করে দিচ্ছে। কেননা হাজারো মায়ের হাজারো মানসিকতার সন্তান একত্রে ঘন্টা পাঁচ-ছয়েক কাটাচ্ছে। যত নামী-দামী প্রতিষ্ঠানই হোক না কেন প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানেই ‘বখে যাওয়া’ কিংবা ‘বিদজ্জনক’ কিছু সন্তান থাকেই। সংখ্যায় সেটা কম হোক বা বেশি হোক। সন্তানের বন্ধুত্বের প্রথম বন্ধন কিন্তু সেখানেই তৈরি হয়। এই বন্ধুত্ব মানুষের জীবনে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে বন্ধুকে ‘হয়তো জান্নাত নয়তো জাহান্নাম’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। যে ইসলাম সাম্য ও মৈত্রীর সর্বোচ্চ বাণী প্রচার করে থাকে সেই ইসলাম বলছে, ‘কার সাথে বন্ধুত্ব করছো তার বংশ পরিচয় পর্যন্ত জেনে নাও।’ সামাজিক বন্ধনের ক্ষেত্রে এতো জটিল এবং কঠিন হুংকার দ্বিতীয়টি আছে বলে আমাদের জানা নেই।
সকল শিক্ষার্থী একই মানের হয় না। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে প্রায় সকল প্রতিষ্ঠানের সত্তর থেকে আশি শতাংশ শিক্ষার্থী নিম্নমানের হয়ে থাকে। ‘শিক্ষকের হাত থেকে বেত কেড়ে নেওয়া’; কোন কোন ক্ষেত্রে সেই বেত আবার ছাত্রের হাতে ওঠে যাওয়া; প্রভাবশালী বিশেষ করে রাজনীতিকে পেশা হিসেবে নিয়েছে এমন পরিবারের সন্তান; দু‘দিনে বড়লোক হতে হবে কিংবা যে কোন ভাবে টাকা উপার্জন করতে হবে এমন মানসিকতা; পেশি এবং অর্থের সামাজিক প্রভাব, শিক্ষকদের কাঙ্ক্ষিত মান এবং আর্থিক দুরাবস্থা প্রভৃতি কারণে শিক্ষাব্যবস্থা নীতি-নৈতিকতার জায়গা থেকে বেশ পিছিয়ে পড়েছে। এমন অবস্থায় ক্লাস ফাঁকি দেওয়া, বিড়ি-গাঁজা খাওয়া, বড়ভাই সুলভ আচরণ, মাস্তানি, মারপিট; এমন কি ছিনতাই ও হত্যাকাণ্ডের মতো জঘন্য কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা।
রাজনীতি এখন লাভজনক ব্যবসা এবং পয়সা কামানোর শ্রেষ্ঠ উপায় হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় বখে যাওয়া, বিগব্রাদারসুলভ আচরণকারী, পড়াশোনায় অমনোযোগী ছাত্রটি সেটাকেই প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রধান মাধ্যম হিসেবে বেছে নিচ্ছে। তাই দেখা যাচ্ছে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একশ’জন শিক্ষার্থীর মধ্যে একশতম পজিশনধারী সন্তানটি সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনের সভাপতি, নিরানব্বইতম পজিশনধারী সন্তানটি সেক্রেটারি, আটানব্বইতম পজিশনধারী সন্তানটি সাংগঠনিক সেক্রেটারি এবং তারপর একই মানের অন্যান্যরা যোগ্যতা অনুযায়ী পদ-পদবি পাচ্ছে। আর আমাদের সহজ সরল হাবাগোবা ও গোবেচারা টাইপের ফার্স্টবয় কিংবা সেকেন্ড বয় এদের ভয়ে কোনঠাসা কিংবা ম্রিয়মান। তাই মাঝারি মানের শিক্ষার্থীদের বিশেষ আগ্রহ তৈরি হচ্ছে নিচের দিকে থাকা শিক্ষার্থীদের প্রতি। কারণটা হচ্ছে তাকে সবাই ভয় করে, সে বুক ফুলিয়ে চলে, কম্বাইন্ড প্রতিষ্ঠান হলে দু’একটা প্রেমও করে। সবচেয়ে কষ্টের জায়গাটা হচ্ছে প্রতিষ্ঠানের যে কোন অনুষ্ঠানে ভলেন্টিয়ার কিংবা দায়িত্বের বোঝাটা প্রতিষ্ঠান প্রধান কিংবা দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি তার ওপরই অর্পণ করছেন। এতে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মনজগতে ঐসব বখে যাওয়া ছেলেদের ব্যাপরে কিংবা তাদের পথ অনুসরণের একটা জায়গা তৈরি হচ্ছে। বখে যাওয়া, ঝরে পড়া, অশিক্ষিত কিংবা স্বল্প শিক্ষিত মদ-গাজা-ইয়াবায় আসক্ত তথাকথিত ছাত্রনেতাদের টার্গেটের জায়গা হচ্ছে এইসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বখে যাওয়া শিক্ষার্থীরা। তাদের নিশানার তীরে বিদ্ধ করে বখে যাওয়া কোমলমতি শিক্ষার্থীকে। কমিটি বানায়, সভাপতি-সেক্রেটারির পদ দেয়; শিকার ধরার ‘প্রশিক্ষিত ডাহুকে’ পরিণত করে। তাদের দিয়ে আর সব বখে যাওয়া শিক্ষার্থীদের ধরে। এইসব শিক্ষার্থীদের সেইসব তথাকথিত ছাত্রনেতারা উপার্জনের হাতিয়ার বানায়। মিছিলে, সমাবেশে নিয়ে যায়। ‘আমার এতো জন এসেছে এতো টাকা দিতে হবে’। টাকা কামায় করে আতি নেতা পাতি নেতা আর বখে যাওয়া ছাত্রটা পায় যাতায়াত ভাড়া এবং ‘হাফ মোগলাই’। বাসায় আপেল কমলায় হাত দেয় না। কিন্তু পোড়া তেলে কড়া করে ভাজা মোগলাই কাড়াকাড়ি করে খায়। হাত উঁচিয়ে গলা ফুলিয়ে শ্লোগান, ইট পাথরের ঢিল বাস-ট্রাক-কাঁচের জানালায় ছোড়া, সিগারেট ফুঁকা, পড়াশোনা বাদ, সবাই সমীহ ও ভয় করে চলে-কী এক জম্মের জমা! সন্তানটি বখে যায়, কিশোর গ্যাংয়ের লিডার হয়। প্রতিষ্ঠান থেকে পাশ কিংবা ঝরে গেলেও তারা একটা সার্কেল রেখে যায়, ‘দুষ্টচক্রের’ চেইন রক্ষা করে চলে। এই ‘ভাইয়া কালচারে’ অভ্যস্থ হয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ এক পর্যায়ে ঝরে পড়ে এবং ভিন্ন সার্কেলে অভ্যস্ত হয়ে উঠে। এসব ছেলে মেয়েদের অধিকাংশই আবার মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। এই মাদকাসক্ত ছেলেদের মধ্যে এক ধরনের অভাবের সৃষ্টি হয়। এই ‘অভাবী’ সন্তানটি ধনী হলে ওদের ‘মানি পকেটে’ আর বিত্তহীন হলে ওদের ‘টাকা আয়ের’ পকেটে পরিণত হয়। এরাই ক্রমান্বয়ে হয়ে ওঠে কিশোরগ্যাং লিডার, চাঁদাবাজ কিংবা মাস্তান।
কোমলমতি শিক্ষার্থী থেকে কিশোরগ্যাং লিডার, চাঁদাবাজ কিংবা মাস্তানে পরিণত হওয়া একটা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। মোটামুটি দীর্ঘ একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থী এক পর্যায়ে সমাজের কীটে পরিণত হয়। এটা একদিন কিংবা এক মাসের বিষয় না। দীর্ঘ সময় ধরে তার মনোজগতে এবং বাহ্যিক আচরণে বহু পরিবর্তন আসে। উগ্র মডেলের বিভিন্ন মটরসাইকেলের ছবি কালেকশান কিংবা আপলোড দেওয়া, চুলের স্টাইলে উগ্রতা কিংবা সীমার অতিরিক্ত বড় চুল রাখা, স্কুল কিংবা প্রাইভেট ফাঁকি দেওয়া, কথা শুনতে বিরক্তি বা অনিহা প্রকাশ, উচ্চস্বরে কথা বলা, উগ্র স্টাইলের পোশাক-আশাকের প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহ,অতিরিক্ত ফ্রেন্ডসার্কেল রক্ষা একজন টিনেজার শিক্ষার্থীর মনোজগৎ ধীরে ধীরে ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। কোন শিক্ষার্থী হঠাৎ করে এমন আচরণ শুরু করলে অভিভাবককে অতি মাত্রায় সচেতন হয়ে উঠা দরকার। কেননা এই বয়সি সন্তানের হিতাহিত বোধ কম থাকবে কিংবা থাকবে না এটাই স্বাভাবিক। তাই এক্ষেত্রে অভিভাবকদের এগিয়ে আসতে হবে বন্ধুত্বের মনোভাব নিয়ে। তবেই না ছেলেটি অনাগত বিপদের হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে। সদ্য শৈশব পেরুনো একটা ছেলে যৌবনে পদার্পণকারীদের সাথে বন্ধুত্ব রক্ষা করে চলে, বুয়েটের অধ্যাপকমণ্ডলী কর্তৃক ঘোষিত ‘রোডক্যান্সার’ অর্থাৎ মোটর সাইকেল নিয়ে মাতামাতি করে, বিভিন্ন দেশে নিষিদ্ধ হওয়া টিকটকে সময় দেয়, মাদক ও নির্জন এলাকায় আই ফোন নিয়ে ঘোরাঘুরিসহ বিভিন্ন আপত্তিকর কর্মকাণ্ডে জড়িত, এগুলো মোটেও স্বাভাবিক কিছু নির্দেশ করে না। এটা নিঃসন্দেহে জেনে শুনে শিশুটাকে হননের দিকে ঠেলে দেওয়া কিংবা তার প্রতি চরম অবহেলারই বহিঃপ্রকাশ বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে। এগুলো কোন যুক্তি বা বুদ্ধি দিয়ে ঢেকে দেওয়া যায় না। আমাদের এমন কি ব্যস্ততা থাকে যে ভবিষ্যত প্রজন্মকে এই ভয়ানক বিপদ থেকে রক্ষা করার সময়টুকুও থাকে না। ‘মাৎস্যন্যায়’ সমাজ ব্যবস্থায় কে কাকে গিলে খেয়ে বেঁচে থাকবে সেটাই বিবেচ্য বিষয় হয়ে থাকে। কাজেই এই অবস্থায় পরিবারকে সর্বোচ্চ সতর্ক হওয়ার বিকল্প আমাদের সামনে খুব কমই আছে। মাত্র সপ্তম শ্রেণি পড়ুয়া এবং তের বছরের একজন অপ্রতীমের সার্বিক কর্মকাণ্ড সমাজের সচেতন মানুষকে যারপরনাই হতাশ করেছে। তার বন্ধু সার্কেল, আই ফোনের ব্যবহার, টিকটক, যখন তখন যার তার সাথে যেখানে সেখানে যাওয়া আমাদেরকে বিস্মিত করেছে। সে এখন সবকিছুর উর্ধ্বে। তার অভাব পরিবারের মতো আমরা কেউই অনুধাবন করতে সক্ষম নয়। তবুও একটা কথা থেকে যায়, আমাদের উদাসীনতা, মাত্রাধিক্য স্নেহ-মমতা, অসচেতনতা এই দায় থেকে কি আমাদের মুক্তি দিবে?
লেখক : প্রাবন্ধিক।
