হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে নতুন কৌশল নিচ্ছে ইরান। তেলের দাম চড়া রাখতে ও আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রভাব ফেলতেই কৌশল বদলে ফেলা হচ্ছে বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন ইরানের দুই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ইরানে আগ্রাসন শুরুর পর থেকেই হরমুজ প্রণালী কার্যত অবরুদ্ধ করে দিয়েছে তেহরান। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ এই নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। ওয়াশিংটনের ওপর চাপ তৈরি করে আলোচনায় সুবিধা পেতে ইরান এ নৌপথে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ দিয়েছে।
ইরানের হুমকি ও হামলার কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল অনেকটাই কমে গেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বেড়েছে জ্বালানি তেলের দামও। তবে এর মধ্যেও কিছু তেলবাহী জাহাজ এই প্রণালী দিয়ে চলাচল অব্যাহত রেখেছে।
নতুন কৌশলের বিস্তারিত জানাতে রাজি না হলেও এক কর্মকর্তা বলেন, ‘তেহরানের বিধিনিষেধ অমান্য করা জাহাজের ওপর প্রায় ১০ দিন আগে থেকে ভিন্ন ধরনের আক্রমণাত্মক কৌশল প্রয়োগ শুরু করেছে ইরান। এর ফলেই এ ধরনের জাহাজে হামলার ঘটনা বেড়েছে।’
কর্মকর্তারা জানান, নতুন এই কৌশলের আওতায় হামলার ধরন ও তীব্রতা—দুটিতেই পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর অন্যতম লক্ষ্য মার্কিন নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলা। দুই কর্মকর্তার একজন বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমানোর যে চেষ্টা চালাচ্ছে, তা নস্যাৎ করাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য।’
কর্মকর্তারা আরও বলেন, ‘নতুন কৌশল গ্রহণের এই সিদ্ধান্ত ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব পর্যায় থেকেই নেওয়া হয়েছে এবং দেশটির সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার পূর্ণ সমন্বয়ের মাধ্যমেই তা বাস্তবায়িত হচ্ছে।’
নাম না প্রকাশের শর্তে মার্কিন সামরিক বাহিনীর একজন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, ইরান তাদের কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। মার্কিন হামলায় ইরানের রাডার সক্ষমতার বড় একটি অংশ ধ্বংস হওয়ার পর বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এখন ছোট ছোট নৌকায় নিরস্ত্র স্পটার পাঠাচ্ছে। এদের কাজ হলো মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজসহ সম্ভাব্য টার্গেট চিহ্নিত করা।
ওই মার্কিন কর্মকর্তা জানান, গত সপ্তাহে একটি ঘটনা ঘটে, যা আগে সংবাদমাধ্যমে আসেনি। মার্কিন সামরিক বাহিনী নিশ্চিত হয়, নজরদারির কাজে ব্যবহৃত ইরানের একটি প্রথাগত কাঠের নৌযান থেকে লক্ষ্যবস্তুর তথ্য সরাসরি আইআরজিসির কাছে পাঠানো হচ্ছিল। এরপর মার্কিন বাহিনী নৌকাটিকে ঘিরে ফেলে, আরোহীদের নৌকা ছেড়ে নেমে যাওয়ার নির্দেশ দেয়; পরে সেটিকে ধ্বংস করে দেয়।
চলমান এই যুদ্ধ ও এর পেছনে মাসে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের ব্যয়ভার আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারণায় প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। এ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে মার্কিন কংগ্রেসের কাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে, তা বিবেচনা করছেন। যদিও তিনি দাবি করেছেন, নির্বাচনের আগে আর ইরানে হামলা চালাবেন না।
এদিকে সংঘাত অবসানে তেহরানকে যেন চুক্তিতে পৌঁছাতে বাধ্য করা যায়, সে জন্য তাদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে দেশটির বিভিন্ন সমুদ্রবন্দরে নৌ-অবরোধ জোরদার করেছে যুক্তরাষ্ট্র; সেই সঙ্গে নতুন করে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে।
হরমুজ প্রণালী ঘিরে চলমান এই অচলাবস্থা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে আরও বড় ধরনের সংকটে ফেলেছে। একদিকে হামলার হুমকি, অন্যদিকে জাহাজের অতিরিক্ত ভাড়া ও চড়া বিমা খরচ—সব মিলিয়ে এই নৌপথে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া জটিল হয়ে উঠেছে।
ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনসের (ইউকেএমটিও) তথ্য ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত ৪৮ ঘণ্টায় হরমুজ ও আশপাশের অঞ্চলে তেলবাহী ট্যাঙ্কার ও অন্যান্য বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে অন্তত পাঁচটি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ড্রোন হামলাও রয়েছে।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল সংস্থা আইএমওর পরিসংখ্যান অনুসারে, এই হামলার হার গত ৩ থেকে ৫ অক্টোবরের হামলার হারের মতোই। এটি পরিস্থিতির নতুন করে অবনতি ঘটার ইঙ্গিত দেয়। সামুদ্রিক নিরাপত্তাসংক্রান্ত একটি সূত্র জানিয়েছে, হামলার তীব্রতা লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে; এটি স্পষ্টতই সুপরিকল্পিত।
কর্মকর্তারা জানান, নতুন কৌশলের অংশ হিসেবে তেহরান তাদের সামরিক তৎপরতার ভৌগোলিক পরিধি শুধু হরমুজ প্রণালীতেই সীমাবদ্ধ রাখবে না; বরং তা ওমান উপসাগর ও এর বাইরের বিস্তৃত সমুদ্রসীমা পর্যন্ত ছড়িয়ে দেবে।
হামলার তথ্য বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, এ প্রক্রিয়া সম্ভবত ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। এসব তথ্যে দেখা যাচ্ছে, গত কয়েক দিনে ইরান হরমুজের বাইরেও কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলবর্তী জলসীমায় জাহাজগুলোকে নিশানা করছে।
দ্বিতীয় ইরানি কর্মকর্তা বলেন, ‘আগামী নভেম্বরের নির্বাচনের আগে ট্রাম্পকে কোনোভাবেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমাতে দেবে না তেহরান।’ ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘তারা যখনই ভাববে যে, তেলের দাম কমার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, ঠিক তখনই আমরা তাদের সেই সুযোগ থেকে দূরে ঠেলে দেব। এটা দাবা খেলা।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ ধরনের জাহাজগুলো কোথাও নিরাপদ থাকবে না, হরমুজ প্রণালীর বাইরেও নয়।’ এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলে পেন্টাগন ও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি।
