The Sangbad · সাধারণ
চোরবাগান কাণ্ডে এবার রহস্যের পর্দাফাঁস!
১৮/১০/২০২৬

কলকাতার দুর্গোৎসবে নজিরবিহীন বিপর্যয়। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজোর মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ১৯ জন। আহত হয়েছেন ৩৫ জন। রবিবার, ১৮ অক্টোবর, সকাল থেকে এই ঘটনায় তদন্তে একাধিক পদক্ষেপের খবর সামনে এসেছে। পুজো কমিটির সম্পাদক ও সহ-সভাপতি-সহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে কলকাতা পুলিশ। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে গঠন করা হয়েছে বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট। প্রকাশ্যে এসেছে মৃতদের নাম ও বয়সের তালিকাও। কিন্তু এই বিপর্যয়ের নেপথ্যে ঠিক কী ঘটেছিল? ভিড় নিয়ন্ত্রণে কোথায় ঘাটতি ছিল? আর নিহতদের মধ্যে বাংলাদেশের কোনও দর্শনার্থী রয়েছেন কি না—সেই প্রশ্নও উঠছে।শনিবার (১৭ অক্টোবর) সপ্তমীর সন্ধ্যায় প্রবল বৃষ্টি ও বজ্রপাতের মধ্যে চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজোর মণ্ডপে বিপুল ভিড় জমেছিল। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বৃষ্টি থেকে বাঁচতে বহু দর্শনার্থী একসঙ্গে মণ্ডপে প্রবেশের চেষ্টা করেন। আগে থেকেই জমে থাকা ভিড়ের মধ্যে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। হুড়োহুড়িতে পদপিষ্ট হয়ে একের পর এক মানুষের মৃত্যু হয়। আহতদের উদ্ধার করে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।রোববার কলকাতা পুলিশ এই ঘটনায় সাতজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে। ধৃতদের মধ্যে রয়েছেন চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজো কমিটির সম্পাদক রাজকুমার সেওদা ওরফে রাজা এবং সহ-সভাপতি শান্তনু দুবে। এ ছাড়া মণ্ডপের বাঁশের কাঠামো নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত বিপ্লব মুখোপাধ্যায়, ভিড় নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা কৌশিক সাহা ও পিন্টু দে এবং বেসরকারি নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সুমন চক্রবর্তী ও রাজেশ পালকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।পুলিশ সূত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রথমে ১৪ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দুর্ঘটনার ঘটনায় গিরিশ পার্ক থানায় স্বতঃপ্রণোদিত মামলা দায়ের হয়েছে। ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১০৫, ১১০ এবং ৩(৫) ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমকে জানানো হয়েছে।তদন্তকারীরা ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা, মণ্ডপের প্রবেশ ও বেরোনোর পথ, নিরাপত্তাকর্মীদের ভূমিকা এবং দুর্ঘটনার আগে কী ধরনের ঘোষণা করা হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখছেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের একাংশের অভিযোগ, ভিড় সামলানোর ক্ষেত্রে ঘাটতি ছিল এবং জরুরি পরিস্থিতিতে উদ্ধারকাজে সমস্যা দেখা দেয়।চোরবাগানকাণ্ডে মৃত ১৯ এর পরিচয় তালিকা জানিয়েছে পুলিশ। নিহতদের মধ্যে শিশু, কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী এবং প্রবীণরাও রয়েছেন। প্রকাশিত তালিকায় কলকাতা ও শহরতলির পাশাপাশি হুগলি, নদিয়া, পূর্ব বর্ধমান এবং বিহারের বাসিন্দাদের নাম রয়েছে। একই পরিবারের বাবা ও ছোট ছেলের মৃত্যুর ঘটনাও এই বিপর্যয়ের শোক আরও গভীর করেছে।আহত ৩৫ জনের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রাজ্য সরকার জানিয়েছে, আহতদের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনও গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতেই বিশেষ তদন্তকারী দল কাজ শুরু করেছে। রোববার রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে দুর্ঘটনার তদন্তে বিশেষ তদন্তকারী দল গঠনের কথা জানানো হয়েছে। তদন্তে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ত্রুটি বা দায়িত্ব পালনে গাফিলতির প্রমাণ মিললে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।মৃতদের পরিবারের জন্য ২৫ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সহায়তা এবং পরিবারের একজনকে সরকারি চাকরি দেওয়ার ঘোষণা করেছে রাজ্য সরকার। আহতদের পাঁচ লক্ষ টাকা করে সহায়তা এবং চিকিৎসার খরচ বহনের কথাও জানানো হয়েছে। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মৃতদের নিকটাত্মীয়দের জন্য দুই লক্ষ টাকা এবং আহতদের জন্য ৫০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা ঘোষণা করেছেন।দুর্ঘটনার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে চোরবাগান ও বোবাজারের সংলগ্ন কিছু এলাকায় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা জারি করা হয়েছে। ১৮ থেকে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত নির্দিষ্ট এলাকায় এই নিষেধাজ্ঞা বলবত থাকাবে।নিরাপত্তার কারণে দুর্ঘটনাস্থলের পুজো মণ্ডপে দর্শনার্থীদের প্রবেশও বন্ধ রাখা হয়েছে।চোরবাগানের দুর্ঘটনার পর বাংলাদেশের দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কলকাতার দুর্গাপুজোয় প্রতিবছর বাংলাদেশ-সহ বিভিন্ন দেশ থেকে বহু মানুষ আসেন। তবে ১৮ অক্টোবর সন্ধ্যা পর্যন্ত পাওয়া সংবাদে নিহতদের মধ্যে কোনও বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়নি।প্রকাশিত মৃতদের তালিকায় ভারতের বিভিন্ন রাজ্য ও জেলার বাসিন্দাদের নাম রয়েছে। কিন্তু নিহতদের মধ্যে বাংলাদেশের কোনও নাগরিকের নাম এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি। দু একটি গানমাধ্যমে বাংলাদেশের নাগরিক বিষয়টি উল্লেখ ছিল, তাই এ ব্যাপারে খোঁজ নিলে কোনো তথ্য সরকারি ভাবে নিশ্চিত করেনি। তাই বাংলাদেশি দর্শনার্থীর মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে অনুমানভিত্তিক কোনও দাবি করা হচ্ছে না।সামনে এখন একাধিক প্রশ্নচোরবাগানের এই মর্মান্তিক ঘটনা শুধু একটি পুজো মণ্ডপের নিরাপত্তা নিয়েই প্রশ্ন তুলছে না, কলকাতার বড় জনসমাগমে ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাকেও আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। প্রবল বৃষ্টির মধ্যে দর্শনার্থীদের নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল? প্রবেশ ও নির্গমনের পথের পরিকল্পনা যথাযথ ছিল কি? জরুরি পরিস্থিতিতে পুলিশ, নিরাপত্তাকর্মী ও আয়োজকদের মধ্যে সমন্বয় ছিল কি না? তদন্তে এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজছে প্রশাসন।উৎসবের আনন্দের মাঝে ১৯টি প্রাণহানি বহু পরিবারকে শোকের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এখন নিহতদের পরিবারকে সহায়তা, আহতদের চিকিৎসা এবং ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করাই সবচেয়ে জরুরি। পাশাপাশি, ভবিষ্যতে যাতে এমন বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি না হয়, তার জন্য কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবিও জোরালো হচ্ছে।চোরবাগান পদপিষ্ট কাণ্ডের তদন্তে পরবর্তী পদক্ষেপ, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে নতুন তথ্য এবং বাংলাদেশি দর্শনার্থীদের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত খবর সামনে এলে তা তাৎক্ষণিক ‘সংবাদ’র মাধ্যমে জানানো দেয়া হবে।
মূল প্রতিবেদনে যান ↗