The Sangbad · সাধারণ
স্বীকৃতির অপেক্ষায় আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধারা
১৮/১০/২০২৬

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের উত্তরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বলেছেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের সুপারিশে ২০১০ থেকে এ পর্যন্ত ৬ হাজার ৪৭৬ জনের গেজেট/লাল মুক্তিবার্তা/ভারতীয় তালিকা বাতিল করা হয়েছে এবং আগস্ট ২০২৪ থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত সারা দেশে তদন্ত ও যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে ৪৮১ জন অমুক্তিযোদ্ধার গেজেট বাতিল করা হয়েছে। এই মুহূর্তে মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা তো ২ লাখ ৩ হাজার সামথিং, এরকম আরকি।’ অপরদিকে, ৭ অক্টোবর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বলেছেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় অমুক্তিযোদ্ধাদের অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ এবং ১৯৭১ সালের শহীদ ও বীরাঙ্গনাদের তালিকা নিয়ে বিতর্কের অবসান ঘটাতে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে নির্মোহভাবে যাচাই-বাছাই করা হবে।... যারা দরখাস্ত দিয়েছেন, চুলচেরা যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে সততা এবং নিষ্ঠার সঙ্গে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যদি সত্যিকারে কেউ বাদ পড়েন, তাদেরই নেওয়া হবে, যতজন দরখাস্ত করুন না কেন। তাতে অসুবিধা নেই, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের তালিকায় আসবেন তারাই, যারা সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধা এবং চূড়ান্ত যাচাই-বাছাইয়ে যারা থাকবেন। এবং এটা হবে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে নির্মোহভাবে।’ এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনায় নেওয়া হবে প্রামাণ্য দলিল, সরকারি ও সামরিক নথি, মুক্তিযুদ্ধকালীন রেকর্ড, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য, স্থানীয় পর্যায়ের তথ্য ও গবেষণালব্ধ উপাত্ত। মুক্তিযোদ্ধা নির্ধারণে মন্ত্রণালয়ের আয়োজন অনুযায়ী, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে কমিটি গঠন করা হবে, দল গঠন করে তদন্ত চালানো হবে, এরপর সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে। সবকিছু নিবিড়ভাবে তদন্ত ও পর্যায়ক্রমে যাচাই-বাছাইয়ের পরই একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত হবেন।আমরা দেখেছি, ঝিনাইদহে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের নির্মাণাধীন ভাস্কর্যের মাথায় দড়ি দিয়ে জুতার মালা ঝুলিয়ে অবমাননা করার ঘটনা। জীবিত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের গলায় জুতার মালা পরিয়ে প্রকাশ্যে জনসমক্ষে অসম্মানিত করা হয়েছে। তাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ছাড়াই সমাহিত হতে হয়েছে। সত্যিই রণাঙ্গনের এই আশিতিপর নারী-পুরুষেরা জীবনের সায়াহ্নে এসে অত্যন্ত হতাশ ও সংক্ষুব্ধ। আমি ব্যক্তিগতভাবে কয়েকজন আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাকে জানি ও চিনি, যারা আজও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি ও সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছেন। কখনো রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, কখনো স্থান পরিবর্তনের কারণে, আবার কখনো সনদ হারিয়ে যাওয়া বা পুড়ে যাওয়ার কারণে তারা নিজেদের পরিচয় তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাদের নিয়ে কয়েকটি কলাম লিখেছি, কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছি; কিন্তু আদৌ কোনো অগ্রগতি হয়নি। বাংলার মাটিকে শত্রুমুক্ত করতে যেসব আদিবাসী তরুণ নিজেদের তীর-ধনুক ও অকুতোভয় বুক নিয়ে হানাদার বাহিনীর সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, তাদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ রাষ্ট্রীয়ভাবে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাননি। জাতীয় পর্যায়ে বারবার তালিকা সংশোধন, যাচাই-বাছাই ও পরিমার্জন করা হলেও প্রান্তিক আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধারা উপেক্ষিতই রয়ে গেছেন। এটি কেবল অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার বিষয় নয়, বরং গৌরবগাথার ইতিহাসে স্বীকৃতিহীন একটি অধ্যায়।উপেক্ষিত আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের অধিকার ও স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে বর্তমান সময়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কিছু জরুরি ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া আবশ্যক বলে মনে করি—ক. সাধারণ আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে আদিবাসী-অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে—যেমন রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, সিলেট, ময়মনসিংহ ও পার্বত্য চট্টগ্রামে—বিশেষ কর্মীদল গঠন করে সরেজমিনে প্রকৃত আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজে বের করতে হবে।খ. যেহেতু অনেক আদিবাসীর কাছে লিখিত নথিপত্র নেই, সেহেতু সহযোদ্ধা ও স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিদের মৌখিক সাক্ষ্য বা ‘মৌখিক ইতিহাস’কে প্রামাণ্য দলিল হিসেবে বিবেচনা করে তালিকা সংশোধনের জন্য বিশেষ নিয়ম তৈরি করতে হবে।গ. আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের নাম ও পদবি তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির সঠিক বানান অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা করতে হবে।ঘ. মাঠপর্যায়ের গবেষণার মাধ্যমে অসংখ্য উপেক্ষিত আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধার নাম ও বীরত্বগাথা যেসব গবেষকের বইয়ে লিপিবদ্ধ হয়েছে, সেগুলোকে তথ্যসূত্র হিসেবে নিয়ে তালিকা প্রণয়ন করতে হবে। এসব নির্ভরযোগ্য গবেষণাগ্রন্থকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রামাণ্য গ্রন্থ বা উৎস হিসেবে গ্রহণ করে বাদ পড়া বীরযোদ্ধাদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।ঙ. যেসব আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা ইতোমধ্যে মারা গেছেন, তাদের মরণোত্তর রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি প্রদান করা আবশ্যক। একই সঙ্গে তাদের উত্তরসূরিদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনর্বাসনের দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে।বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো একক ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের অর্জন নয়। এটি ছিল সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত আত্মত্যাগের ফসল। মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত সাঁওতাল, উরাঁও, মাহালী, মুণ্ডা, কোল, কোডা, কোড়া, রাজোয়াড়, তুরী, গারো, হাজংসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তাদের অংশগ্রহণের ধরন, সংখ্যা ও ব্যক্তিগত ইতিহাস নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা প্রয়োজন। কারণ, সব অঞ্চলের তথ্য সমানভাবে সংরক্ষিত হয়নি এবং অনেকের অবদানের লিখিত দলিলও সীমিত।একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে আমরা কতটা প্রগতিশীল ও ন্যায়পরায়ণ, তা নির্ভর করে আদিবাসী, প্রান্তিক ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অবদানকে কতটা সম্মান জানাতে পারছি, তার ওপর। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসীদের রক্ত আর মূলধারার বাঙালিদের রক্ত একই স্রোতে মিশে গিয়েছিল। সেই রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় কোনো ধরনের বৈষম্য বা অবহেলা কাম্য হতে পারে না। মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা সংশোধনের চলমান ও ভবিষ্যৎ প্রক্রিয়ায় আদিবাসীদের উপেক্ষিত বীরত্বকে পূর্ণাঙ্গভাবে ধারণ করতে হবে। যতক্ষণ না সমতল ও পাহাড়ের শেষ প্রান্তিক আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা তার প্রাপ্য রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাচ্ছেন, ততক্ষণ আমাদের স্বাধীনতা ও বিজয়ের ইতিহাস অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। এই ঐতিহাসিক ঋণ পরিশোধের সময় এখনই।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: কলামিস্ট]
মূল প্রতিবেদনে যান ↗