উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের মৃত্যুর গুজব নতুন করে ছড়িয়ে পড়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁর ছবি প্রকাশ করেছে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম। ছবিতে ৪২ বছর বয়সী কিমকে মেয়ে কিম জু আয়ের সঙ্গে পোশাক ও জুতার একটি প্রদর্শনী পরিদর্শন করতে দেখা যায়। এর আগে এক চীনা ভিন্নমতাবলম্বী দাবি করেছিলেন, কিম কোমায় আক্রান্ত হয়ে বেইজিংয়ের একটি হাসপাতালে মারা গেছেন। তবে এ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ দেননি তিনি।
উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র রোদং সিনমুন প্রকাশিত ছবিতে কিমকে প্রদর্শনীর বিভিন্ন পণ্য পর্যবেক্ষণ করতে দেখা যায়। তাঁর সঙ্গে ছিলেন মেয়ে এবং নিয়মিত সফরসঙ্গী কর্মকর্তারা। ছবিগুলো ঠিক কখন তোলা হয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে প্রকাশিত ছবিগুলো কিমের মৃত্যুর দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
উত্তর কোরিয়ার মতো অত্যন্ত গোপনীয় রাষ্ট্রে তথ্য যাচাই করা কঠিন। দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের শারীরিক অবস্থা, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত কিংবা ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সীমিত থাকায় সেখানে নানা গুজব সহজেই ছড়িয়ে পড়ে।
গুজবের সূত্র কোথায়
সাম্প্রতিক দাবিটি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী চীনা ভিন্নমতাবলম্বী ওয়ানজুন শিয়ে। তিনি নিজেকে চীনা ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে পরিচয় দেন। দলটি চীনা কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। এর আগেও তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের মৃত্যু নিয়ে অনুমানসহ বিভিন্ন অযাচাইকৃত দাবি ছড়িয়েছেন।
শিয়ের দাবি, কিম গুরুতর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁকে চিকিৎসার জন্য বেইজিংয়ে নেওয়া হয়। উত্তর কোরিয়ায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসুবিধার অভাব থাকায় তাঁকে চীনে স্থানান্তর করা হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি। পরে কিমের মৃত্যু হয় এবং তাঁর মরদেহ গোপনে উত্তর কোরিয়ায় ফিরিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন শিয়ে। তবে এসব দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ প্রকাশ করেননি তিনি।
দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বার্তা সংস্থা ইয়োনহাপকে জানিয়েছেন, কিমের মৃত্যু নিয়ে প্রচারিত খবরের সমর্থনে তাঁদের কাছে কোনো তথ্য নেই।
কিমের আকস্মিক মৃত্যু ঘটলে উত্তর কোরিয়ার সীমান্তে চীনের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা কিংবা শরণার্থীর সম্ভাব্য ঢল মোকাবিলায় প্রস্তুতির মতো কিছু লক্ষণ দেখা যেতে পারে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন। দেশটির কূটনৈতিক মিশনগুলোর আশপাশেও তৎপরতা বাড়তে পারত। তবে এমন কোনো পরিস্থিতির খবর পাওয়া যায়নি।
আগেও ছড়িয়েছে মৃত্যুর গুজব
কিমের মৃত্যু নিয়ে এমন গুজব নতুন নয়। ২০২০ সালে উত্তর কোরিয়া থেকে পালিয়ে আসা এক ব্যক্তি দাবি করেছিলেন, হৃদ্যন্ত্রের অস্ত্রোপচারের পর কিম মারা গেছেন বলে তিনি ৯৯ শতাংশ নিশ্চিত। কিন্তু কিছুদিন পর কিমকে জনসমক্ষে দেখা গেলে সেই দাবি ভেস্তে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, উত্তর কোরিয়ার নেতৃত্বে উত্তরাধিকার প্রশ্নটি এসব গুজবের অন্যতম কারণ। দেশটি তিন প্রজন্ম ধরে কিম পরিবারের শাসনে রয়েছে। তবে কিম জং উনের পর কে ক্ষমতায় আসবেন, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
কিম ইল সুং তাঁর ছেলে কিম জং ইলকে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতা গ্রহণের জন্য প্রস্তুত করেছিলেন। ১৯৯৪ সালে কিম ইল সুংয়ের মৃত্যুর সময় উত্তরাধিকার পরিকল্পনা সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল। ফলে কিম জং ইলের ক্ষমতায় আসার প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে মসৃণ হয়।
অন্যদিকে, ২০০৮ সালে কিম জং ইল স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁর ছোট ছেলে কিম জং উনকে দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ পদে উন্নীত করা হয়। ২০১১ সালে বাবার মৃত্যুর আগেই তাঁকে ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবে পরিচিত করা হয়েছিল। এরপরও নিজের ক্ষমতা সুসংহত করতে কিম জং উনকে কয়েক বছর ধরে প্রতিদ্বন্দ্বীদের সরিয়ে দেওয়া এবং সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলা করতে হয়েছে।
বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার ধারণা, কিম তাঁর মেয়েকে উত্তরসূরি হিসেবে প্রস্তুত করতে পারেন। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান ও সামরিক প্রদর্শনীতে মেয়ের উপস্থিতি বেড়েছে। তবে তাঁর বয়স মাত্র ১৩ বছর বলে ধারণা করা হয় এবং তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তরসূরি ঘোষণা করা হয়নি। উত্তর কোরিয়ার ইতিহাসে কোনো নারী রাষ্ট্রপ্রধানও হননি। এসব অনিশ্চয়তা কিমের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে জল্পনা বাড়াচ্ছে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে উদ্বেগ
কিমের স্বাস্থ্য নিয়ে গুজবের আরেকটি কারণ তাঁর জীবনযাপন ও পারিবারিক স্বাস্থ্যঝুঁকি। তিনি অতিরিক্ত ওজনের অধিকারী এবং ধূমপান করেন। দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা একাধিকবার তাঁর জীবনযাপনকে হৃদ্রোগের উচ্চ ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত করেছে। কিম পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ইতিহাস রয়েছে।
কিমের আকস্মিক মৃত্যু হলে তার প্রভাব শুধু উত্তর কোরিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। দেশটির পারমাণবিক অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তৈরি হবে কি না এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেখা দিলে প্রতিবেশী দেশগুলো কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেবে—এসব প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ক্ষমতার লড়াইয়ে কট্টরপন্থীরা আক্রমণাত্মক অবস্থান নিতে পারে কি না কিংবা অস্থিরতা থেকে চীনের সীমান্তে শরণার্থী সংকট তৈরি হতে পারে কি না, তা নিয়ে বেইজিং, সিউল ও ওয়াশিংটনের উদ্বেগ রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২৮ হাজার সেনা অবস্থান করছে। ফলে উত্তর কোরিয়ার নেতৃত্বে যেকোনো আকস্মিক পরিবর্তনের ওপর আন্তর্জাতিক মহলের নজর থাকে।
তথ্যের ঘাটতিতে গুজবের বিস্তার
উত্তর কোরিয়ার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন হওয়ায় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকেও অনেক ক্ষেত্রে অসম্পূর্ণ তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। দেশটির নেতা ও তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলের কাছে খুব সীমিতসংখ্যক মানুষের নিয়মিত প্রবেশাধিকার রয়েছে। ফলে কিমের স্বাস্থ্য নিয়ে কোনো খবর নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এ ছাড়া উত্তর কোরিয়ার শাসকগোষ্ঠী প্রকৃত পরিস্থিতি আড়াল করতে ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ায় কি না, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। এমন পরিবেশে অযাচাইকৃত খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, কিমের মৃত্যুর মতো বড় খবর ওয়ানজুন শিয়ের কাছে কীভাবে পৌঁছাল, অথচ উত্তর কোরিয়াকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণকারী গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে তার সমর্থনে কোনো তথ্য নেই—তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। তিনি হয়তো আলোচনায় আসার জন্য এমন দাবি করেছেন, অথবা চীনের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ককে সামনে এনে বেইজিংকে বিব্রত করতে চেয়েছেন। তবে তাঁর উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই।
উত্তর কোরিয়ার নেতৃত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাবের কারণে কিম জং উনের স্বাস্থ্য ও মৃত্যু নিয়ে গুজব বারবার ফিরে আসে। নতুন ছবি প্রকাশের পরও তাঁর স্বাস্থ্য সম্পর্কে সব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি; তবে মৃত্যুর দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সূত্র: বিবিসি
এমএস/
